টুসু গানের বাণী , ঐতিহ্য, পরম্পরা ও উত্তোরণ

-শ্যামল কুমার মন্ডল

Tusu Bhasan Marks The End Of Capricorn The New Years Calendar

-টুসু একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। লোকাচার সম্পৃক্ত এই উৎসবে কিছু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও এই উৎসব কখনোই ধর্ম-উৎসবে পরিণত হতে পারে নি। সমাজ-সমীক্ষকরা বলে থাকেন, ধর্ম – উৎসবগুলি প্রধানত লোকউৎসবের গর্ভসঞ্জাত। পরবর্তীকালে সেগুলি ধর্মের গন্ডিতে আবদ্ধ হয়েছে। তাসত্বেও কিছু উৎসব আছে যেগুলিকে ধর্মের ছোঁয়া থাকলেও একান্তভাবেই সাধারণ মানুষের হৃদয় বন্ধনে আবদ্ধ। টুসু উৎসব বাংলার রাঢ় অঞ্চলের এমনই একটি লোকউৎসবের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

টুসু উৎসব সর্বজনীন, কারণ এই সর্বজনীনতার শিকড় জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন সংগ্রামের সাথে। দীর্ঘ তিনমাস ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, প্রকৃতির ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে যখন সে তার শ্রমের ফসল ঘরে তোলে, সেই চরম সুখের মুহূর্তে তার ঘরে আসে টুসু। সমস্ত ক্লান্তির অবসান ঘটে তার মায়ামাখা সুরের জাদুতে। এই গভীরে আছে শস্য। পরম যত্নে বোনা, চরম সতর্কতায় পরিপাটি ও সবশেষে বিপুল আনন্দে সেই সাফল্যকে ঘরে তোলা সময়ের ক্রম ব্যাপ্তির যোগফলের প্রতীক এই উৎসব। তাই, কোড়া, ভূমিজ, মাহাতো, মুণ্ডা, লোধা, সাঁওতাল সবাই ধর্মের অনুশাসন ভেঙে, আচারের সীমানা লঙ্ঘন করে সাফল্যের অনাবিল আনন্দের অভিব্যক্তি প্রকাশে সামিল হয়।

টুসু উৎসব সর্বজনীন আরও একটি বড় উপাদানের কারণে তা হল তার গান। সকলেই এই গানকে ‘টুসুগান’ বলে জানে। টুসু গানের মধ্যে নেই সুরের কেরামতি, নেই তালের মারপ্যাঁচ, নেই ওস্তাদি কসরত দেখানোর কোন সুযোগ। তা সত্বেও টুসু গানের প্রভাবে দীর্ঘ এক মাস ধরে আচ্ছন্ন হয়ে যায় তামাম রাঢ় বাংলা। পুরুলিয়া,বাঁকুড়া, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলসহ সীমান্তবর্তী ঝাড়খণ্ড ও বিহারের কিছু অঞ্চলও টুসুর সুরে মাতাল হয়। চলে গান বাঁধার, সমবেতভাবে গান গাওয়ার চর্চা। এমনকি গানের লড়াইও চলে টুসু বনাম টুসুতে। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে শত শত নরনারীর মুখে মুখে রচিত হয় অসংখ্য গান, খাতায় লেখারও প্রয়োজন পড়ে না। গাইতে গাইতে, শুনতে শুনতেই শ্রুতিধর ও স্মৃতিধর হয়ে ওঠে কুমারী এয়ো সকলেই। এমনকি পুরুষরাও গান বাঁধায় অংশ নেয়, গেয়েও থাকে। এই অসীম সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার মধ্যে বেঁচে থাকে তাদের জীবনবোধ। টুসুগান এই ঐতিহ্য বহন করে চলে বছরের পর বছর, পরস্পরা তুলে দেয় আগামী প্রজন্মের হাতে এবং সেই সব গানের উত্তরণ ঘটে সমাজ এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে। পৌষ মাসের শুরুতে টুসুর আগমন। স্বাভাবিকভাবেই টুসুর বন্দনা প্রাধান্য পায় প্রথম দিকের গানগুলিতে-

আমরা পৌষ পরবে টুসু পাতিব

আমরা টুসুর পূজা করিব।

চল সারদা, চল বরদা

কুলিতে বাঁধ বাঁধিব।

কুলির জলে সিনান কইরে

বরদা চুল শুকাব।

এক সড়পে দু’সড়পে

তিন সড়পে লোক চলে।

আমার টুসু মাঝে চলে

বিন বাতাসে গা ঢলে।।

তিরিশটি দিন রইবেটুসু

তিরিশটি ফুল পাবে গো,

রাইখতে নাইরব আর টুসুকে

মকর আইসরে নিতে গো।।

Nayan Basu no Twitter: "#Tusu, folk festival celebrated on the day of  #MakarSankranti in parts of #Odisa, #Jharkhand and #WestBengal, is dying  with every passing year. Even with the dwindled numbers, the

টুসু বন্দনায় এই ধরনের অসংখ্য গান রচিত হয়। এই জাতীয় গানগুলিতে একটি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত হয়। কিন্তু যখন কোন কারণে সমাজে কোনরকম অস্থিরতা থাকে, অর্থনৈতিক মন্দা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে তখন সেই বন্দনা গানেরই ভাষা কিভাবে পাল্টে যায় তা আমরা এই গানটির বানী লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারি –

টুসুমণি আইসছে মকরে

মোরা পূজাইৰ মা ক্যামন কইরে

অনাবৃষ্টি, অনাহারে ভুইলে মরি সংসারে, 

কলহে ঘেরছে সংসার লক্ষ্মী যায় সুরপুরে।

টুসুগান সাধারণত মেয়েরাই সমবেতভাবে গেয়ে থাকে। স্বভাবতই পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের জীবনযন্ত্রণার কথা টুসুগানে প্রতিফলিত হয়। নারী হৃদয়ের নানা যন্ত্রণা বিচিত্র ছবি আঁকে। যেমন এক বিবাহিতা নারী টুসু পরবে বাপের বাড়িতে না আসার বেদনা প্রকাশ করেছেন টুসু গানে-

এত বড়ো পোষ পরবে

রাখলি মা পরের ঘরে

ও মা পরের মা কি বেদন বোঝো

অন্তরে পুড়ায়ে মারে।

আমার মন কেমন করে,

মাগো আমার মন কেমন করে

যেমন তাতা কাড়ায় খই ফোটে

মাতা ঘষে রইলাম বসে,

আর আমার কে আছে

মা রইলো দুরান দেশে

প্রাণ জুড়াবো কার কাছে?

বধু নির্যাতনের চিত্র গ্রাম বাংলার আবহমান কালের, শ্বশুরবাড়ির নানা অত্যাচারের কাহিনি প্রকাশিত হয় টুসু গানের সুরে। –

থাকিতে না পারি ওই শ্বশুর ঘরে

আমি থাকবো বল কি করে

খেতে দিতে দেরি হলে

ঘর থেকে বাহির করে

আবার সজনা খাড়া ভেঙে মারে

মারে মেজ দেওরে।

থাকিতে না পারি ওই শ্বশুর ঘরে।

File:Golden Choudal, Tusu Festival Jharkhand.jpg - Wikimedia Commons
টুসু উৎসবে সোনালী চূড়া

পিতৃহীন বালিকাকে কাকা এক বয়স্ক ব্যক্তির সাথে মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েছেন। সামান্য অর্থের লোভে। তার লজ্জা মেয়েটিকে কুরে কুরে খায়। পতি পরিচয় দিতে শরম লাগে। সেই লজ্জাও উঠে আসে টুসু গানের মাধ্যমে-

একশ টাকা নিলি কাকা দিলিরে বুড়া বরে।

বুড়ার সঙ্গে চলতে গেলে রাণিগঞ্জের শহরে।

রাণিগঞ্জেরে লোকে বলে, ওটি তোমার কেবটে

লাজলজ্জা সরম সজ্জা, ঠাকুরদাদা হয় বটে।

সমাজের অসহায় নিষ্পেষিত দুর্বল মানুষ চায় এমন একটি অবলম্বন যাকে কেন্দ্র করে সে ক্ষণিক শান্তি পেতে পারে। টুসু হয়ে ওঠে সেই অবলম্বন, সেই ক্ষণিকের শান্তি পেতে সে খোঁজে সমব্যাথী। পৌরানিক কাহইনী বা চরিত্রগুলি, টুসু গানে তুলে ধরা নতুন কিছু নয়। পৌরানিক কাহিনী নির্জাতিতা নারী চরিত্রগুলি সবচেয়ে গ্রহণ যোগ্য হয়ে ওঠে, নির্যাতিতা রমনীদের সমব্যথী হয়ে।  এমন একটি গান

নারী জনম দিয়েছ বিধি

আমি কাঁদিগো নিরবধি।

হায়রে নিদারুণ বিধি তোর মনে কি এই ছিল

কাঁদিতে ভাবিতে আমার বিফলে জনম গেল।

সত্যযুগে লক্ষ্মী নামে নারায়ণের ঘরণি

দুর্বাশার অভিশাপে হলাম মর্তবাসিনী।

দ্বাপরেতে সীতা নামে শ্রীরামের ঘরণি।

বিমাতা কৈকেয়ীর বাদে হলাম বনবাসিনী।

ত্রেতা যুগে রাধা নামে আয়ানের ঘরণি

ননদি কুটিলার বাদে হলাম গো কলঙ্কিনী।।

টুসুর গানে উঠে এলো নাগরিক পঞ্জিকরণের প্রসঙ্গ - Prothom Kolkata | DailyHunt

এই সব ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতেই টুসু গানের স্রষ্টারা এক সময় হয়ে ওঠে সমাজ সচেতন। ফলে একদিন যে গান ছিল তার মনে শান্তি প্রলেপ দেওয়ার, আনন্দ দেওয়ার সেই গানকেই একদিন প্রতিবাদের ভাষা ও মাধ্যম হিসাবে বেছে নিতে সে দ্বিধা করল না। টুসু আসবে, কিন্তু সরকার খাজনা চেয়ে নোটিশ দিয়েছে। টুসুর আগমনের আনন্দে বাদ সাধে সেই নোটিশ। টুসু গানের পূজারিণী গায়-

পৌষ মাস পড়ল টুসু

রাজায় মাগে খাজনা।

গায়ের গয়না ঘুচাও টুসু

বুঝাও রাজার খাজনা।

টুসু হল কৃষি লক্ষ্মী। সেই কৃষিলক্ষ্মীর নিপুণ কারিগর কৃষকের মনে বেদনার অন্ত নেই। রক্তে-ঘামে বোনা ফসল জমিদার জোর করে নিয়ে যায় তার খামারে। বেদনার্ত জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রকাশ পায় পুরুলিয়ার টুসু শিল্পীর গলায়-

পৌষ আসছে সাধের টুসু

পূজব তোমায় ফুল দিয়ে

তোমার ক্ষেতের ধান তুলেছি

সে ধান যাবেক কে লিয়ে।

এরপর এল জমির লড়াই। বর্গাদার জোতদার সম্পর্কে তিন দশকের ইতিহাস। বাংলা সংগ্রামের ঐতিহ্যকে, মিহিমান্বিত করেছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে রচিত টুসু গান-

টুসু ইবার জাগছে চাষী, কাস্তেতে দেখ, দিচ্ছে সান

রক্তে রুয়া ফসল তুল্যে, খামারে আজ গাইছে গান।

কে আছে বল বাপের ব্যাটা,

সোনার ফসল কাড়বে তার

মহাজনের মুখ শুকালো,

গা ঢাকা দেয় জমিদার।

নির্গুন বাবু কৃষক নেতা

চাষীর ল্যাগে ঢালছে প্রাণ

টুসু ইবার জাগছে চাষী

রক্তে রুয়া তুলছে ধান।

মানভূমের বাঙালি অধিবাসীদের বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দাবী দীর্ঘদিনের। বিহার সরকারের সব অত্যাচার মাথা পেতে নিলেও তারা চাপিয়ে দেওয়া হিন্দিকে কখনো বরদাস্ত করতে পারেনি। ১৯৫৫ সালে বাঙ্গালীদের উপর এমন দমন-পীড়নের ঘটনা প্রতিফলিত হলো টুসু পরবের গানে।

শুনরে বিহারী ভাই

তোরা রাখতে নারী ডাঙ দেখাযং।

বাংলা ভাষা বাঙালির মাতৃভাষা। এই মাতৃভাষার স্তন্য পান করেই সে বড় হয়েছে। মানভূমের টুসু ব্রতীদের কন্ঠে সেই কথাই ঘোষিত হয়েছে আর একটি গানে।

আমার বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা

ভাই মারবি তোরা কে কাকে

বাংলা ভাষা এই ভাষাতেই

কাজ চলেছে সাত পুরুষের আমলে

এই ভাষাতেই মায়ের কোলে

মুখ ফুটেছে মা বলে

এই ভাষাতেই পর্চা রেকর্ড

এই ভাষাতেই কেক কাটা

এই ভাষাতেই দলিল নথি

সাত পুরুষের হক পাটা।

দেশের মানুষ ছাড়িস যদি

ভাষার চির অধিকার

দেশের শাসন অচল হবে

ঘটবে দেশে অনাচার।

বাংলা ভাষার পাশাপাশি বাংলার লোকসংস্কৃতি বাংলার অহংকার। সেই বাংলার ভাদু, টুসু, ঝুমুর, মনসার গান সহ নানা আঙ্গিক তার সংস্কৃতির ভান্ডারকে বৈচিত্রের পূর্ণতা দিয়েছে।

সেই লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও টুসু গানের শিল্পীরা বহন করে চলেছে। তাই তাদের কণ্ঠে এমন গান শোনা যায়।

আমার মনের মাধুরী

সেই বাংলা ভাষা করবি কে চুরি

আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামে

মেঠো সুরের গান চুয়া

বাংলা গানের ছড়া কেটে

আষাঢ় মাসে ধান রুয়া।

মনসা গীতি বাংলা গানে

শ্রাবণজাত জঙ্গলে

চাঁদ বেহুলার কাহিনী গাই।

চোখের জলের গান বলে।

বাংলা গানে করিল সই

ভাদু পরব ভাদরে

গরবিনীর দোলা থামাই

ফুলে ফুলে আদরে

বাংলা গান টুসু আমার

মকর দিনে- সাঁঝরাতে

টুসুর ভাসান পরব টাঁড়ে

টুসুর গান মাতে মাতে।

আসলে টুসু গানের বাণীর মূল কথাই হলো তার বহুমাত্রিকতা। সমাজ জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত বিভিন্নভাবে গানের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। যে গান কোন রাজনৈতিক মঞ্চে দৃঢ়ভাবে বলার সাহস হয়না, টুসু শিল্পীরা অনায়াসে তাদের গানে সেইসব বক্তব্য তুলে ধরার স্পর্ধা দেখায়। এই জায়গাতেই টুসু উৎসব এর সার্বজনীনতার সাফল্য আর গানকে বাদ দিয়ে টুসু উৎসবের কোনো অস্তিত্বই থাকে না এই উৎসব, মেলা সবকিছুই গান কে ঘিরে। অংশগ্রহণকারীরা সকলেই পারফর্মার এবং সরাসরি ও প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই এই লোকউৎসবের শিকড় সাধারণ মানুষের মনের গভীরে। যে ঐতিহ্য সে বহন করে চলেছে, সেই পরম্পরা আপনা থেকেই চলে আসে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কন্ঠে ও গানে এবং এভাবেই তার উত্তোরণ ঘটে চলেছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আবহমান কাল ধরে।

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

ছ’য়ের দশকে বহুরূপীর রবীন্দ্র নাটক ও শম্ভু মিত্রের নাট্য প্রযোজনা

কৃষ্ণপদ দাস

(ভূমিকা আধুনিক বাংলা-নাট্যের আলোচনায় অন্যতম ব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র। অভিনেতা, নাট্যকার, পরিচালক এবং সংগঠকের ভূমিকায় থেকে প্রথম গ্রুপ থিয়েটারের সূত্রপাতের জনক তিনিই। প্রথম গ্রুপ থিয়েটার ‘বহুরূপী’ — যা তৈরীর কৃতিত্ব শম্ভু মিত্রের। গণনাট্য সংঘ থেকে বেরিয়ে এসে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে নিয়ে ‘বহুরূপী’ খুব স্বল্প সময়েই বিশেষ উচ্চতায় স্থান করে নিয়েছে রবীন্দ্র-নাট্যের প্রযোজনা দিয়ে — যা পাঁচের দশক থেকে শুরু হয়েছিল। পাঁচের দশকে ‘রক্তকরবী’, ছয়ের দশকে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে ‘বিসর্জন’ ‘রাজা’ নিয়ে জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠে বহুরূপী। বহুরূপীর পাশাপাশি এল নান্দীকার, শৌভনিকের মত নাট্যদল। তবে আমার এই মুহূর্তের উপস্থাপনা শম্ভু মিত্রের মৌলিক নাট্যভাবনা এবং বহুরূপীর নিজস্ব প্রযোজনায় রবীন্দ্র-নাটক।)

স্বাধীনতা উত্তর বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাদের প্রায় সকলেই গণসংস্কৃতির প্রশস্ত রাস্তায় পা মিলিয়েছিলেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির অভূতপূর্ব অগ্রগতি লক্ষ করে ভারতের শ্রমজীবী মানুষের । মনেও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরিত হয়। স্বাধীনতা দেশপ্রেম ও মানবমুক্তির । সংজ্ঞায় শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব যুক্ত হল । এরই পটভূমিতে প্রতিষ্ঠিত গণনাট্য সংঘের কর্মসূচিতে যে সকল প্রগতিশীল শিল্পী-নাট্যকর্মী এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন যুবক শম্ভু মিত্রও । গণনাট্য সংঘের ‘ল্যাবরেটরি’, ‘জবানবন্দী’, ‘নবান্ন’ নাটকের প্রযোজনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল তার । অভিনয়ে ও পরিচালনায় তার দক্ষতা স্বীকৃত হয় । কয়েক বছর বাদে গণনাট্য সংঘ থেকে বেরিয়ে এসে শম্ভু মিত্র ও মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বহুরূপী’ নাট্য সংস্থা (১৯৫০, ১ মে) । বাংলা নাটকের ইতিহাসে সূচিত হল এক স্মরণীয় পর্ব ।

বহুরূপীর নাট্যাদর্শ  ও প্রযোজনারীতি গণনাট্য সংঘের পথে অগ্রসর হয়নি বলে শম্ভু । মিত্র সমালোচিত হলেও তার জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি । বিশেষ করে রবীন্দ্রনাটকের । উপস্থাপনা ও প্রযোজনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল স্রষ্টার । রবীন্দ্ৰনাটকের ব্যাপক পরিচিতির মূলেও তাঁর অবদান বিস্মৃত হবার নয় । সে কারণেই বিশিষ্ট অভিনেতা ও নাট্যকার কুমার রায় বলেছেন –

“ভারতীয় থিয়েটারের রূপরেখা শম্ভু মিত্র প্রযোজিত, নির্দেশিত রবীন্দ্রনাটক অবলম্বন করেই আঁকা যায় । যে ইতিহাস তিনি এ ক্ষেত্রে তৈরি করে গেছেন তাকে । আজকের বিশ্লেষণী চোখে, আজকের দূরত্বে কেউ হয়তো বিচার করতে পারেন কিন্তু এখনও পর্যন্ত রবীন্দ্রনাটক প্রযোজনায় তার সাফল্য অস্বীকার করা যায় না ।”

পাঁচের দশকেই বহুরূপী রবীন্দ্রনাটককে এক বিশেষ উচ্চতায় তুলে ধরেছিল । ছয়ের দশকেও বহুরূপীর পাশাপাশি অন্যান্য কিছু দলও রবীন্দ্রনাটকের একাধিক প্রযোজনা করেছে । ১৯৬১ সাল ছিল রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ । সেই জন্যে রবীন্দ্রনাটক অভিনয়ের একটা নতুনতর প্রচেষ্টা দেখা দিচ্ছিল । বহুরূপীর ‘বিসর্জন’ ও ‘রাজা’ ছাড়াও নান্দীকার অভিনয় করেছে ‘চার অধ্যায়, সুন্দরম ‘ডাকঘর’ এবং শৌভনিক মঞ্চস্থ করেছে একাধিক রবীন্দ্ৰনাটক ‘রাজা ও রাণী’, ‘তাসের দেশ’, ‘বাঁশরী’, ‘ঘরে-বাইরে’, ‘শেষ রক্ষা । থিয়েটার ইউনিট প্রযোজনা করেছে ‘নৌকাডুবি’ ও ‘শোধবোধ’। আসলে রবীন্দ্র নাট্যভাবনা, নাট্যাঙ্গিক সমস্ত শ্রেণির মানুষের কাছে বোধগম্য না হওয়ায় রবীন্দ্রনাটককে । বহুকাল মঞ্চনীরব থাকতে হয়েছে । শম্ভু মিত্র আদ্যন্ত একটি ভারতীয় নাট্যকলার সন্ধানে নিয়োজিত ছিলেন,  সেই সূত্রে আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধনের কথাও ভাবতেন । ঐতিহ্য কী, আধুনিকতা কী এসব ভাবতে ভাবতেই ‘আধুনিক কালকে বুঝতে বুঝতে, ব্যক্তি ও সমাজের বন্ধনকে ও দ্বন্দ্বকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে করতে, পথ । চলে এল প্রাক্তন যুগের এক রবীন্দ্রনাথের প্রাঙ্গণে ।

শম্ভু মিত্রই প্রথম রবীন্দ্রনাথের কাব্য ও নাট্যভাষা আয়ত্তে এনেছিলেন বুদ্ধি দিয়ে, হৃদয় দিয়ে এবং আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে, বিজ্ঞানীর মতো অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে । তাই একথা আজকে কেউ অস্বীকার করবেন না যে, তিনি একটা যুগ তৈরি করে গেছেন— ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেই; তিনি রবীন্দ্রনাটককে মঞ্চে পুনরাবিষ্কার করে গেছেন ।

(ক) বিসর্জন

রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন’ নাটকটি বহুরূপীর প্রযোজনায় ও শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় দিল্লির । আইফ্যাক্স হলে মঞ্চস্থ হয় ১৯৫১ সালের ২৭ অক্টোবর। এই নাটককে সময়োপযোগী । করে মঞ্চস্থ করেছিল বহুরূপী । এই নাটকের বার্তা দেশকালজয়ী । কেননা যুগে যুগে সব । দেশে আদর্শের নামে, ধর্মের নামে নরমেধ যজ্ঞ অতীতেও ঘটেছে, আজও ঘটছে । ১৯১৬-তে ‘বিসর্জন’-এর ইংরেজি রূপান্তর ‘স্যাক্রিফাইস’ রবীন্দ্রনাথ যখন লিখছেন জাপানের পথে জাহাজের ডেকে বসে, এক বিশ্বব্যাপী মহাযুদ্ধ তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে দেশ-বিদেশের নগর প্রান্তরকে করেছে প্লাবিত । উৎসর্গ পত্রে তিনি লেখেন— “I dedicate this play to those heros who bravely stood for peace when human sacrifice was claimed for the God of war”. ‘রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, এই নাটকে প্রেম আর প্রতাপের মধ্যে ভাবের বিরোধ বেঁধেছে । একদিকে অহিংস প্রেম, অপর দিকে সংস্কারাশ্রয়ী হিংসার উন্মত্ত উল্লাস । একদিকে মহারাজ গোবিন্দমাণিক্যের অটল আদর্শনিষ্ঠা ও আত্মপ্রত্যয়, অন্যদিকে শক্তির উপাসক রঘুপতির মোহান্ধতা ও  দাম্ভিক ব্রহ্মতেজ— এই দুয়ের সংঘাতে দিশাহারা জয়সিংহের দুঃসহ চিত্তদাহ, যার চরম নিবৃত্তি আত্মবিসর্জনে । রাজর্ষি গোবিন্দমাণিক্যের অঞ্চল স্থিতপ্রতিষ্ঠ আদর্শ বিশ্বাসে রানি গুণবতীর দেশাচারমূলক অন্ধ আবেগ স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাহৃত রঘুপতি আত্মপ্রেমের কাছে নিষ্কলুষ জয়সিংহের আত্মবলি করুণ রসকে আরো ঘনীভূত করে । তুলেছে, অন্যদিকে অপর্ণা তার রিক্ততা হাহাকার ও বিদীর্ণ হৃদয় নিয়ে দর্শকদের সামনে নিজেকে তুলে ধরেছে । প্রেয় ও শ্রেয়র দ্বন্দ্বে জয়সিংহ ক্ষতবিক্ষত, সত্য ও মিথ্যার মায়ায় দোদুল্যমান; রঘুপতি অন্ধ বিশ্বাস ও হিংস্র সংস্কারের নাগপাশ থেকে মানবিক প্রেম ও প্রীতিতে উত্তীর্ণ । সমগ্র নাটকের সার্থক রূপায়ণে দর্শকবৃন্দ সংঘাতের শিখরে বিচরণ করতে করতে স্তম্ভিত বিস্ময়ে উপনীত হন এক মঙ্গলময় পরিণতিতে, যেখানে বজ্ৰদগ্ধ । পুরোহিত রঘুপতি অশ্রুধৌত পরিশোধিত চিত্তে সাড়া দেয় অর্পণার আহ্বানে ।

সেকালের অনেক সমালোচক বলেছেন যে মঞ্চের চরিত্রদের যে কোনও রকম একমুখী ভাবকে পরিচালক বর্জন করেছিলেন বলে তারা হয়ে উঠেছিল রক্ত-মাংসের স্ত্রী-পুরুষ, সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে যাদের সহজেই আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ৩ ধীরস্থির দয়াবান গোবিন্দমাণিক্য (কুমার রায়) যে কত নিঃসঙ্গ, তার স্ত্রী বা তাই । তার অতরের অংশভাগ নয়, তা যেমন প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে, তেমনি প্রথানিষ্ঠ, প্রাণ । হত্যায় দ্বিধাহীন, ধর্মের নামে মিথ্যাচারের অসংকোচ, আপাত দৃষ্টিতে নিষ্ঠুর রঘুপতি । (অমর গাঙ্গুলী) যখন জয়সিংহের আত্মবলিতে হাহাকারে ভেঙে পড়েন, তখন গর্বোদ্ধত অহংকারের অন্তরালে সুগভীর স্নেহের প্রবাহ আর গোপন থাকে না, আর জয়সিংহের (শম্ভু মিত্র) দুই পরস্পরবিরোধী প্রত্যয়ের মাঝখানে পড়ে যে দোদুল্যমানতা, তা শুধু দুটি ভাবের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার ব্যাপার নয়রঘুপতি ও গোবিন্দমাণিক্য দুজনের সঙ্গেই তার হৃদয়ের, জীবনের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য । শিশুকাল থেকে রঘুপতি তাকে মানুষ করেছে; কালী মন্দিরের আচার-অনুষ্ঠান প্রভৃতির । সঙ্গে মিশে আছে রঘুপতির প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা, সেখানে ভিন্নমুখী টান দিয়েছে । শুধু গোবিন্দমাণিক্যের স্বভাবসঙ্গত প্রত্যয় নয়, তাকে জোরদার করেছে রাজার নির্মম, নির্ভয় ব্যক্তিত্ব । আর তাতে প্রেমের স্পর্শ এনেছে সরল, একাকিনী বালিকা অপর্ণা । কিন্তু দর্শককে গভীরভাবে আলোড়িত করে জয়সিংহের আত্মবলি । অবশ্য তাকেও । ছাপিয়ে যায় রঘুপতির মমদ শোকসন্তাপ । কালী প্রতিমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আগে তার সেই আর্ত হাহকার—

“দে ফিরায়ে জয়সিংহ মোরে ! দে ফিরায়ে ! দে ফিরায়ে রাক্ষসী পিশাচী ! শুনিতে কি পাস আছে কর্ণ ? জানিস কী করেছিস ? কার রক্ত করেছিস পান ?”

‘বিজর্সন’-এর স্মারক পত্র থেকে জানা যায়—

“পৃথিবীর অজস্র রাজনৈতিক বেদীর সামনে আদর্শের নামে, ভবিষ্যতের নামে, ঐতিহ্যের নামে ব্যক্তিগত মানুষের সুখ, দুঃখ আশা আর ভালোবাসা সমস্ত কিছুকে । অবজ্ঞায় ভূলুণ্ঠিত করে এক বিরাট নরমেধ যজ্ঞের আয়োজন ইচ্ছা । সমাসন্ন সেই ভয়ঙ্কর বিসর্জনের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো ‘বিসর্জন’ নাটকে বাঁচবার পথের একটা দিশা পাব ।”

‘বিসর্জন’ নাটকের সঙ্গে সরাসরি হয়তো মধ্যবিত্ত জীবনে সম্পর্ক নেই । তাই, রঘুপতির দম্ভ, গোবিন্দমাণিক্যের আজ্ঞা দেশকালোত্তীর্ণ মানবের সঙ্কট । রবীন্দ্রনাট্যে শ্রেণি-উত্তীর্ণ যে কোনও মানবের আর্তনাদ শোনা যায় । তবুও নাটক অবশ্যই মধ্যবিত্ত জীবনপ্রান্ত স্পর্শ করে থাকে। বিশেষত বহুরূপীর বিশিষ্ট প্রযোজনারীতি ও সমকালীনতার জন্য ।

আসলে জয়সিংহের এই দাহ দেখা দিয়েছে হৃদয়ের দুটি পরস্পর গতি থেকে । একদিকে পশুবলির প্রতি বিতৃষ্ণা, অন্যদিকে গুরুর প্রতি আনুগত্যের অভ্যাস জয়াসহ চিরকাল থেকে গেছে এই দুয়ের মাঝখানে । কিন্তু বর্তমান অভিনয়ে এই অন্তর্দাহের মূল । কারণগুলি যেমন একদিকে স্পষ্টতর শব্দে ধ্বনিত হয়েছে— এত স্পষ্ট এবং মর্মভেদী আর কখনো শুনিনি, তেমনি অন্যদিকে একালের এযুগের কতকগুলো ভাবানুষঙ্গ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । এরা অস্পষ্ট ব্যঞ্জনার মতো, তবু তারা অর্থবহ । জয়সিংহ শুধু রঘুপতি নামক পণ্ডিত, দাম্ভিক পুরোহিতের দ্বারা আবদ্ধ নয়, সে প্রথার দাসত্বে আবদ্ধ । কিন্তু অভিনয়ের ব্যঞ্জনা এইখানে যে সে একালের ভাবানুষঙ্গ এনে দাঁড় করাচ্ছে, মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই প্রথা শুধু ধর্মের, মন্দিরের, দেশাচারের প্রথাও নয় । বারবার মনে হয়েছে এ জগতে, এ যুগে তাছাড়াও আরও প্রথা আছে যে নিষ্ঠুর স্পর্ধিত, যে প্রথার কাছে আমার জয়সিংহ প্রতিদিন আত্মরক্তদানে নিহত। এ-কথাগুলো রবীন্দ্রনাথের, যা নাটকের চিরন্তন বাণী । নাটকের এই চিরন্তন বাণীর ব্যঞ্জনা মানব-সঙ্কটকেই নতুন রূপে আমাদের চেনায় । ছয়ের দশকের ভারতের রাজনৈতিক সঙ্কট, দেশনেতাদের দোলাচলতা, অসংখ্য প্রাণের নিত্য বলিদানের কথা এ প্রসঙ্গে মনে জাগে । ক্ষমতার সেই উল্লাস এর বিষয়বস্তুকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে ।

“But Sambhu Mitra has given it through passion, movement and action a certain dimension. His interpretation goes beyond the surface story of king Gobindamanikya’s edict blood sacrifice and emphasizes of humanism and Love.”

এই নাটকটিতে জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করেন শম্ভু মিত্র স্বয়ং । ১৯৬১-র নভেম্বর ‘ক্যাপিটাল’ পত্রিকায় শম্ভু মিত্র পরিচালিত এ অভিনীত ‘বিসর্জন না ? সম্পর্কে লেখা হয়—

“But it is not in individual performance that ‘Visarjan’ serves the highest praise. Its claim to wider recogniu that Sambhu Mitra is doing the same kind of work o Bengali Stage as Satyajit Roy is doing on the Bengali Screen; and this is not praising Sambhu Mitra too much. The importance of dialogue in productions to non-Bengali audiances; but I am happy to learn that that the group’s recent performances in New Bohurupee’s, may help integrate the country, whatever the theme.”

যুগান্তর পত্রিকা ‘বিসর্জন’-এর অভিনয় সম্পর্কে লেখে—

“…বহুরূপীর কৃতিত্ব এবং মৌলিকতা এইখানে যে, তারা বিসর্জনের কোনও আক্ষরিক অর্থকে বিনষ্ট হতে না দিয়েও একটি প্রবল আবেগময়, নিষ্ঠুর যন্ত্রণাদায়ক উপলব্ধিকে সার্থকভাবে অনুবাদ করেছেন ।… নাটকের প্রশ্নগুলির সঙ্গে তারা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সমসাময়িক চিন্তার উত্তাপ এনে যুক্ত করেছেন । এই উত্তাপ বর্তমানকে চিরন্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছে । এই উত্তাপ আমাদের অন্তরের সংঘাতকে রবীন্দ্রনাটকের অন্তর্নিহিত সংঘাতের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে ।”

‘বিসর্জন’-এর পর রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকটি বহুরূপী  মঞ্চস্থ করল  ১৯৬৪ সালে । নাটকটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র বাংলা থিয়েটারকে উপহার দিয়েছিলেন এক অন্য অভিজ্ঞতা । ‘রাজা’ একটি আত্ম-জাগরণের নাটক । রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—

“…the human soul has its inner drama, which is just same as any thing else that concers man.”

একক মানুষ বাইরে এবং ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করতে চাইছে । সেখানে প্রত্যেকের নিজের মতো করে রাজা আছেন যার কাছে আত্মনিবেদন করতে  হয় । রানি সুদর্শনার আত্মপলব্ধির সেই তীর্থযাত্রাই এই নাটকের কাহিনি । নাটকের রাজা কোনও কুমুটধারী রাজা নয় । তিনি বিশেষ গুণবান একজন উত্তম মানুষ । নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রানি সুদর্শনা, দেশের নাগরিকবৃন্দ, বিদেশের রাজা ও পথিকদল সবাই যে রাজার অন্বেষণে ছুটে বেড়া, সে রাজা নিচক আধ্যাত্মিক চেতনা প্রসূত রাজা নন । এই অদৃশ্য রাজা সঙ্কটমুহূর্তে যেমন আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রানিকে এবং জনগণকে রক্ষা করেন । রাজা যে দেশকে ভালোবাসে তা তার এই কর্মকাণ্ডের মধ্যে । দিয়েই প্রমাণিত । এই অদেখা রাজাকে চোখের সামনে দেখতে চেয়ে রানি সুদশনা । নিজেকে সাধারণ নাগরিকদের দলে নামিয়ে এনেছে । তার অবস্থা অনেকটা বিদেশ পথিক দলের মতো—

“সত্যি বলছি ভাই, রাজা আমাদের এমনি অভ্যেস হয়ে গেছে যে, এখানে কোথাও রাজা  না দেখে  মনে হচ্ছে   দাঁড়িয়ে আছি,   কিন্তু পায়ের তলায় যেন মাটি নেই ।” ১০

সুদর্শনা রাজাকে শক্তি, ক্ষমতা ও রূপের মধ্যে দিয়ে পেতে চায় কিন্তু এ সবই তো বিমূর্ত । সুদর্শনা নিজের আমিত্ব ও অহংবোধকে বজায় রেখে ভালোবাসা পেতে চায় । তার ইচ্ছে সে যেভাবে রাজাকে ভালোবাসে রাজাও যেন তাই-ই করেন । এ যেন আধুনিক বস্তুবাদী সমাজের শিক্ষিত নরনারীর সমস্যা । কিন্তু ভালোবাসা তো পুঁজি নয়, একে দিয়ে আর যাই হোক বিনিময় চলে না ।

(খ) রাজা

“রাজা নাটককে বলা হয়েছিল ‘অন্ধকারের নাটক । স্বভাবতই আমাদের প্রশ্ন জাগে শম্ভু মিত্রের অনুসন্ধানে অন্ধকারই কি আরদ্ধ ? মহৎ শিল্পীর তপস্যা তো আলোর তপস্যা, তবে কেন এই অন্ধকারের আহ্বান ? অন্ধকার তো মহৎ শিল্পীর নাট্যভাবনাকে কলঙ্কিত করে । আসলে এই ‘অন্ধকার’ শব্দটি শম্ভু মিত্রের অনুভবে দার্শনিক তাৎপর্য নিয়ে ধরা দিয়েছিল । এই অন্ধকার সূর্যের অবর্তমানে যে তমসা, তা নয় । আলোর বিপরীতার্থক শব্দও নয় । এই অন্ধকার মুদিতনেত্র যোগীর ধ্যানের জগতের অন্ধকার । বাইরের জগতের কোলাহল ও তুচ্ছতা থেকে সরে এসে আমরা যখ ডুব দিয়ে কোনও সত্যকে উপলব্ধির চেষ্টা করি, তখন মনের ভেতরের অন্ধকার কিন্তু শূন্যতার রূপ নয়, সত্যকে আবিষ্কার করার একটি উপযোগী পরিমণ্ডল । শম্ভু মিত্র এই সত্যের উপলব্ধির অন্ধকারের দ্যোতনা পেয়েছিলেন ‘রাজা’ নাটকের মধ্যে । এই অন্ধকার আসলে আলোতে ফিরে আসার পথ । তাই ‘এ আঁধার আলোর অধিক । ‘রাজা’ নাটকের মধ্যে এই ভাবনাই প্রতিফলিত ।—

বহুরূপী প্রযোজিত ‘রাজা’ নাটকটি অসম্ভব মঞ্চ সাফল্য পেয়েছিল সেই সময় । তার একটি কারণ রবীন্দ্রনাথকে শম্ভু মিত্র অনুভব করেছেন এক অন্য মন নিয়ে । এ প্রসঙ্গে রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য—

“রাজা’ নাটকের প্রয়োগেও তিল তিল করে শম্ভু মিত্র সৃজন করেছেন রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক প্রত্যয়ের মনোভূমি । আলো, মঞ্চ, সঙ্গীত, পোশাক, কারুকৃতি, চরিত্র বিন্যাস আর অভিনয় সব মিলিয়ে সে এক অনন্তের সন্ধান অনিঃশেষের দৃশ্যকাব্য । রবীন্দ্রনাটকের অন্তরের সুখ দুঃখের-ভালোবাসার কাব্য হয়ে আলো ছড়িয়েছিল এখানে, যে আলোয় হারিয়ে যাওয়া পথ পাওয়া যায়, যে পথ মানুষকে পূর্ণ করে তোলে, যে পথে সব ক্ষুদ্রতা-তুচ্ছতার বাঁধন টুটে যায় ।” ১১

যাই হোক, ‘রাজা’র অভিনয়ে বহুরূপীর শিল্পীরা চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি । বিশেষত শম্ভু মিত্রের অভিনয় দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল । সন্তোষকুমার ঘোষ দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় ১৭ জুন মন্তব্য করেন—

“…. এই নাটকে ‘রাজা’ও একটি নিয়ত উপস্থিতি— শ্রী শম্ভু মিত্রের সুষ্ঠু ও নিষ্ঠাবান উচ্চারণে বারবার তার অমোঘ; অভ্রান্ত আবির্ভাব…।” ১২

শম্ভু মিত্র তথা এই বহুরূপী নাট্যদলই রবীন্দ্রনাটককে পেশাদারি মঞ্চে সাফল্য এনে দিয়েছিল । একটা সময় ছিল রবীন্দ্রনাথের এই সব রূপক নাটকগুলি বাংলা রঙ্গমঞ্চে প্রায় ব্রাত্য ছিল । তার গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য বহুল পরিমাণে এবং উপন্যাসের নাট্যরূপও শিশিরকুমার পূর্ব বাংলা মঞ্চে অভিনীত হলেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সমালোচনা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাটকের জনপ্রিয়তার অভাব সম্পর্কে তারা সচেতন ছিলেন । যেমন ‘নাচঘর’ পত্রিকা বলেছে—

“রবীন্দ্রনাথের নাটকের মর্মগ্রহণ করবার মতো শিক্ষার উৎকর্ষ ও রসবোধ এদেশের দর্শক সাধারণের নেই…” ১৩

গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন রূপে গড়ে ওঠার পর, প্রথমে বহুরূপী, তারপর একে একে বহু দলের রবীন্দ্রনাটকের এই নিরীক্ষা বাঙালির রুচিবোধ, সংস্কৃতি সচেতনতা ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসাকেই প্রমাণ করে । তবে বহুরূপীর প্রচেষ্টাগুলো যে সমকালীন অন্যান্য দলেরও অনুপ্রেরণা রূপে কাজ করেছে সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় । এ প্রসঙ্গে কুমার রায় বলেছেন—

“রবীন্দ্রনাথের নাটককে আমরা মঞ্চে পুনরাবিষ্কারের জন্য গৌরব করতে পারি । পারি, কিন্তু একটি একটি মাত্র সংস্থার সুবাদে । সে সংস্থা বহুরূপী, এবং তার রূপকার-নির্দেশক-অভিনেতা শম্ভু মিত্র ।” ১৪

শম্ভু মিত্র কর্তৃক রূপান্তরিত ও পরিচালিত নাটকের পরিচয়

শম্ভু মিত্রের বহুরূপীর শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাটকের প্রযোজনা তথা রবীন্দ্রনাটকের কথা এতক্ষণ আলোচিত হল । শম্ভু মিত্রের মৌলিক নাটকসহ তাঁর নাট্যভাবনার কথা না বললে বোধহয় আলোচনাটি খণ্ডিত থেকে যায় । তাই সেকথা এখানে বর্তমানে বলবার চেষ্টা করছি । তবে শম্ভু মিত্রের সারাজীবনের সৃষ্টি নিয়ে এখানে আলোচনা করার অবকাশ নেই, শুধুমাত্র ছয়ের দশকে শম্ভু মিত্রের নাটক ও নাট্যাভিনয় নিয়ে আলোচনা করা হবে ।

বহুমুখী প্রতিভার দ্যুতিতে শম্ভু মিত্রের সৃষ্টিশীল জীবন আলোকিত হয়ে উঠেছিল । তিনি যে কেবল নাট্য-নিদের্শনার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা তথা ভারতীয় আধুনিক থিয়েটারের জনক ও তার শ্রেষ্ঠতম রূপনির্মাণ করেছিলেন তাই-ই নয়- চলচ্চিত্র, আবৃত্তি ও সাহিত্যকর্মেও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব । নাট্য-নির্দেশনার পাশাপাশি নাটক রচনাতেও অসামান্য পরিচয় রেখেছেন । নাট্যরূপ, অনুবাদ, রূপান্তর এবং মৌলিক নাটক নির্মাণের এই বিচিত্র প্রবাহে তিনি অবগাহন করেছেন । তার এই বিপুল কর্মের সামান্যতম অংশের পরিচয় এখানে তুলে ধরা হবে ।

বিশ শতকের ছয়ের দশকের প্রারম্ভে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় বহুরূপী রবীন্দ্ৰনাটক প্রযোজনা করে । পরবর্তীতে তার সংখ্যা আরো বেড়ে যায় । সেকথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি । যাই হোক রবীন্দ্ৰনাটক বাদ দিলে ছয়ের দশকের প্রারম্ভে শম্ভু মিত্র পরিচালিত ও অভিনীত নাটকগুলির একটি ‘দশচক্র’ । ১৫ এই সময় অর্থাৎ ১৯৬২ সালের ২৮ অক্টোবর নিউ অ্যাম্পায়ারে নব পর্যায়ে ‘দশচক্র’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয় । নতুনভাবে বিন্যস্ত সঙ্গীতের পথ ধরে সমগ্র অভিনয়কে এই নাটকে বেঁধেছিলেন পরিচালক । ডাক্তার পূর্ণেন্দু গুহ-র ভূমিকায় শম্ভু মিত্র যখন উপযুপরি ‘Strike the tent’ এবং ‘one must bear one’s own cross to the calvary’ বাক্য দুটি যোজনা করেন, সমগ্র প্রযোজনাটি যেন—

“আবেগ ও বুদ্ধি, হৃদয় ও বোধিকে আশ্রয় করে এক আত্মপ্রতিষ্ঠ মানুষের দুর্মর আশার, নিরন্তর সংগ্রামের নাটক হয়ে ওঠে ।” ১৬

এখানে একটু বলে রাখা প্রয়োজন ছয়ের দশকে রবীন্দ্রনাটক বাদে শম্ভু মিত্র নর্দেশিত প্রথম নাটক ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ । নাটকটি শম্ভু মিত্র এবং অমিত মৈত্রের যৌথ চরনা । ১৯৬১ সালের ২৪ জানুয়ারি বিশ্বরূপা মঞ্চে নাটকটি প্রথম অভিনীত হয় । নাটকটি সম্পর্কে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন—

“…..সামগ্রিক বিচারে কাঞ্চনরঙ্গ’বহুরূপী-র একটি মনোহারী সৃষ্টি । বিশেষত পরিচালনা বাবস্থাপনা ও অভিনয়ের দিক হইতে নাটকটিকে নিখুত বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না…। ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ কাঞ্চনের চেয়ে জীবনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়াছে ।” ১৭

এরপরে ১৯৩০ সালের ১২ জুন নিউ এম্পায়ারে মঞ্চস্থ হয় ‘রাজা অয়দিপাউস’ । সোফোক্লিসের এই নাটকটি অনুবাদও করেন স্বয়ং শম্ভু মিত্র । প্রধান ভূমিকায় অভিনয়ও করেন তিনি নিজে এবং দর্শকদের কাছ থেকে বিপুল অভিনন্দন লাভ করেন । সেই সময় দেশ পত্রিকায় ‘রাজা অয়দিপাউস’সম্পর্কে ছাপা হয়—

“ঈদিপাসের ভূমিকায় শম্ভু মিত্র অসাধারণ অভিনয় করেছেন । ভাগ্যবিড়ম্বিত একটি চরিত্রের স্বগত হাহাকার তার অভিনয়ে অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠেছে । এই চরিত্রের মর্মজ্বালা ও অসহায়তা তিনি অবলীলায় তার অভিব্যক্তি ও বাচনভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন । মঞ্চে এই অভিনয় তুলনারহিত ।” ১৮

‘রাজা অয়দিপাউস’-কে নিয়ে সে সময় কিছু বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, নাটকটিকে কেউ কেউ অশ্লীল ও প্রগতিবিরোধী বলে মন্তব্য করেছিলেন । তবে এ কথাও ঠিক যে ক্ল্যাসিকের বিচার এমন ভাবে হয় না । নাটকটির সপক্ষে রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন—

“রাজা অয়দিপাউস মায়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলেন কী করলেন না এটা কোনও বিষয়ই নয় । যুদ্ধজয়ী রাজা রানির অধিকার পাবে, এটাই ছিল তৎকালীন গ্রিস দেশের নিয়ম । মায়ের সঙ্গে যৌন মিলন বা মায়ের গর্ভে নিজের সন্তানের জন্মদান, এ সবই ঘটেছে অয়দিপাউসের অজান্তে । তাই কোনও পাপ বা অন্যায় স্পর্শ করতে পারেনি অয়দিপাউসকে।” ১৯

আসলে অয়দিপাউসের সত্যের তৃষ্ণা, তার দেশপ্রেম এই নাটকের প্রধান বিষয় । অত্যাচারী স্ফিংক্সকে পরাজিত করে থেবাই-এর রাজা হয়েছিল অয়দিপাউস । থেবাই নগরীর জনসাধারণ গভীর কৃতজ্ঞতায় সিংহাসনে বসিয়েছিল সেই আগন্তুক, বীরশ্রেষ্ঠ অয়দিপাউসকে । রাজা হয়ে সিংহাসনে বসাই তার কাল হল । ঘনিয়ে এল মহা বিপর্যয় ।  দেশবাসীকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল রাজা । দৈবজ্ঞ পণ্ডিত তেইরেসিয়াসের কণ্ঠে চরম সর্বনাশের সতর্ক বাণীও তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি সত্য-সন্ধান থেকে । আর এখানেই ‘রাজা অয়দিপাউস’ এক মহা ক্ল্যাসিকে উত্তীর্ণ হয়েছে । এখানে বড় হয়ে উঠেছে সত্যের সন্ধান । রাজা অয়দিপাউস সব সীমা আর ক্ষুদ্রতাকে তুচ্ছ করে সত্যের তৃষ্ণায় মহীয়ান হয়ে ওঠেন । সত্যকে জেনেই রাজা অয়দিপাউসের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয় । রাজা জানতে পারল, সে পিতৃহন্তা । আপন জন্মদাত্রীর গর্ভে তিনি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন । সমাজে কোনও পাপ একা, বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে না । সত্য উদঘাটন করতে গিয়ে রাজা খুঁজে পেল, এই পাপের উৎসে রয়েছে সে নিজে । অনুশোচনায়, আত্মধিক্কারে সে নিজেই নিজের চোখ উপড়ে নিল । নাটকের শেষে অন্ধ অয়দিপাউস যখন বলেন যে, নিয়তি আর কী সঞ্চিত রেখেছে তার জন্য, তখন নাটকটি হয়ে ওঠে আরও মর্মস্পর্শী । যুগ যুগ ধরে রাজা অয়দিপাউসের সত্যের সন্ধান আলোকিত করে এসেছে সারা পৃথিবীর দশর্কদের । শম্ভু মিত্র ‘রাজা অয়দিপাউস’ অভিনয় করে সেই অসামান্য অভিজ্ঞতায় নিয়ে এসেছিলেন বাঙালি দর্শকদের । বাঙালি দর্শক সেদিন ক্ল্যাসিকের বিশালতায় অবগাহন করেছিলেন ।

আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি যে ছয়ের দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে দেখা দিয়েছিল নতুট সঙ্কট । সাম্যবাদী শিবিরে ফাটল, ভারত-চিন সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করল । জাতীয় জীবনের সে এক তমসাচ্ছন্ন ছবি । উৎপল দত্ত ‘কল্লোল’ প্রযোজনা করে এই অন্ধকারে নবতর প্রত্যয়ের আলো জ্বেলেছিলেন । শম্ভু মিত্রও ‘রাজা অয়দিপাউস’ এবং ‘রাজা অভিনয় করে সেই প্রত্যয়ের এবং সম্ভাবনার আলোই জ্বেলেছিলেন । উৎপল দত্ত এবং শম্ভু মিত্র দুজনেই সত্যকে খুঁজেছেন । দুজনের প্রকাশ আলাদা কিন্তু লক্ষ্য একই । কল্লোল’ নতুন যুগের ক্ল্যাসিক হয়েও শার্দুল সিং-এর শৌর্য, সাহস, ত্যাগ, ভালোবাসায় কোথায় যেন চিরকালীন ব্যাপ্তি পেয়ে যায় । আর ‘রাজা’, ‘রাজা অয়দিপাউস’ চিরকালের চির প্রাসঙ্গিক । বিশ্ব নাট্য-সাহিত্যে যা অতুলনীয় ।

‘রাজা অয়দিপাউস’ নাটকটির মাধ্যমে শম্ভু মিত্র বাংলা থিয়েটারকে উপহার দিয়েছিলেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা । অভিনয়, আলো, আবহ, মঞ্চ, পোশাক— সব মিলিয়ে এক সাঙ্গীতিক ঐকতান । রাজা অয়দিপাউস ও রানি ইয়োকাস্তের ভূমিকায় শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় সেদিন বাংলা থিয়েটারকে বিস্মিত করেছিল । আজও বিস্ময়ের সেই দুই ধ্রুপদী চরিত্রের অভিনয় । পৃথিবীর যে কোনও শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের সমকক্ষতার দাবি করে সেই অভিনয় ।

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটা সাঙ্গীতিক ঐকতান গড়ে তোলা হয়েছিল । আলো, আবহ, মঞ্চ, পোশাক, অভিনয়, কারুকৃতি অভিনেতাদের বিন্যাস সব মিলিয়ে এক ভিন্ন রকমের ছন্দ গড়ে উঠেছিল সেই প্রযোজনায়। শম্ভু মিত্রের নির্মাণ ও সৃজনে সমগ্র । নাটকটি অসামান্য হয়ে উঠত । অভিনয়, মঞ্চ এবং সাজপোশাকের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সেতুবন্ধন তৈরি করা হয়েছিল । ‘রাজা অয়দিপাউস’ প্রযোজনাটি সম্পর্কে কুমার রায়ের একটি মন্তব্য এখানে উল্লেখ্য—

“মধ্য মঞ্চ থেকে শুরু করে মঞ্চ গভীর পর্যন্ত মঞ্চজোড়া পাটাতন ধূসর কাপড়ে ঢাকা । রঙ্গ শীর্ষে মধ্যিখানে লালচে মেরুন রঙের দুটি বৃহৎ থাম, স্বল্প-অলঙ্কৃত । কয়েক ধাপ সিঁড়ি থামের মধ্য স্থানে পাটাতনের ওপর থেকে উঠে গেছে ।… অভিনেতার ডানদিকে অন্দরে যাওয়ার আলোকিত পথ । থামের বাইরে দিয়ে দু’দিকে প্রসারিত কালো পর্দা । মঞ্চব্যাপী পাটাতনের সামনের অংশে রঙ্গস্থলে দু’দিকে খানিকটা ছেড়ে দুটি কিংবা তিনটি ধাপের টানা সিঁড়ি । অভিনেতার ডানদিকে সেই সিঁড়ির ধাপের শেষে একটা ঢালু সরু চাতাল নেমে এসেছে মঞ্চতল ছুঁয়ে । মঞ্চবামে মূল পাটাতনের ওপর একটা প্রার্থনা জানানোর বেদী । সেটার রঙও ধূসর এবং গ্রিক মোটিফের অলঙ্করণ তার গায়ে । দুই থামের ওপরদিকে মধ্যবর্তী স্থানে একটা ছোট মেরুন রঙের ফ্ল্যাট লাগানো থাকত— তার মাঝে দেব আপোল্লোনের প্রতীক সোনালি-হলুদ রঙের সূর্য। ওই সূর্য চিহ্ন যুক্ত ফ্ল্যাটটা লাগানোর ফলে থামের মাঝে একটা প্রবেশ পথের অনুরূপ তৈরি হত । অন্ধকার প্রেক্ষায় যবনিকা উঠতে শুরু করলেই যারা নতজানু হয়ে মূল মঞ্চে, সিড়ির ধাপে, হাতে পল্লব ও পশম নিয়ে বসে থাকত (প্রায় তিরিশ জন) তাদের মুখে। রাজা নাম নিয়ে আর্তনাদ শোনা যেত ।” ২০

এই নাটকের আলো নিয়েও ছিল বিস্তীর্ণ ভাবনা । শম্ভু মিত্র এর জন্য আলোক-লেখ (Light Script) তৈরি করেছিলেন । ‘রাজা অয়দিপাউস’-এর ধ্রুপদী বাস্তবতার ক্যানভাসকে ফুটিয়ে তুলতে গভীর, সংযমী আলোর তুলি ব্যবহার করেছিলেন শম্ভু মিত্র । সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাই। কোনও আবহসঙ্গীত ব্যবহার করতেন না শম্ভু মিত্র । তাঁর নিজের কণ্ঠস্বরে, আবৃত্তির স্পর্শে তুলে ধরতেন অন্তরের সুর আর ছন্দ ।

১৯৬৪-তে ‘রাজা’ ও ‘রাজা অয়দিপাউস’ দটি ক্যাসিক নাটক প্রযোজনা করার পর ১৯৬৫-তে শম্ভু মিত্র নতুন কোনও নাটকের কথা ভাবেননি । ‘ছেঁড়াতার’ থেকে শুরু করে পুরনো নাটকগুলি এই সময় পুনর্বার মঞ্চস্থ করা হয় । ১৯৬৬-তেও ‘বহুরূপী নতুন কোনও নাটক মঞ্চস্থ করতে পারেনি । আগের বারের মতোই পুরনো নাটকের অভিনয় হতে থাকে ‘৬৬-তে । ১৯৬৭ সালে শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয় । ৭ মে নিউ এমপায়ারে প্রথম অভিনয় হয় । এই নাটকটিতে শম্ভু মিত্র অভিনয় করেননি । নাটকটির বিষয়বস্তু খুব উঁচু মানের একথা সেদিন সবাই মানেননি, কিন্তু শম্ভু মিত্রের পরিচালনার প্রশংসা করেছিলেন সকলেই । তারই অসাধারণ পরিচালনায় ও সম্মিলিত অভিনয়ে বাদল সরকার যে নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন সেদিন, তা কিন্তু ভুলে যাবার নয় । বাকি ইতিহাস প্রসঙ্গে ‘দেশ’ পত্রিকায় সে দিন লেখা হয়—

“বহুরূপীর নতুন নাটক ‘বাকি ইতিহাস’ ও যথাবিহিত দর্শকদের আনন্দ দেবে, মুগ্ধ করবে । তবে তা সুপ্রযোজনা, সুপরিচালনা ও সম্মিলিত অভিনয়ের জন্য নাট্যামোদীদের প্রশংসা যতটা পাবে, নাটকের জন্য ততটা নয় ।… শম্ভু মিত্র বুদ্ধিদীপ্ত নাট্য পরিচালনার ছাপ নাটকের প্রতি দৃশ্যেই মেলে । ডিটেল-এর প্রতি তার নজর এবং শ্রী মিত্রের বাস্তববোধ লক্ষ করার মতো।” ২১

১৯৬৮ সালে আবারও পুরনো নাটকের অভিনয় করে বহুরূপী । ১৯৬৯-এ নীতীশ সেন নামে আর এক নতুন নাট্যকারের লেখা ‘বর্বর বাঁশি’ নাটকের পরিচালনা করেন শম্ভু মিত্র । নতুন নাট্যকারের নাটক মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র পূর্বেও ঝুঁকি নিয়েছেন (বাদল সরকারের ক্ষেত্রে), এবারও নিলেন । ১৯৬৯-এর ৭ মে কলামন্দিরে ‘বর্বর বাঁশি’ মঞ্চস্থ হল । শম্ভু মিত্র আবার প্রমাণ করলেন তাঁর নির্দেশনার গভীরতা । ফলে একেবারে নতুন নাট্যকারও সকলের কাছে পরিচিত হয়ে গেলেন ।

শম্ভু মিত্রের মৌলিক নাটক

এতক্ষণ ছয়ের দশকের শম্ভু মিত্র পরিচালিত নাটকগুলি নিয়ে আলোচনা করা হল । এবার অলোচনা করবো ছয়ের দশকে শম্ভু মিত্রের মৌলিক নাটকগুলি ।

এই সময় শম্ভু মিত্র রচিত মৌলিক নাটকগুলি হল— ‘গর্ভবতী বর্তমান’ (১৯৬৩), ‘চাঁদ বণিকের পালা’ (১৯৬৫) ও ‘অতুলনীয় সম্বাদ’ (১৯৬৫) । শম্ভু মিত্র ‘গর্ভবতী বর্তমান’ ও ‘অতুলনীয় সম্বাদ’ একাঙ্কিকা দুটি লেখেন সুরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ছদ্মনামে । গ্রন্থভুক্তি কালে (বৈশাখ, ১৪০০) এদের তিনি চিহ্নিত করেছেন ‘কৃষ্ণকৌতুকীয় নাটিকা’ বলে । যাকে নাটকীয় পরিভাষায় বলে ‘ব্ল্যাক কমেডি’ । ব্ল্যাক কমেডির মধ্যে কমেডির বৈশিষ্ট্য আপাতভাবে বজায় রেখে ভেতরে ভেতরে সমাজ ও জীবনের গুঢ় গম্ভীর, বিকট এক কৃষ্ণচ্ছায়ার আভাস সঞ্চারিত রাখা । ফলে কমেডির কৌতুকময় সুখকর রূপের মধ্যে জটিলতাপূর্ণ এক অশুভ-সংকেত উঁকি দেয় । গর্ভবতী বর্তমান এবং ‘অতুলনীয় সম্বাদ’ নাটিকা দুটির মধ্যে ব্ল্যাক কমেডি বার কৃষ্ণকৌতুকীয় নাটকের এই বৈশিষ্ট্য বর্তমান । গর্ভবতী বর্তমান’-এ মধ্যবিত্ত মানুষের সুখ-সন্ধানের বিপন্ন অস্থিরতা প্রকাশ পেয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক ডামাডোলের পটভূমিতে । ‘অতুলনীয় সম্বাদ’-এ প্রেম-বিবাহ- সংসার-সন্তান-সন্ততি প্রবাহিত জীবনে দুর্নীতি ও অনাচারকে চেপে রেখে বহিরঙ্গে নীতির মহিমা কীর্তনের এক হাস্যকর প্রয়াস ।

আর ‘চাঁদ বণিকের পালা’ নাটকটি বাংলা নাট্য-সাহিত্যের ইতিহাসে এক আশ্চর্য সুন্দর সৃষ্টি । নাটকটি ‘বটুক’ ছদ্মনামে ছাপা শুরু হয়েছিল । ১৯৬৫ সালে নাটকটির । প্রথম পর্ব ‘বহুরূপী’ নাট্য পত্রিকার ২৩তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় । দ্বিতীয় পর্বাংশ বহুরূপী’র ২৪তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে ।

মনসামঙ্গল কাব্যের চঁদ সদাগরের কাহিনিকে আশ্রয় করে এই নাটকের মধ্যে দিয়ে নাট্যকার প্রকাশ করেছেন আধুনিককালের কিংবা সর্বকালের এক মহাকাব্য । মূল কাহিনির অনেক রদবদল করে  দেশকাল সম্পর্কে নিজস্ব অভিজ্ঞতা, দর্শন, উপলব্ধি  ও অনুভবের  এক গভীরতম কাহিনি শম্ভু মিত্র আমাদের শুনিয়েছেন ‘চাঁদ বণিকের গালা’তে । জীবনের, সমাজের অনিবার্য, অমোঘ কত প্রশ্ন, কতরকম উপলব্ধি, কত রহস্যের সংবাদই না রয়েছে এই নাটকে । নীতিহীনতার বিরুদ্ধে, অজ্ঞানের বিরুদ্ধে, আন্ধকারের বিরুদ্ধে ‘চাঁদ বণিকের পালা’ এক সুগভীর প্রতিবাদ । নাটকের শুরু চাঁদ বণিকের অভিযানের প্রস্তুতি দিয়ে, তারপর সাগর-যাত্রা, সাগরে দুরন্ত ঝড়ের মধ্যে, প্রচণ্ডতম বিরুদ্ধতার মধ্যে এ পাড়ি দেওয়ার বিফলতাও যেন বিফলতা নয়, পরাজয়ও পরাজয় নয় । কারণ চরম দুর্যোগ ও বিরুদ্ধতার মধ্যে মানুষের অভিযাত্রী অন্তর তো থেমে থাকতে পারে না তাহলে তো থেমে যাবে জীবনের প্রবহমানতার শাক্ত, তাহলে তো স্তব্ধ হয়ে যাবে জীবনের মহত্তর রূপের আবিষ্কারের ইতিহাস । তাই এই নাটকের একেবারে শেষে চাঁদ সব হারিয়েও বলতে পেরেছে—

“চাঁদ  ।।      আমরা ক’জনা প্রেতের মতন চিরকাল পাড়ি দিয়্যা যাব । আমাদের

                কেউ নাই, কিছু নাই । নাোঙর তো কেট্যে দেছে শিব।—প্রস্তুত

সবাই? হৈ-ঈ-ঈ-য়াঃ । কতো বাঁও জল দেখ । তল নাই ?– পাড়ি দেও । এ আন্ধারে চম্পকনগরী তবু পাড়ি দেয় শিবের সন্ধানে । পাড়ি দেও— পাড়ি দেও—” ২২

‘চাঁদ বণিকের পালা’-র চাদের মতো প্রত্যেক মানুষের জীবনই বোধহয় এমন এক পাড়ি দেবার কাহিনি— অন্ধকার থেকে আলোতে, অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানে । পথ চলতে চলতে, পথের বাধায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতে গড়ে ওঠে একজন মানুষের নিজস্ব জীবনবোধ বা দর্শন—

“চাঁদ  ।।      কিন্তু এটাও যেন ভাই বেভুল না হয়, যে, আমাদের পথে হোল

                দুরুস্তর বাধা । সমাজে, সংসারে,— দেখো, সবায়ে তো আমাদেরে

                খালি অপবাদ দিবে । আপন ঘরের লোকে, আত্মীয় স্বজনে,

                আমাদেরে খালি গালমন্দ দিবে । কেননা, তুমি যে শিবের ভজনা

                করো । যেটা সত্য মনে করো সেটারে যে তুমি মন খুল্যে সত্য

বলো । এইট্যাই অপরাধ ।… আমাদের পথ সত্য, চিন্তা সত্য, কর্ম

সত্য । আমাদের জয় কেউ ঠেকাতি পারে না ।” ২৩

নাটকের শুরুতেই চাঁদের এই বক্তব্য থেকে আমাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, একেবারে সম্পূর্ণভাবে বৈপরীত্যহীন একরৈখিক মহাসর্বনাশকে, সেই মহাসর্বনাশের গহ্বরে লুকিয়ে থাকা অতল অন্ধকারকে নাট্যকার দেখতে পাচ্ছেন, অন্ধকারকে দেখাতে চাইছেন ‘চাঁদ বণিকের পালা’য় ।

সত্যতাকে সম্বল করে বুকভরা প্রত্যয় নিয়ে সমুদ্রের বুকে পাড়ি দেবার সংকল্পে দলবলসহ এগিয়ে এসেছিল চাঁদ, স্বপ্ন ছিল চাদের ভাবনা বাস্তবায়িত হবে । কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে ঘটে উল্টো । চাঁদের এই ব্যর্থতা, তার সর্বহারা হয়ে যাবার ইতিবৃত্ত যেন আমাদের ব্যর্থ জীবনের ইতিবৃত্তের সঙ্গে মিলে যায় । সত্য পরাজিত হবে, এ কথা কখনো মেনে নিতে পারে না, তাই সে বলে—

“চাঁদ   ।।      মিথ্যা যতোই কেন প্রবলপ্রতাপী হোক, তবু সে ভঙ্গুর, অবশেষে

                সত্য জয়ী হয় ? জীবনে সত্যের জয় অবশ্য, নিশ্চিত ?” ২৪

এর উত্তরে বল্লভাচার্য বলে—

“বল্লভ  ।।     …ইতিহাস খুল্যে দেখো, অবশেষে চিরকাল মিথ্যা জয়ী হয়্যা এল ।

                রামচন্দ্র জানকীরে উদ্ধারের লেগ্যে পুণযুদ্ধ করে, কিন্তুক, সে জয়

                তো সাময়িক । প্রজাদের মিথ্যা কুৎসা শুন্যা গর্ভবতী পত্নীট্যারে

                পুনরায় বনবাসে দিতে হয়। সেই হোল অবশেষ । কার জয় হয় ?

                সেই অবশেষে ?– কুরুক্ষেত্রে ধর্মযুদ্ধ হোল, কতো বীর অকাতরে

                প্রাণ দিল,— ধর্মরাজ্য স্থাপনের লেগ্যে । কিন্তুক, কোথায় ? সেই

                ধর্মরাজ্য ? এ ভারতে এখনো কি এল ? ভুল, ভুল, পৃথিবী যেখানে

                ছিল সেখানেই আছে । কুচরিত্রা মন্থরার পরামর্শে কৈকেয়ীরা একদিন

                রামচন্দ্রে বনবাসে দেয়,— আর তারেপর আরদিন কুৎসাকারী

                প্রজাদের কথা শুন্যে রামচন্দ্র জানকীরে বনেতে পাঠায় । এই হয়

                অবশেষে । কার জয় হয় ?” ২৫

অবশ্য চাঁদ পথ চলতে চলতে লক্ষ করে কীভাবে ‘আমাদের আধুনিকতা নষ্ট হয়্যা যায়’ । চাদের জীবনের টানাপোড়েনের সঙ্গে আমাদের জীবনের সমস্যা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । সমাজে কোনও, ‘জ্ঞানের সম্মান নাই, বিদ্যার মর্যাদা নাই, সুভদ্র আচার নাই, সুভাষণ নাই, মাংস সুখ ছাড়া অন্য কোনো সুখচিন্তা নাই’– এই উপলব্ধি যেমন চাঁদের তেমনি তা আমাদেরও। চাদের এক সময়ের গুরু বল্লভাচার্যও এক সময় বলে—‘আদর্শের পাছে ছুট্যে কোনো লাভ নাই’ । তবুও চাঁদ তার নিজের সংকল্পে দৃঢ় থাকে । এমনকী তার ছয় পুত্রের মৃত্যুও তাকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি । সে বলেছে—

“চাঁদ    ।।     হয়তো-বা আরো পুত্র যাবে । হয়তো-বা আমরাই কতো জনা যাব ।

                তবু যদি আমরা সকলে আজ পাড়ি দিতে পারি— তাইলে যে, তারি

                মধ্যে আরো কতো পুত্র বেচ্যে যাবে ! সেই সব বীজগুলা একদিন

                গাছ হবে, মহীরুহ হবে, ফল দিবে, ছায়া দিবে, আমার দেশের মুখ

                হাসিতে ভরাবে । ভাইরে, আমি জানি, আমার এ দেশের অন্তর মরে

                নাই । সে তো আমাদেরে ডাকে । চলো, চলো, চলো—” ২৬

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিবদাস ছাড়া অন্য সঙ্গীরা চাঁদকে ছেড়ে চলে যায় । চাঁদ অনুভব করে সে একা হয়ে যাচ্ছে—

“চাঁদ   ।।      শিবদাস, আরো কতোবার এইমতো হবে বলো দেখি ? এই যে,

                সকলের বিশ্বাস হারাবে,— বারে— বারে সকলেই নাও ছেড়্যে চলে

                যেতে চাবে, আর আমি বারে— বারে বাক্যজাল বুন্যে, যুক্তি দিয়্যা,

                কথকতা দিয়্যা, তাদের পড়ন্ত মন উৎসাহিত করে-কর্যে যাব ?

                আমারও যে ক্লান্ত লাগে । আর তো পারিনে শিবদাস ।” ২৭

এই একাকিত্বের জগতে চাঁদ সম্পূর্ণ নগ্ন, একেবারেই নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ । এতটাই একা যে জ্বলন্ত ক্ষতের পরে এতটুকু শুশ্রুষা কামনা করে সে স্ত্রী সনকার কাছে এসে দাঁড়ায়—মনসাভক্ত সনকার কাছে যে ন্যূনতম আশ্রয়টুকু পায় না । চাদের গুরু বল্লভাচার্য পর্যন্ত বাস্তব অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’ হয়ে সে চাঁদকে বোঝানোর চেষ্টা করে । তার ছেলে লখিন্দর পর্যন্ত তাকে ব্যঙ্গ করতে ছাড়ে না । এত কিছুর পরেও চাঁদ বিশ্বাস হারাতে নারাজ । জীবনের কেন্দ্রে কোনো এক মহৎ সত্যের ওপর বিশ্বাস ছিল চাঁদের, তাই অর্থহীন, যুক্তিহীন অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণে রাজি হয়নি সে । কিন্তু এক সময় সনকা যখন চাঁদকে বলে—

“আগুকার কথা হোল তুমি অহঙ্কারী। আপনার অহঙ্কার তোষণের তরে তুমি লড়াই করেছ ।” ২৮

আত্মানুসন্ধানে ব্যস্ত চাঁদ তখন শিহরিত হয় সনকার কথায় । কেননা সে যা চেয়েছিল তা তো কেউ বোঝেনি, চাঁদ তো শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জয় চায়নি । আসলে বড় কোনও লক্ষ্য নিয়ে জীবনকে কেউ যখন এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, সে চাওয়া কি শুধু ব্যক্তিগত থাকে ? তার আন্তরিক আপ্রাণ প্রচেষ্টা কি শুধু ব্যক্তিগত তাগিদ ? অথবা তার ব্যর্থতা কি শুধুমাত্র ব্যক্তির ব্যর্থতা ? চাঁদ কখনোই তা ভাবে না, বরং চাদের মহত্বই প্রকাশিত হয় তার কথায়—

“…যা কিছু আমার আছে সমস্ত উৎসর্গ করা দেউল্যা হয়্যা যাব,— যাতে ভবিষ্যৎ একদিন রঙেতে রঙীন হয়, যাতে চম্পকনগরী সুস্থ, মুক্ত, অনর্গল হয়্যা । যেতে পারে ।— সেদিন আমারে যদি ভুলে যায় লোকে,— যাক, ভুল্যে যাক ।… আমি কিছু চাইনেক । শুধু হোক । শুধু সেই ভবিষ্যৎ সত্য হোক ।” ২৯

শেষ পর্যন্ত পরাজয় হয় চাঁদের । যুক্তিহীনতার কাছে, মিথ্যার কাছে মাথা নত করতে হয় তাকে । তাকে নিচু হতে হয়েছে অমঙ্গলের কাছে, অন্ধকারের কাছে । অবশেষে চাঁদ ক্ষতবিক্ষত চিত্তে মনসার পুজো দেয় । এই সময়ে চাঁদের অভিব্যক্তি আর্তনাদের মতো শোনায়—

“চাঁদ    ।।     (দু-হাতে তার মাথাটা ধরে প্রায় ফিস্ ফিস্ করে শুরু করে) আমি

                পূজা দিব । পূজা দিব । জানিনে তো সে মানুষ আছি কিনা । তবু পূজা

                দিব । (বেহুলাকে ছেড়ে) জীবনের থিক্যা অঙ্ক কষ্যা-কষ্যা শিবাইয়ে

                পৌঁছাতে চাই, সেথা শিবাই মেলে না । আর শিবায়ের থিক্যা অঙ্ক

                কষ্যা-কষ্যা জীবনে পৌছাতে চাই, দেখি জীবন মেলে না ।” ৩০

কিন্তু চাঁদের মনসাকে পূজা দেওয়াও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচালো না, বিষ খেয়ে মারা গেল বেহুলা— লখিন্দর । এবারে আক্ষরিক অর্থেই চাঁদ একা হল—

“চাঁদ   ।।      এট্যাও বিফলে গেল !— পূজা দেওয়া হোল । তবু যেন পূজা দেওয়া হয় নাই । পাড়ি দিয়েছিনু, তবু যেন পাড়ি দেওয়া হয় নাই । ঘর বেন্ধেছিনু তবু যেন ঘর বান্ধা হয় নাই । তুমি তো উলঙ্গ শিব তাই মোরে বুঝি উলঙ্গ করাতে চাও ? চাঁদ বণিকের সব পরিচয়— যেন জলের আল্পনা ? সব মুছে দিতি চাও ? দেও ।” ৩১

তবে, এমন শোচনীয় পরিণামের পরে, এমন মর্মন্তুদ হাহাকারের পরেও একবারের

জন্যও মনে হয় না এই ঘৃণ্য পৃথিবী বাসযোগ্য নয় । গভীর অন্ধকার বুকে নিয়েও ‘চাঁদ বণিকের পালা’ শেষপর্যন্ত এক জীবনবোধ, অন্যতর এক জীবনস্পর্ধা জাগিয়ে তোলে আমাদের অনুভবে, এ নাটকের অন্তর্নিহিত এক সূক্ষ্ম ভালোবাসার উচ্চারণে ব্যক্তি সম্পর্ক থেকে জেগে ওঠা এক পরম মমতাময় নগ্নতায় আমাদের মনেপ্রাণে এক জীবনস্পর্ধাই উচ্চকিত হয়ে ওঠে । ‘চাঁদ বণিকের পালায় মৃত্যর বীভৎস প্রেক্ষাপটে বেহুলা-লখিন্দর যেন পরস্পর বলে ওঠে, ‘এত ভালো কেউ কারে কোনোদিন বাসেনি কখনো অথবা, আমরা দুজনা যেন ভালোবেস্যা বেস্যা মরে যেতে পারি’– তখন আমরা বুঝতে পারি মনসার চরম আধিপত্য সত্ত্বেও ‘সুন্দর জীবন’ আছে । আবার সনকা চাঁদকে যখন বলে, ‘আজ চলো— সব কিছু ছেড়া দিয়্যা দুইজনা চল্যে যাই’— তখন মনে হয় এই প্রশান্তিময় কথা শোনার জন্যই পৃথিবীতে বারে বারে জন্মাননা উচিত । তখন পৃথিবীর সমস্ত আবিলতা, মলিনতা দূরে সরিয়ে রেখে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শাশ্বত ভালোবাসা ।

এই নাটকে শেষ পর্যন্ত কোথাও উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া বা জয়ী হওয়াটা বড় হয়ে ওঠে না, বড় হয়ে ওঠে পথ চলা, শুধু জীবনসমুদ্রে পাড়ি দেওয়া, নতুন সম্পদের সন্ধান করা । সব মিলিয়ে নাটকটি শম্ভু মিত্রের এক স্মরণীয় কীর্তি এবং আমাদের বাংলা নাট্য-সংসারের এক বিশাল সম্পদ । তবে কোনও কোনও নাট্য-সমালােচক এ নাটকের কিছু ত্রুটি লক্ষ করেছেন—

“প্রথমত, নাটকটির আত্যন্তিক দীর্ঘতা । দ্বিতীয়ত, বড় বড় শিথিলগতি অনাটকীয় সংলাপের প্রাচুর্য । তৃতীয়ত, নাটকের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় লোকের অবান্তর কথাবার্তার বাহুল্য । চতুর্থত, মূল একটি অবিচ্ছিন্ন কাহিনি দুই বিরুদ্ধ শক্তির ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়া অনিবার্য পরিণতি লাভ করে নাই । পঞ্চমত, খোলা ও স্থির মঞ্চে বহুবিস্তৃত জনস্থলের ঘটনা দৃশ্য পরিবেশ না আনিয়া এবং বিরতি না দিয়া মঞ্চে বিশ্বাসযোগ্য রূপে উপস্থাপন করা প্রয়োগের দিক দিয়া খুবই সমস্যাপূর্ণ ব্যাপার ।” ৩২

‘চাঁদ বণিকের পালা’ নাটকটির ক্ষেত্রে ড. অজিতকুমার ঘোষের এই মন্তব্য সঠিক হলেও ““চাঁদ বণিকের পালা’ আমাদের সমকালের ‘ওডেসি’। বিষয়ে, গঠনে এ এক মহাবিস্ময় ।” ৩৩ শুধু তাই-ই নয় রবীন্দ্রনাথের পর এমন স্মরণীয় বাংলা নাটকের অন্য দৃষ্টান্ত মেলে না বললেই চলে ।

উপসংহার

অণু-গবেষণার শেষে এসে যে দু-একটি কথা আমরা আমাদের মতো করে বলতে চাই তা হল, বাংলা নাটকের গজতে শম্ভু মিত্র যথা অর্থে সফল নাট্য ব্যক্তিত্ব । তাঁর নাট্যজীবন নিয়ে কোনও কোনও সময়ে বিতর্ক হয়েছে বটে তবে তা তাঁর লক্ষ্য থেকে তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি । তিনি একদিনে সংগঠন তৈরি করছেন, তাঁকে সফল করতে নিজেই বিদেশি নাটকের রূপান্তর করে মঞ্চায়ন করছেন ; কখনও বা স্রোতের বিপরীতে হেঁটে রবীন্দ্রনাটককে পেশাদারি নাটক হিসেবে দর্শকের দরবারে এনে ফেলেছেন । আবার কখনও নিজেই লিখে ফেলেছেন  ‘চাঁদ বণিকের পালা’র মতো কালজয়ী নাটক । তবে যে বিষয়টি আমরা আরও গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি, তা হল তিনি যে যে নাটক বেছে নিয়েছেন বহুরূপীর জন্য বা লিখেছেন সেগুলোকে পাশাপাশি  রাখলে বোঝা যায়, তিনি যুদ্ধে নেমেছেন নাটক নিয়ে । এ-যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আসাম্যের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় শোষণ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে । এক্ষেত্রে তার অস্ত্র শুধু নাটক । রক্তকরবী, রাজা, দশচক্র, কাঞ্চনবেদ, রাজা অয়দিপাউস, গর্ভবতী বর্তমান, চাঁদ বণিকের পালা— এই নাটকগুলোর বিষয় থেকেই স্পষ্ট হয়— তিনি একটা সমাজ সংস্কারের তাগিদ অনুভব করেছেন, সামাজিক শোধনেরও তাগিদ অনুভব করেছেন । সে কারণেই এমন সব নাটক নির্বাচন করেছেন তিনি । আর একটা ব্যাপারও আমাদের মনে হয়েছে, তা হল, তার অতি উচ্চ সৃজনশীলতার দিক । যে সমস্ত নাটকগুলির উল্লেখ করা গেল আগেই, তার প্রতিটি নাটকের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন । প্রসঙ্গত বলা যায়, ‘নবান্ন’ নাটকের ক্ষেত্রে ঘূর্ণায়মান মঞ্চের ব্যবহার সেসময় ছিল অভিনব । এছাড়া নিখুঁত পরিপাট্য তার নাটকের এক বিরাট গুণ । সবশেষে যেটা বলা যায়, তা হল, শম্ভু মিত্র বাংলা-নাট্যের ক্ষেত্রে এক প্রতিষ্ঠান ! মহীরূহ । তাঁর মতো নাট্যব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যত বেশি আলোচনা ও গবেষণা হবে ততই নতুন নতুন দিক পাঠকের সামনে উঠে আসবে । তা বাংলা নাটকের পক্ষে সত্যিই এক সদর্থক দিক । আমরা আমাদের অণু-গবেষণায় বহুরূপী ও শম্ভু মিত্র সম্পর্কে এই কথাগুলিই বলবার চেষ্টা করলাম ।

গ্রন্থপঞ্জী :

১)     ভিন্ন এক নাট্যের স্বপ্ন ও সৃজনশীল শম্ভু মিত্র, রায় কুমার, পশ্চিমবঙ্গ, শম্ভু মিত্র

        স্মরণ সংখ্যা, ১৪০৭, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, পৃ: ৫

২)     ভূমিকা, সম্মার্গ সপর্যা, মিত্র শম্ভু এম সি সরকার এন্ড সনস প্রাঃ লিঃ, কলকাতা

        ১৩৯৬,  পৃ: ১০

৩)     বিসর্জন, ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বভারতীর, পৌষ ১৪০৫, পৃ: ১১৫

৪)     বিসর্জন, স্মারক পত্র, বহুরূপী, ১৯৬১

৫)     বিসর্জনের অসাধারণ অভিনয়, মঞ্চ যুগান্তর, ১৯৬১

৬)     Theatre, Thought, November 25, 1961

৭)     ক্যাপিটাল পত্রিকা, ১৮ নভেম্বর, ১৯৬১

৮)     যুগান্তর, ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৬১

৯)     গ্রন্থ পরিচয়, রাজা, ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বভারতী, মাঘ ১৩৯২

১০)   রাজা, ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বভারতী, মাঘ ১৩৯২, পৃ: ২৮

১১)    শম্ভু মিত্র ও অন্ধকারের নাটক, রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ, শম্ভু মিত্র স্মরণ

        সংখ্যা, ১৪০৭, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, পৃ: ৯১

১২)   আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৭ জুন, ১৯৬৪

১৩)   নাচঘর, ২৩ ফাধন ১১৩৬, ১৯২৯

১৪)    শৌভনিকের রবীন্দ্রনাট্য প্রযোজনা, প্রতিবেদন, দাস নিবেদিতা, নবম নাট্যোৎসব

        উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারক পুস্তিকা

১৫)   ১৯৫২ সালের ১ জুন শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় বহুরূপী প্রথম অনুবাদ নাটক মঞ্চস্থ

        করেন শ্রীরঙ্গমে । ইবসেনের ‘An Enemy of the People’-এর বাংলা রূপান্তর

        করেন শান্তি বসু, নাম দেওয়া হয় ‘দশচক্র ।

১৬)   দশকের ব্যবধানে দশচক্র : মজুমদার স্বপন, ‘বহুরূপী’, ৩৮, মে ১৯৭২, পৃ: ৮৬

১৭)    যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১

১৮)   দেশ, ২৫ জুন ১৯৬৪

১৯)   শম্ভু মিত্র ও অন্ধকারের নাটক, গঙ্গোপাধ্যায় রঞ্জন, পশ্চিমবঙ্গ, শম্ভু মিত্র স্মরণ

        সংখ্যা, ১৪০৭, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, পৃ: ৯০

২০)   শম্ভু মিত্রের প্রযোজনা : নির্মাণ ও সৃজন : রায় কুমার, বাংলা আকাদেমি পত্রিকা ৪,

        পৃ: ৩২৭

২১)   দেশ, জুন সংখ্যা ১৯৬৭

২২)   চাঁদ বণিকের পালা, মিত্র শম্ভু, দশম সংস্করণ, বৈশাখ ১৮২৬, এম. সি, সরকার

        অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, পৃ: ১৩১

২৩)   তদেব, পৃ: ১৪

২৪)   তদেব, পৃ: ২৪

২৫)   তদেব, পৃ: ২৪

২৬)   তদেব, পৃ: ৩৫

২৭)   তদেব, পৃ: ৪০

২৮)   তদেব, পৃ: ৬৯

২৯)   তদেব, পৃ: ৮৪

৩০)   তদেব, পৃ: ১২৮

৩১)   তদেব, পৃ: ১৩১

৩২)   বাংলা নাটকের ইতিহাস, ঘোষ ড. অজিতকুমার, প্রথম দে’জ সংস্করণ : কলকাতা

        পুস্তক মেলা, জানুয়ারি ২০০৫, পৃ: ৪৫০

৩৩)  নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ, চট্টোপাধ্যায় মোহিত, নাট্যচিন্তা ফাউন্ডেশন। কলকাতা,

        জানুয়ারি ২০০৬, পৃ: ৮১

গবেষক :  কৃষ্ণপদ দাস

রিসার্চ স্কলার (বাংলা বিভাগ) বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়,

৪৩৯, কালিকাপুর রোড, পোঃ মুকুন্দপুর,

২ নং ইস্টএন্ড পার্ক, ফ্ল্যাট নম্বর (জি-১), কলকাতা – ৭০০০৯৯

ফোন নম্বর – 7003787726/ 9836680333

E-mail : krishnapadadas57@gmail.com

————————————————————————————————————————-

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

বাঙালির নবজাগরণের গান

ড.শ্রাবণী সেন

সহকারী অধ্যাপিকা, সঙ্গীত বিভাগ,তারকেশ্বর ডিগ্রি কলেজ,তারকেশ্বর,হুগলী

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের রচিত বাংলা গান হচ্ছে প্রেম, স্বদেশী ও হাসির গান -  ফুলকিবাজ

বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক অর্থে স্বদেশেচেতনার আবির্ভাব ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে।বস্তুত স্বদেশেতনা ও জাতীতাবোধর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উথ্থান ও তাদের ধারাবাহিক উপস্হিতি। তার আগে দেশে ছিল শুধু উচ্চবিত্ত আর বিত্তহীন,ভূস্বামী আর ভূমিদাস।সেই শতকের বাঙালি ইউরোপীয় সাহিত্যের স্বদেশপ্রেমে জারিত উদ্দীপনামূলক সাহিত্য থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে। এ বিষয়ে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছিল স্কট, বায়রনদের কবিতা। এ সবের সমাহারই উনিশ শতকে বাঙালীর মনে স্বদেশচেতনার সঞ্চার করেছে, যা প্রতিফলিত হয়েছে কাব্যে বা গানে।

বাংলা দেশাত্মবোধক তথা মুক্তির গানের  প্রধান উৎস ছিল বাঙালির পরাধীনতাজনিত বিপর্যস্তবোধ। আমাদের দেশাত্মবোধক কবিতায় ও গানে বেদনা বিধুর সরের প্রাধান্য ছিল ঊনবিং শতকের চতুর্থ দশক পর্যন্ত। দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘নীলদর্পণে'(১৮৬০) নীলকর-নির্যাতিত গ্রামবাংলার চাষীদের দুঃখবেদনা ভাষার মধ্যে দিয়ে সমাজচেতনার দ্বারোদ্ঘাটন ঘটে।নীল-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলার নিপীড়িত চাষীদের আন্দোলনের সূত্র ধরে বাঙালির স্বদেশ সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি ঘটে এবং এই পটভূমিতেই বাংলা দেশাত্মবোধক কবিতা ও গানের সূত্রপাত হয়।

ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় স্বদেশিকতার প্রথম স্পন্দন ধরা পড়ে।পরে রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়,হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়,মধুসূদন দত্ত,নবীনচন্দ্র সেন প্রমুখের কাব্যের জাতীয়তাবাদ সেই স্পন্দনের গতিকে বাড়িয়ে তুলেছিল। ক্রমশ কবি এবং গীতিকারেরা এই জাতীয় গান রচনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ায় বাংলা সঙ্গীতে এক নতুন ধারার সংযোজন ঘটৈ।

বাংলাসাহিত্যের নতুন আয়োজনে দেশাত্মবোধক গানের ধারা গতি পেয়েছিল।নতুন কণ্ঠস্বর ব্যপকতা ও ধারাবাহিকতা পেল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘স্বদেশ’,’মাতৃভাষা’, মাইকেল মধুসূদন দওের ‘ভারত-ভূমি’, ‘বঙ্গভাষা’,’কবি-মাতৃভাষা’ ইত্যাদি কবিতায়। এভাবে দেশভক্তি, মাতৃভক্তি এবং মাতৃভাষাপ্রীতি ফুটে উঠতে থাকে কবিতায়।এরই সঙ্গে ঘটে বাংলা দেশাত্মবোধক গানের আবির্ভাব।মাতৃভূমির সঙ্গে ভূমিসন্তানের নাড়ীর সম্পর্কবোধ এই নবচেতনার অন্যতম লক্ষণ। মাতৃভাষার চেতনা নিধুবাবুর (১৭৪১-১৮৩৯) গানেও প্রকাশ পেয়েছে-

নানান দেশের নানান ভাষা।

  বিনে স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা।।……

অতুল প্রসাদ সেন
Rajanikanta Sen : এই গানেই রজনীকান্ত হয়ে ওঠেন কান্তকবি, স্বদেশী আন্দোলনে  যার ছিল বিশেষ ভূমিকা - Rajanikanta Sen Bengali Poet Became Kantakabi After  Writing Mayer Deoa Mota Kapor prb - Aaj ...
রজনীকান্ত সেন

বাঙালীর নবজাগরণের গানের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা হিন্দুমেলা থেকেই শুরু।এই মেলার প্রথম সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুড়তুতো ভাই গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪১-১৮৬৯)। নতুন উদ্দীপনায় উদ্বুদ্ধ এই হিন্দুমেলাকে উপলক্ষ্য করেই স্বদেশী গান রচনার সূত্রপাত ঘটে এবং সঙ্গে সঙ্গে এই নবচেতনার গান রচনার প্রয়াস লক্ষ্য যায়।মেলার প্রথম সম্পাদক গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম অধিবেশনের জন্য গান লিখেছিলেন –

লজ্জায় ভরতযশ গাইব কি করে।

লুটিতেছে পরে এই রত্নের আকরে।।….

গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা মনোমোহন বসু বাংলা দেশাত্মবোধক গান রচনায় বিশেষ স্হান অধিকার করে আছেন। মনোমোহন বসুর বেশীরভাগ গানেই পাওয়া যায় সমসাময়িক ঘটনার প্রকাশ।  মনোমোহন বসু রচিত কয়েকটি গান  নবজাগরণের গানের ইতিহাসে অমূল্য হয়ে রয়েছে। তাঁর রচিত এই গানটি একাধিক অধিবেশনে গাওয়া হয়-  

দিনের দিন সবে দীন হয়ে পরাধীন

অন্নাভাবে শীর্ণ, চিন্তাজ্বরে জীর্ণ অপমানে তনু ক্ষীণ।…..

গানটিতে পরাধীন ভারতের দারিদ্রতা ,হীনতা, দুঃখ-যাতনার মর্মম চিত্রফুটে উঠেছে।

মনমোহন বসু

হিন্দুমেলার যুগ থেকে শুরু করে যেসব গান রচিত হয়েছে তাতে অখণ্ড ভারতবাসীর স্বাজাত্যবোধের উদ্দপনা উণ্মেষের রূপটি প্রকাশিত হয়েছ। রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের (১৮২৭-১৮৮৭) ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে’ গানটিতে পরাধীনতার থকে ‘ক্ষণিকের স্বাধীনতা’য় স্বর্গসুখের আস্বাদনের ছবি ফুটে উঠেছে। ১৮৬৮ হিন্দুমেলার দ্বিতীয় অধিবেশনের উদ্বোধনী সংগীতরূপে গীত হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত-

মিলে সবে ভারত সন্তান       এক তান মনপ্রাণ

গাও ভারতের যশোগান।……

হিন্দুমেলা উপলক্ষ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন –

মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি

    রাত্রি দিবা ঝরিছে লোচন বারি।।….

গানটিতে ভারতবর্ষকে ক্রন্দসী জননীরূপে কল্পনা করে ভারত মাতার দৈন্য, হতাশা ও বিষাদকে গানের সুরে রূপ দিয়েছেন।

গোবিন্দচন্দ্র রায় লিখেছিলেন –

কতকাল পরে,বল ভারত রে

    দুঃখ সাগর সাঁতারি পা হবে।….

১৮৮১ সালের বঙ্গদর্শনে বঙ্কিমচন্দ্রের যুগান্তকারী ‘বন্দেমাতরম্’ গানটি মানুষের মনে বিশেষ সাড়া ফেলেছিল।

বন্দে মাতরম্

সজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং

শস্যশ্যামলং মাতরম্।……

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের দেওয়া সুরে বন্দে মাতরম্ গানটি পরিবেশন করেন।সেই থেকেই গানটির জনপ্রিয়তার সূত্রপাত এবং স্বদেশী সংগীতরূপে বিপুল প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের দেশভাবনা অভিব্যক্ত হয়েছে কাব্যে ও গদ্যে। হিন্দুমেলা, সঞ্জীবনী সভা প্রভৃতির পরিবেশে কবিগুরুর সৃজনী প্রতিভার উন্মেষ ঘটেছিল। ১৮৭৮ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ”জাতীয় সংগীত”গীতসংকলনের দ্বিতীয় সংকলনে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি স্বদেশীগান স্হান পায়।রবীন্দ্রনাথ রচিত কয়েকটি স্বদেশীগান-

১)তোমারি তরে,মা,সঁপিনু এ দেহ।

তোমারি তরে,মা, সঁপিনু প্রাণ।।

২) ঢাকো রে মুখ, চন্দ্রমা, জলদে।

৩)এক সূত্র বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন।

৪) এ কি অন্ধকার এ ভারতভূমি।

স্বদেশচেতনামূলক এই গানগুলো রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের ‘জাতীয় সংগীত’ শীর্ষক পর্বে সন্নিবেশিত হয়েছে।

রামপ্রসাদী সুরে গ্রথিত এবং কবির স্বকণ্ঠে গীত ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’ গানটি ১৮৮৬ সালে কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে পরিবেশিত হয়।বাংলা দেশের নিজস্ব রমপ্রসাদী সুরের কঠামোয় গানটিতে যে জাতীয় ঐক্যের সুর ধ্বনিত হয়েছিল তার আবেদনের গভীরতা অনেকদিন স্হায়ী হয়েছিল।

বস্তুত স্বদেশ চেতনামূলক গানের উণ্মেষ হিন্দুমেলার যুগে হলেও তার সার্থক বিকাশ ঘটেছে বঙ্গভঙ্গের যুগে। প্রথম যুগে প্রকাশ পেয়েছিল জাতীয় ভাবনার গান এবং দ্বিতীয় যুগে স্বদেশ চেতনা নিছক ভাবানুভূতির সঙ্কীর্ণ পরিমণ্ডল ছাপিয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল দেশসেবার বাস্তবিক কর্মপ্রেরণায়। এই ধারারই অনুসরণে ‘অসহযোগ’, ‘আইন অমান্য’ প্রভৃতি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণতা লাভ করে জাতীয় আন্দোলন। বলা যায় স্বদেশী গানগুলো রাজনৈতিক আন্দোলনে বাঙালিকে শক্তি যুগিয়েছে। ঊনিশ শতকের শেষ পর্যন্তই ছিল শুধু বন্দিত্বের আক্ষেপ।নবপর্যায়ে দেশাত্মবোধক গানে বিচ্ছিন্নতার পরিবরর্তে আসে একতা, নিষ্ক্রয়তার বদলে সক্রিয়তা, দেশমাতৃার প্রতি গভীর ভক্তি এবং আত্মীয়তাবোধজনিত স্বনির্ভরতার আকুলতা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল এ সবেরই ফলশ্রুতি। তারই সুন্দরতম  প্রকাশ ছিল রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে রাখীবন্ধনের উৎসব।এই পর্বেই বাংলাভাষার উৎকৃষ্টতম দেশাত্মবোধক গানগুলো রচিত ও গীত হয়েছিল, যেগুলো পরবর্তীকালে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেও প্রেরণা যুগিয়েছিল।এ যুগের নেতৃত্বে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ সময়ই তিনি তাঁর অধিকাংশ দেশাত্মোধক গান রচনা করেন।যেমন –

 ১)আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

   ২)ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।

    ৩)বাংলার মাটি বাংলার জল,বাংলার বায়ু বাংলার ফল।

                         ৪)আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি।

                         ৫)বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান।

                        ৬)সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।

          ৭)যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিচালিত একটি মাত্র ছবির শ্যুটিং হয়েছিল নিউ এম্পায়ারে |  New Empire is one of the legendary ones Rabindranath Tagore staged one of  his play here pb – News18 Bangla

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় যে সমস্ত গীতিকার উদ্দীপিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রধানতম হলেও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,অমৃতলাল বসু,রজনীকান্ত সেন,প্রমথনাথ চৌধুরী,অশ্বিনীকুমার দত্ত,সরলা দেবী,মুকুন্দ দাস,মনোমোহন চক্রবর্তী প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।এছাড়াও বহু অজ্ঞাত গীতিকারের রচনা নবজাগরণের গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছিল।

গীতিকার ও সুরকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দেশাত্মবোধক গানগুলো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে। ১)ধনধান্য পষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

            ২)বঙ্গ আমার!জননি আমার!ধাত্রি আমার!আমার দেশ

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশ পর্যায়ের আর একটি মৌলিক সৃষ্টি তাঁর হাস্যরসাত্ম গানগুলো।  বিলেত ফের্তা,নন্দলাল প্রভৃতি   গানগুলোতে শ্লেষ ও ব্যঙ্গের  মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছিলেন।

স্বদেশ চেতনা সরব করেছে ভক্তকবি রজনীকান্ত সেনকেও।বঙ্গবঙ্গ আন্দোলনের সময়  ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’গানটির আবেগময় স্পর্শে বাঙালি জাতির মধ্যে এক রোমাঞ্চকর  উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল।তাঁর কথায় সুরে রচিত গান –

১)নমো নমো নমো জননি বঙ্গ!

২)শ্যামল শস্যভরা

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলাভাষীদের প্রেরণা যুগিয়েছেন গীতিকার ও সুরকার অতুল প্রসাদ সেনের গান।

১)মোদের গরব মোদের আশা,

আ মরি বাংলা ভাষা!

                ২)হও ধরমেতে ধীর         হও করমেতে বীর,

              হও উন্নতশীর নাহি ভয়।

পরাধীনতার রাজনৈতিক অবিচার ও সামাজিক যায় বিচারের বিরূদ্ধে জনজাগরণে মুকুন্দদাসের (১৮৭৮- ১৯৩৪) সংগ্রামী ভূমিকা আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।তাঁর স্বদেশী গানগুলো এক সময় খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা প্রচারিত করতেন তাঁর গানগুলোতে।উচ্চ কণ্ঠে সুরের মাতনে মাতিয়ে দিয়ে বলতেন ‘আামি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম /তবে ফিরিঙ্গী বণিকের গৌরব রবি/অতল জলে ডুবিয়ে দিতাম’।প্রমথনাথ রায়চৌধুরীর বঙ্গ-বন্দনা ‘নমঃ বঙ্গভূমি শ্যামাঙ্গিনী’,’জাগরণী শুভদিনে শুভক্ষণে গাহ আজি জয়’,’হে মাতঃ বঙ্গ’ গানগুলো নিবিড় দেশপ্রেমে কালোত্তীর্ণ।

বিশ শতকের প্রথম দশকে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় আবেগময় দেশাত্মবোধ। বাংলার গানে  প্রকাশ পায় দেশমাতৃকার প্রতি গভীর ভক্তি। বিশ শতকের বিশের দশকের স্বদেশী আন্দোলন থেকেই বলতে গেলে বাঙালির অব্যক্ত জাগরণের গান সোচ্চার হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে অবিসংবাদিত নেতৃত্ব ছিল কাজী নজরুল ইসলামের।তিনি যেমন বিদেশী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে উদ্দীপক ছিলেন তেমনই রচনা করেছেন কৃষকের গান,শ্রমিকের গান,নারী জাগরণের গান,ছা্ত্রদলের গান,সৈন্যদলের গান। তাঁর পরাধীনতার শিকল ভাঙার গান হয়ে উঠেছিল সর্ব শ্রেণীর -শ্রমিকের, কৃষকের, নারীর, যুবকের, জেলের, তাঁতীর,সর্বহারার, মজুরের  মুক্তির গান। এছাড়াও নজরুল বিশেষ করে গাইলেন সম্প্রদায়িক হানাহানি আর সামাজিক অসাম্য থেকে মুক্তির গান।এই সোচ্চার কণ্ঠই আরো  জোরদার হয় চল্লিশের গণনাট্য-আন্দোলনে এবং দেশ স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে।এই গণসঙ্গীত আন্দোলন গড়ায় বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথানে এবং বাঙালির একাত্তরের স্বাধীনতাসংগ্রামে।পরাধীনতার মর্মবেদনার বলিষ্ঠ প্রকাশ নজরুলের গান।’কারর ঐ লৌহ কপাট’, ‘দুর্গমগিরি কান্তার মরু’, ‘এই শিকল পরা ছল’,’জাগো অনশন বন্দী’প্রভৃতি গানগুলো  সুরের ওজস্বীতায়,ছন্দের দীপ্তিমায় মুক্তির গানের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সংযোজন নজরুল ইসলামের গানগুলো। নজরুল ইসলাম গানের যে ধারার প্রবর্তন করেন তা ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সময় ও তার পরবর্তীকালেও অব্যাহত আছে।পরবর্তীকালে সলিল চৌধুরী,হেমাঙ্গ বিশ্বাস,বিনয় রায় প্রভৃতি অনেকেই এই ধারায় গান রচনা করে তাঁদের সৃজন প্রতিভার সাক্ষর রেখেগেছেন। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র রচিত ‘এস মুক্ত কর, মুক্ত কর অন্ধকারের এই দ্বার’ মুক্তির গানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে চিহ্ণিত হয়ে থাকবে।তাই বলা যায় গানগুলো সর্বকালের মানবের জাগরণের গান। ভাব,সুর ও ছন্দ মিশ্রিত এই গানের আবেদন তাই চিরকালীন।

জ্যোতিরীন্দ্র মৈত্র

তথ্যসূত্র

১।প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী – রবীন্দ্রসঙ্গীত-বীক্ষা কথা ও সুর।

২।শান্তিদেব ঘোষ – রবীন্দ্রসঙ্গীত।

৩।কিরণশশী দে – রবীন্দ্রসঙ্গীত সুষমা।

৪।অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত

৫।সুকুমার সেন – বাংলা সাহিত্যের ইতিাস (৩য়খণ্ড)।

e-mail- srabanisn1@gmail.com  Mobile no- 6290242709

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

Empowerment Through Struggles and Strifes – An Analytical Study of Mitra’s Putul Khela

SAYANTIKA GHOSH

Ph.D. Research Scholar, Rabindra Bharati University

Introduction

Tripti Mitra, popular Indian actress, who have gained esteemed position for the actresses in theatre including herself. She was the first Bengali actress to receive the opportunity of delegation in The World Theatre Conference In Bombay.  She has raised the platform for the women in theatre being the educated actresses during the time when social taboos forced women abjure from participating in Theatre.

Theatre is an art form which is the combination  of voice modulation, gesture, words, expression, movements to explain and express the meaning  of  the enacted story. This form is an vehicle through which the message for the society could be highlighted by flourishing their responsiveness and by graving their perception from someone’s else viewpoint. Voice Modulation, Postures, Movements of body parts plays an pivotal role in theatre. The vocal tune of Tripti Mitra swears that she has control on the ‘Low Octave’, ‘Mid Octave’, and ‘High Octave’.  She gave fair competition to the male actors in changing voice scale. Her performance in acting gave a new perception and switched from the heritage of acting in Bengali Theatre and encouraged other women to participate and explore their acting skills in theatre. She has put forth her hands for the other women from her family. She broke the stigma of the thought that women from the ‘Patita Palli’ participate in theatre to the women with high aesthetic appearance, good education and from good families do participate and with efforts have started winning the heart’s of the society.

In the play ‘Putul Khela’, Tripti Mitra with her performance have raised the question  of  empowerment in the minds of the women. It was first enacted on 12th January, 1998. Sombhu Mitra gave his own bengali touch to this play. Sombhu Mitra’s ‘Putul Khela’ is somewhat different from Ibsen’s ‘Doll’s House’. Mitra’s ‘Putul Khela’ , which in depth means “Puppet Play” or “Play with Doll”, according to him human beings are confined into unscrupulous and deteriorated society natural gestures like puppet or dolls. He also through his play highlighted on the ignorance or the institution of marriage, that is shown like marionette with full of recline and craftiness, being rolled on since ages where both the male and female partners are performing their respective characters.

The story of the play “Putul Khela” includes different  characters like – Bulu, Tapan, Dr. Ray, Krishna, Kestopada are the main characters of the play.

Bulu- The lead character.

Tapan – Bulu’s Husband.

Dr.Ray – Their family physician and Tapan’s friend.

Krishna – Bulu’s friend.

Kestopada – Tapan’s office Employee.

The play starts with the view of a room, decorated with many décor items, which reflects the good choice of both husband ans wife. This shows their beautiful  vision of their thought and perspective.

Highlighting on the women dramatis personae, Bulu the role played by Tripti Mitra , her character reflects a fun loving nature , not too serious about  anything in life, careless too. Her soul is defined like a child who dances within herself. But if concentrated very deeply within her, there is pain , uncertainty, a fear of skepticism , a nature of consciousness. The role of middle class family women were magnified where we notice Bulu brought many stuffs from the market at very low price, which were useful or will be for utilization in the coming days. She borrows money from Tapan, her husband but he never fails to criticize her by calling her ‘Uranchandi’. By this we can assume that he believes his partner to be a child or compare her nature with a child whom he feels who can’t  be patience or quite in nature or behaves maturely. This reflects the position of women how they were treated by the society. During the time period the term “Empowerment” or “Independent” were unknown to the women of the time period but somehow they managed to keep everyone pleased by performing every instruction thrown to them by society.

If seen minutely with keen interest we will get to see Tapan and Bulu shares a very healthy relationship from the outer coat but if we go through deeply we can find that Tapan has the basic characteristic of male dominating nature, he wanted Bulu to listen to every word dictated by him. He expected his wife to be totally dependent on him, also controlled the identity, self- independency of his wife. He never permitted her to express her opinion or thought instead discouraged and demotivated her.

He named his wife ‘Bulbuli’. The name Bulbuli is the name of a bird, whom we pet in our house, keep in cage, we make them chirp, dance as we want. This is how he compares his wife as a bird, who is caged in the house and wishes her to control as the human being controls the pet. This shows the relation the partners should share among themselves is lacking between them and instead of love we find the nature of predominance or the dictatorship of a husband towards his wife where he couln’t accept the independent nature of his wife.

As it is an women centric play where we see on one side she couldn’t control kestopada, the office employee of her husband who threatens her of informing Tapan about the money she has borrowed with high interest rate for Tapan’s treatment without his concern and on the other hand we find Tapan who is extremely dominating by nature always tries to control every word spoken by his wife. Women and sacrifices  are somewhat  interconnected. It is known to all the sacrifices made by the Goddess Sita, who by declining all convenience, glamour and her castle just to stay in expulsion along with her husband. In the time period of deportation Sita was captured by Ravana, the demon king of Lanka and prisoned her in his periphery for month in Lanka. When she wasset free from Lanka she had to prove her saintliness to her husband Lord Rama by giving fire crucible.

Sita is always known as or identified as the brave woman of remarkable artistry. She is known as the women of virtue and of immeasurable patience who has all the values that our society believed a woman should have. Similarly Bulu to save her husband borrows money cunningly with high interest rate . She took the risk for her husband without thinking twice anything about the consequences what would happen if her husband comes to know about the incident. She died every second within by thinking if her husband gets informed about the money then all her happiness will be ruined, it would shake her married life. She feared off loosing her husband as she had no one of her own except her husband and chidren after her father’s death, as it was believed a women is identified. But later when Tapan acquire the knowledge about the issue he then bursts out at his wife without letting her express her opinion or say. After knowing all the truth Tapan regerets for not believing his wife but Bulu now raises her voice by saying she wants to conclude everything as being an human being she acquires all right to live her life. Here dual side of a woman is portrayed. On one side a wife who believed that whatever the circumstances be’s her husband would trust her, would love her and would never leave her alone in any situation. The other side reflects the strength, the anger of a woman who after sacrificing mostly half the years of her life decides to find her own identity. She wants to think about only herself, to do something for herself who goes against  her husband, denies to think what society will say about her. She refuses to carry anything with herself from her husband’s house as this would hurt her self-esteem. She reused her children, her marriage and wipes off her sindur – which is believed as the recognition of a married woman and leaves the house.

Conclusion

In the Nineteenth Century, where we find women are instructed and performed  as puppet  in every role of life that too as a daughter, a sister or as a wife who is just like a doll cannot have their own house. The play didn’t meant to be a feminist schedule but the performance of Tripti Mitra has raised the play to the rising voice of a woman in terms of detecting her own identity.

Reference List

  • Ibsen Henrik,”A Doll’s House”,Maple Press Private Limited. ISBN:978-93-50330-68-5.
  • Tripti Mitra in the Realm of Bengali Theatre: An

         Interpretation of her Art and Role in Women’s Emancipation

        Sujit Kumar Pal, Bengali, Vidyasagar University, India

        Article Record: Received March 30 2016, Revised paper received May  20 2016, Final Acceptance June 3 2016

  • TRANSLATION AS INTERVENTION: SAMBHU MITRA’S PUTUL KHELA   (ADOLL’S HOUSE),Ahmed Ahsanuzzaman.
  • Guriya-Ghar: Tripti Mitra’s Take on Sambhu Mitra’s Putul Khela

         Ahmed Ahsanuzzaman.

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

Development and Growth of Schedule   Caste Women Empowerment in West Bengal

Bikash Chandra Mondal

Assistant Professor

Dinabandhu Mahavidyalaya

                                            ABSTRACT

            In West Bengal, most of the scheduled-caste women suffers from several harassment sand physical or mental assaults. Lack of education, economic stability and domination of males in the society are major reasons for which scheduled-caste women are getting harassed in several situations. This article gives a preliminary concept of women empowerment and how proper awareness and empowerment practices can change the situation of scheduled-caste women. Districts like Malda and Coochbehar have highest percentage of SC population which is nearly 50% and 16%. However, government policies such as microfinance programs, educational attainments and awareness campaigns can be beneficial to improve socioeconomic conditions of women and it can improve current situation of scheduled caste women in West Bengal in the upcoming future.

Introduction

In recent times, most of the states in India have understood the importance of overall growth of both male and females for future betterment of the society as well as the economic structure of the country. In this article, several aspects of empowerment of scheduled-caste women in different parts of West Bengal, will be discussed to get an idea regarding their current literacy, financial problems and areas for development.

The principal aim of this study is to determine the overall importance of the development of scheduled-caste women empowerment and how the government and non-government organizations can play an effective role in women empowerment.The objective of this particular paper is to discuss the current status of scheduled-caste women in different regions of West Bengal, India. This study is beneficial to describe several factors and role of the Government in developing women empowerment for scheduled-caste or SC women in both rural as well as urban areas of West Bengal.

Improper development of SC women in West Bengal has turned to be an issue as in modern society, still there are several women in mostly rural areas like Malda and Junglemahal who are getting harassed in the name of their castes and lower economic conditions. Women have not yet broken free from the prejudices and restraints of a patriarchal or male-dominated culture (Maity 101). In rural areas of West Bengal such as Junglemahal, several scheduled-caste women are getting harassed and assaulted both physically and mentally.

It has been an issue in contemporary times, as modern culture has already gone too far and it is not commendable that several women are getting harassed only because they are from different cultural or religious backgrounds. In West Bengal, several political conflicts, attacks from opposition and threats during elections have negative impacts on rural women. Several physical assaults and false obligations during political procession or demonstration are some of the growing problems that scheduled caste women have to face on a regular basis (Haldar 207).

Figure 1: Scheduled-caste population in various districts of West Bengal

(Source: Influenced from the view of Haldar 210)

This paper shades light on various aspects regarding development and growth of scheduled caste women in West Bengal.

Theoretical framework and review of literature

Women empowerment has turned out to be a popular topic in recent times as growing assaults and harassment on women have opened the eyes of society. In West Bengal, most of the scheduled-caste women are still facing challenges as most of their families do not allow them to study. In Junglemahal areas, there are several cases where male dominated society treats women like slaves and they are getting physically assaulted till now (Maity 101). That is why, it is the high times, where the government and non-government organizations need to implement new legislations and focus on overall development of scheduled-caste women to give them proper power with socio-economic stability. In Coochbehar district of West Bengal, most of the regional non-profit organizations are trying to implement microfinance policies which can be an effective strategy for socio-economic development of scheduled-caste women. Microfinance can be considered as a modern banking practice where women of scheduled class communities can get small amounts of loans without any collateral and they can deposit small amounts of money in return (Chakraborty and Sabyasachi 45).

Currently in West Bengal, Bagdi, Baiti and Bauri are some of the scheduled castes. Growing harassment and assaults on scheduled-caste women mostly in rural areas are growing at a rapid pace and that is why women empowerment is strictly required to provide social and economic stabilities to women who belong from SC categories. In order to develop the current situations of scheduled-caste women, the government and the youth need to step up and communicate with underprivileged scheduled caste women in several districts of West Bengal. Without proper communication it will not be possible to figure out their issues and development programs can get hindered by that. Communication media is highly important to improve socio-economic stability of SC women (Hazra 77).

Social learning theory is based on imitating social behaviors that can be learnt by observing others (Akhigbe 88). In West Bengal, scheduled-caste women are getting harassed in the form of slave-like behaviors and domestic violence. Males or husbands try to influence women’s decisions and try to dominate them (Maityet al. 467). As per the social learning theory, government and NGOs can organize awareness and educational attainment programs to help scheduled-caste women to stabilize both socially and economically. If some males try to get influenced and start behaving properly with women, it will impact the whole society and violence against women can be reduced.

Research design

            This particular article is based on the current socio-economic situation of scheduled-caste women in West Bengal and how development of women empowerment can be improved to provide stable lifestyles to SC women. In order to collect information regarding scheduled-caste women, various secondary data are collected from different sources. Secondary data are considered as information that has already been used and analyzed previously by another researcher (Johnston 620). Various data and information are collected from peer-reviewed journals, articles and books. Several information regarding scheduled-caste women, percentage of scheduled-caste population in different districts of West Bengal and development of women empowerment are collected from these resources. Various tables, graphs and charts are used from these secondary resources in order to incorporate quantitative data based on previous research. Both qualitative and quantitative data are used to provide better information on the development of scheduled-caste women in West Bengal. Google Scholar is one of the major tools that is used to collect this information from online resources.

Data analysis and interpretation

            After collecting several pieces of information from different secondary resources, data and information are analyzed with the help of those collected information. Analyzing different secondary information, it is found that effective communication with scheduled-caste women in rural areas of West Bengal is beneficial to know various challenges that those women are facing. It is observed that because of cultural differences and discrimination in castes, most of the SC women are getting harassed in rural areas. Slave like behaviors, mental torture, physical assaults are some of the major problems that the women are facing in this modern era. Areas like Junglemahal, Cooch Behar and Malda are some of the underprivileged areas where the discrimination among castes and harassment of scheduled caste women are increasing day by day (Maity 101).

However, government and non-government organizations are currently organizing microfinance programs to provide small loans to scheduled-caste women and literacy programs are also organized to educate scheduled-caste women and girls from an early age so that they can get socially and economically stable in future and take forward women empower movement in West Bengal (Roy 403). On the other hand, various quantitative data that are used in the secondary resources are analyzed and from that overall idea about SC population in various districts of West Bengal and working of most SC communities are described in this article.

Summary and conclusion

            Analyzing several information regarding the current state of scheduled-caste women and empowerment practices are being useful to gather knowledge on socio-economic status of women. Districts like Malda, CoochBehar and Junglemahal are some of the major areas where scheduled-caste women are getting harassed on large scale. As per statistics, Cooch Behar has the highest percentage of SC population which is nearly 50%. Malda has 16.8% and Kolkata being one of the major districts of West Bengal has 6.01% of SC population. It can be described that less literacy percentage among females are one of the main reasons behind the growing issues faced by SC women. However, from data analysis, it is being observed that in order to improve women empowerment among SC women, microfinance, literacy programs and media communication can play major roles. Government policies, educational attainments and development policies can be beneficial to improve the status of scheduled-caste women in West Bengal (Barman et al. 79).


Figure 2: Literacy rate among SC male and females in West Bengal

(Source: Influenced from the view of Haldar 210)

It can be concluded from this article that women empowerment is currently one of the most popular topics in the present situation of scheduled-caste women in West Bengal. In male dominated society, most of the SC women are treated like slaves and they are getting physically and mentally assaulted. In order to improve their situation, women empowerment programs are highly necessary all-overWest Bengal. Microfinance programs of the West Bengal government are effective to improve economic stability of women in rural areas. However, the government, media and the youth need to step up for educating the women and then women empowerment can be beneficial to reduce gender discrimination in the upcoming future.


Figure 3: Factors to improve socio-economic status of scheduled-caste women in West Bengal


(Source: Influenced from the view of Barman et al. 79)

Recommendation

Government needs to introduce compulsory education programs for schedule-caste women to complete a certain level of higher education.Several campaigns can be organized to create awareness among scheduled-caste and rural women regarding basic human rights and protest against domestic violence.New employment facilities can be organized by the government of West Bengal and training can be provided to scheduled caste women for working to be self-sufficient.Proper investigation against domestic violence of scheduled-caste women and a thorough analysis of the elements of empowerment, as well as their evaluation, are required.

Suggestion for future research

            This article will be beneficial for future researchers to get an idea regarding women empowerment for scheduled-caste women in West Bengal. In this paper, secondary quantitative and qualitative data are used. Due to lack of time and resources, primary research cannot be performed. The future researchers can perform primary research on his article to improve overall quality of the paper in the upcoming future.

Reference List

Akhigbe, Taiwo. “Cognitive-behaviorism and experientialism in emergency medicine training: from theory to practice in a teaching hospital.” International Journal of Medical Reviews 5.3 (2018): 87-89. http://www.ijmedrev.com/article_81182_ada31660237ae392f8923de71c34014d.pdf

Barman, Bikash, Avijit Roy, and Pradip Chouhan. “Socio-Demographic Inequalities among Scheduled Caste Women: A Block Level Analysis of Malda District of West Bengal, India.” http://ijasrm.com/wp-content/uploads/2018/08/IJASRM_V3S7_720_71_80.pdf

Biswas, S. A. N. T. U. “Educational Status of Women in West Bengal.” Journal of Emerging Technologies and Innovative Research 4 (2017): 928-940.

https://d1wqtxts1xzle7.cloudfront.net/64489457/Educational%20Status%20WB-with-cover-page-v2.pdf?Expires=1631254746&Signature=JZnBzOunEGuIBiSmBrl8t-4cH8jEQD0K6rMO4zH52~m2XnXjuZlh1hwmEG0dG5Uo-7kFFRbr-cU9nSFQZphJuQIn62Jaj2i2MOGMEIsgQbT151CqZ8sLcy5zCRAsBt6-mhaP2Ow6tSIVJ1ck6vv8nXO2lo-TUIHH5s8yHDeylcPygi8JA6B6UkNFG9dM2z47YphNcXDBrEdvLdk3n-LAmfCqpB5aKRlbBnLDq0l56cUAOV7KmrQ9ruBEF~sSKP0axo~Kq6rMrELk5yuShxVnRqmIXc5Y4VEBJqmr1~zv0jc~xPXUt30uDECvsUtkEEZu-Sqt7q8K80zrNIamgcDK~A__&Key-Pair-Id=APKAJLOHF5GGSLRBV4ZA

Chakraborty, Tanusree, and Sabyasachi Dasgupta. “EXPLORING THE RELATIONSHIP BETWEEN MICROFINANCE AND WOMEN’S EMPOWERMENT WITH REFERENCE TO SCHEDULED CASTE WOMEN IN COOCH BEHAR DISTRICT, WEST BENGAL.” https://www.cspublication.com/admin/pdf/104__volumeIIIssue6June8.pdf

Haldar, Manoj Kumar. “Empowerment of Scheduled Caste Women through Political Participation: An Experience of West Bengal.” MahilaPratishtha: 201. https://www.researchgate.net/profile/Uttam-Pegu/publication/352151085_Framing_women_as_Witches_2019/links/60bb283c92851cb13d79f408/Framing-women-as-Witches-2019.pdf#page=207

Hazra, Benoy Krishna. “Empowering Rural Women Through Communication: With Special Reference Of West Bengal.” https://www.ijiras.com/2017/Vol_4-Issue_12/paper_16.pdf

Johnston, Melissa P. “Secondary data analysis: A method of which the time has come.” Qualitative and quantitative methods in libraries 3.3 (2017): 619-626.  http://www.qqml-journal.net/index.php/qqml/article/view/169/170

Maity, Arun. “EMPOWERMENT OF WOMEN OF SCHEDULE CASTE WOMEN IN JUNGLEMAHAL IN WEST BENGAL.” (2019). https://www.researchgate.net/profile/Arun-Maity/publication/348920326_Issue_1_wwwijrarorg_E-ISSN/links/6016cf0b299bf1b33e3d1fc1/Issue-1-wwwijrarorg-E-ISSN.pdf

Maity, Kingsuk, Debasis Mazumdar, and Pinaki Das. “Male Out-Migration and its impact on women empowerment in West Bengal.” Economic Affairs 63.2 (2018): 459-467.https://publication.economicaffairs.co.in/media/295389-male-out-migration-and-its-impact-on-wom-aa5f4b68.pdf

Roy, Srila. “Precarity, aspiration and neoliberal development: Women empowerment workers in West Bengal.” Contributions to Indian Sociology 53.3 (2019): 392-421. https://d1wqtxts1xzle7.cloudfront.net/60850760/CIS-with-cover-page-v2.pdf?Expires=1631254366&Signature=EQe-0vEL0UKA6ojpKzsL~RzQgpsNf9~exD~zNNIhtg~l1rKLRCDEQCzfkKdkNWc2BeavET7qYshyFX6SgnXW-uI9KX~IFzZ8TrpGCwxiEG4LBecOucow622dWrbgJKhUPJe6v7qmRavep3BRCLYX3hyzeF9RvtTtM59yCdGbb2W7cxSVQ0whMlMKu0shrB-enxSnt85XWJGoosLXNKue0fdMczhmGKwLis-GeeXS5SqNSz2lvnDOinjRJWBpKegYOS-TNmNz061bGfUKwrtVexDDCf7kHcP4A0MaatWTCHfwtQTsUmi-3V6YUqfTNiF9BkRtHONM2hZblXDJpjzArA__&Key-Pair-Id=APKAJLOHF5GGSLRBV4ZA

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

HUMAN CHAKRA

Rahul DevMondal

Assistant Professor  RBU , Department of Dance  

Introduction

In Sanskrit, the word “chakra” means “disk” or “wheel” and refers to the energy centers in your body. These wheels or disks of spinning energy each correspond to certain nerve bundles and major organs.

When a chakra i.e. wheel of energy is stuck, movement can help release the prana (energy). Yoga postures are a great way to release stale or stuck energy from the body because they invite fresh, vital energy back in through poses and the breath.

Chakra

The practice of yoga ultimately leads us to a state of union, which is possible when we create a state in our body where energy can flow freely from the base of the spine (the Root Chakra), through and beyond the top of the head (the Crown Chakra). When energy can flow freely

through us like this, we can achieve a state of union with the cosmic energy, which flows through all living things.  When each chakra is unblocked, it spins like a wheel, hence the word ‘chakra’ meaning ‘wheel’ in Sanskrit.

Since yoga is both a physical and spiritual practice, yoga poses are not only exercises for your body but also your mind, emotions, and spirit, making it the perfect practice for balancing your chakras.

To function at their best, your chakras need to stay open, or balanced. If they get blocked, you may experience physical or emotional symptoms related to a particular chakra.

There are seven main chakras that run along your spine. They start at the root, or base, of your spine and extend to the crown of your head. That said, some people believe you have at least 114 different chakras in the body.

The chakras most often referred to are the seven main ones that we’ll explore in more detail below.

The chakra system refers to the energy centers we have in our bodies. There are seven major chakras, each in a specific location along your spine. Let’s look at each one more closely.

  • Root chakra ( Muladhar Chakra )

The root chakra, or Muladhara, is located at the base of your spine. It provides you with a base or foundation for life, and it helps you feel grounded and able to withstand challenges. Your root chakra is responsible for your sense of security and stability.

  • Sacral chakra ( Swadhasthana Chakra )

The sacral chakra, or Svadhisthana, is located just below your belly button. This chakra is responsible for your sexual and creative energy. It’s also linked to how you relate to your emotions as well as the emotions of others.

v Solar plexus chakra ( Manipura Chakra )

The solar plexus chakra, or Manipura, is located in your stomach area. It’s responsible for confidence and self-esteem, as well as helping you feel in control of your life.

v Heart chakra (Anahata Chakra )

The heart chakra, or Anahata, is located near your heart, in the center of your chest. It comes as no surprise that the heart chakra is all about our ability to love and show compassion.

v Throat chakra ( Vishuddha Chakra )

The throat chakra, or Vishuddha, is located in your throat. This chakra has to do with our ability to communicate verbally.

v Third eye chakra ( Agya or Ajna Chakra )

The third eye chakra, or Ajna, is located between your eyes. You can thank this chakra for a strong gut instinct. That’s because the third eye is responsible for intuition. It’s also linked to imagination.

v Crown chakra ( Sahasrara Chakra )

The crown chakra, or Sahasrara, is located at the top of your head. Your Sahasrara represents your spiritual connection to yourself, others, and the universe. It also plays a role in your life’s purpose.

Human Chakra Table according to our human body: –

Name of  ChakraColor  of ChakraLocated in the human bodyEquivalent glandsActivityYogasana
 Crown chakra ( Sahasrara Chakra )PurpleGuru MastiskaPineal glandWater, Sexual   balancing in human bodySarvangasana Halasana . Chakrasana  
Third eye chakra ( Agya or Ajna Chakra )  IndigoMiddle of the eyebrowPituitary glandControlling Five Elements of Human body , Intelligence and attracting power etc   Bharmari Pranayama . Sarvangaasana Halasana
Throat chakra ( Vishuddha Chakra )Sky blueThroatThyroid Glandability to communicate verbally ,  air and temperature balancing for human bodyVakasana Halasana Matsyasana etc.
Heart chakra (Anahata Chakra )  Greencenter of your chestThymus Glandheart chakra is all about our ability to love and show compassion.Dhanurasana Virbhadrasana  
Solar plexus chakra ( Manipura Chakra )Yellowishstomach areaheterocrine gland,It’s responsible for confidence and self-esteem, as well as helping you feel in control of your life.Paschimottanasana Vajrasana Pawanmuktasana  
Sacral chakra ( Swadhasthana Chakra )Orangejust below your belly buttonadrenal glandresponsible for your sexual and creative energy. It’s also linked to how you relate to your emotions as well as the emotions of others.Vadrasana. Paschimottasana Pawanmuktasana .
Root chakra ( Muladhar Chakra )Redlocated at the base of your spine Gonad , sex glandIt provides you with a base or foundation for life, and it helps you feel grounded and able to withstand challenges. Your root chakra is responsible for your sense of security and stability.Bhadrasana Tittilasana Yogamudrasana Paschimottasana

       **********************************************************

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

মণিপুরী নৃত্যের জগতে গুরু দেবযানী চলিহার অবদান

Ahana Chakraborty

Research scholar

Department of Rabindra Sangi ,Dance and Drama

Sangit Bhavana, Visva Bharati University

e-mail id – mouchakrabortybolpur@gmail.com

শ্রীমতী দেবযানী চলিহার জীবনযাপন সম্পর্কে জানলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে তাঁর মধ্যে সুন্দরভাবে লালিত হয়েছে অসমিয়া, বাংলা ও মণিপুরী সংস্কৃতি ৷ আসামের শিবসাগরে চলিহা পরিবারের বসতি স্থাপনের পর্বটি শুরু   হয়েছিল শ্রীমতী চলিহার পিতামহ শ্রী কালীপ্রসাদ চলিহার হাত ধরে৷ কর্মসূত্রে যিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। কালীপ্রসাদ চলিহার চার পুত্র ও পাঁচ কন্যার মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান যাদবপ্রসাদ চলিহাই  হলেন শ্রীমতী দেবযানী চলিহার পিতা। কর্মসূত্রে যিনি আসাম এবং কোলকাতা উভয় স্থানেই যাতায়ত করতেন৷ শ্রীমতী দেবযানী চলিহার জন্ম থেকে অর্থাৎ ১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৪৬ প্রায় একযুগ সময়ের মধ্যে লক্ষ্য করেছি, চারটি স্থানকে কেন্দ্র করে সমস্ত ঘটনাচক্র সজ্জিত৷                                                                                                                                              

১৷ শিবসাগর                                                                                                                             

২৷ করঙ্গানি চা বাগান

৩৷ কোলকাতা

৪৷ শান্তিনিকেতন

একদম প্রাথমিক ছ’টা বছরে শৈশবে শিবসাগর এবং করঙ্গানি চা-বাগানে থাকার সময় দেখা যায় মূলত দুই ধরনের নাচ দেখে তাঁর কেটেছে৷

(১) চা-বাগানের যে সাঁওতালি শ্রমিকরা ছিলেন, তারা তাদের জীবনের প্রতিটি অনুষ্ঠানকে নৃত্যের মাধ্যমে উদযাপন করতেন ৷

(২) এছাড়া বিহু নাচ তো হয়েই থাকতো৷ যদিও এখনকার মতো এতো সম্মানের চোখে তাকে দেখা হতো না।৷

অতএব একেবারে ছোট্টবেলা থেকেই শিশুমনে নৃত্য-গীত, লেখালেখি প্রভৃতি সংস্কৃতির একটা সরল আনাগোনা শুরু  হয়ে গেছিল ৷ এই ভালোলাগারই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার হাতেখড়ি ঘটলো শান্তিনিকেতনে ৷ কিছু দিন শিখলেন মণিপুরী নৃত্য ৷ তাঁর গবেষিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের বিবৃতি থেকে বলি –“তখন পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে নাচ এবং গান এই দুটোই আমাদের শেখানো হতো৷ ….. তখন নাচ শেখাতেন মণিপুরেরই একজন মাষ্টারমশাই যিনি এসেছিলেন, সেটা ছিল ১৯৪৩-৪৪। ওই সময় কে ছিলেন আজকে আমার মনে নেই, কিন্তু তখন সেই প্রথম মণিপুরী নাচ শিখেছিলাম ৷”            এই অংশটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ৷ কারণ এই সময়ই তার প্রথম পরিচয় ঘটলো মণিপুরী নৃত্যের সঙ্গে৷ যে নৃত্যকে সঙ্গী করে হাঁটলেন জীবনের এতোগুলো বছর৷ শান্তিনিকেতনে সেই যে শুরু করেছিলেন তার সাধনাই করে গেছেন।তাঁর কথায় “প্রথম আমি মণিপুরী নাচই শিখেছি এবং আমার মণিপুরী নাচটাই ভালো লেগেছে৷ পরবর্তীকালে আমি সেই মণিপুরী নাচের খোঁজেই ঘুরে বেড়িয়েছি”- (শ্রীমতী দেবযানী চলিহার গবেষিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার)।

শ্রীমতী চলিহার শিবসাগরের বাড়ি

                                          

শান্তিনিকেতনে দুবছর থাকার পর চতুর্থ শ্রেণী অবধি পড়া শেষ করে ফিরলেন কোলকাতায়৷ পড়শোনার পাশাপাশি নাচ-গানের প্রতি ঝোঁক থাকায় মায়ের হাত ধরে ভর্তি হলেন ‘বাণী বিদ্যাবীথি’ নামক একটি নৃত্য-গীতের স্কুলে৷ তাঁর কথায়  “…কোলকাতাতে এসে, এখানে, নাচের প্রতি আমার যে আগ্রহ সেটা আমার মা খুব উপলব্ধি করতেন এবং আমাকে একটা নাচের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন৷ সেই স্কুল ছিল বানী বিদ্যাবীথি৷ সেখানে তখন কিন্তু স্পেশালাইজেশন ছিল না৷ নাচ শেখা মানে সবরকম নাচ শেখা৷ একটু মণিপুরী, একটু ভরতনাট্যম, একটু কথাকলি – সেরকম করেই নাচ শেখানো হতো৷ তো সেখানে মণিপুরী নাচ শিখেছিলাম, রাজেন বসুর কাছে৷ প্রহ্লাদ দাসের কাছে ভরতনাট্যম শিখেছিলাম, কথাকলি শিখেছিলাম”- (শ্রীমতী দেবযানী চলিহার গবেষিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার)।

ম্যাট্রিক (১৯৫০) পাশ করার পর আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় সহপাঠী হিসেবে পেলেন ভানু সিংহ নামের একটি মেয়েকে। তাই বারংবার কাকতালীয় ভাবে সমস্ত যোগসূত্র সৃষ্টি হয়েছে। জন্মসূত্রে ভানু সিংহ ছিলেন প্রখ্যাত মণিপুরী নৃত্যগুরু ব্রজবাসী সিংহের কন্যা। তাই বন্ধুর বাড়ি যাতায়াতের সূত্র ধরেই আবার শুরু হলো নৃত্যচর্চা, রানি শঙ্করী লেনে তাদের বাড়িতে ‘নৃত্যবিতান’ নামক প্রতিষ্ঠানে।

১৯৫৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়ার সময় দিল্লিতে একটি ‘ইন্টার ইউনিভার্সিটি ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজিত হয়েছিল। সেখানে মণিপুরী নৃত্যের প্রতিনিধিত্ব করেন শ্রীমতী দেবযানী চলিহা।  সেখানেই গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মণিপুরী নৃত্যে প্রতিনিধিত্ব করেন একটি মেয়ে। দর্শকাসনে তার নাচ দেখে শ্রীমতী চলিহা অনুভব করেন ইতিমধ্যে তিনি মণিপুরী নৃত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন ঠিকই তবে এর আসল রূপটি এখনো তাঁর কাছে অধরাই থেকে গেছে। এই স্থান থেকেই যেনো তাঁর মনে এই নৃত্যের আসল রুপটিকে  খোঁজার, চেনার, জানার এক অদম্য ইচ্ছার সূত্রপাত ঘটলো।

                                       

ন্টার ইউনিভার্সিটি ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল এ শ্রীমতী চলিহা



১৯৫৬ সালে এম এ পরীক্ষা হবার পর রেজাল্ট বেরোনোর আগেই সদ্য শুরু হওয়া ‘আকাদেমি অফ ডান্স ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক’ নামক যে সরকারী সংগঠন ললিতকলার চর্চায় উন্মোচিত হয়েছিল শ্রীমতী চলিহা সেখানে যোগদান করলেন। সেখানে তখন নৃত্য বিভাগের ডিন ছিলেন শ্রী উদয়শংকর। নৃত্যলোকের রাজপুত্রের সঙ্গে এখানেই যেন স্থাপিত হলো এক মধুর সম্পর্ক। শ্রীমতী চলিহা তাঁকে ‘দাদা’ সম্বোধন করেন।  মণিপুরী নৃত্যের প্রতি শ্রীমতী চলিহার ঝোঁক লক্ষ্য করেই যেনো একটি বিশেষ প্রস্তাব দিলেন তিনি। বললেন – মা বাবার অনুমতি  থাকলে মণিপুরে গিয়ে মণিপুরী নৃত্য শিখে আসতে। তবেই এই নাচের আসল বা মূল রূপটি শেখা যাবে যথাযথ ভাবে। কীভাবে ও কোথায় শিখলে ভালো হবে তাও বলে দিলেন। উদয়শংকর যেনো তাঁর মানসচক্ষে দেখেছিলেন কীভাবে সেদিনের মিনাক্ষী ভবিষ্যতের ‘দেবযানী’ মণিপুরী নৃত্য জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপে  নিজেকে বিকশিত করবে।

মণিপুরে শ্রীমতী চলিহা ছিলেন প্রায় আড়াই বছর মতো। ১৯৫৭ তে যান এবং ১৯৫৯ এ ফিরে আসেন। খুব ধরে ধরে প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঠিক চালনা ও তাদের অবস্থান ঠিক হবার পরই শুরু হয়েছিল আসল নৃত্যশিক্ষা। দাঁড়ানোর ভঙ্গি, স্বাভাবিক চলাফেরা, শরীর থেকে হাতের দূরত্ব, হাতের অবস্থান, হাতের আঙুলের অবস্থান, থুতনি ও ঘাড়ের অবস্থান ইত্যাদি প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় গুরু অমুবির নজর এড়াতো না। অতএব নৃত্যের ভঙ্গি সম্পর্কেও তার প্রতিটি খুঁটিনাটি সম্পর্কে তাঁর যে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা এটিই বোধ হয় পরবর্তীতে শ্রীমতি চলিহাকে সাহায্য করেছিল তার ছাত্রছাত্রীদের প্রতিটি ক্ষুদ্র ধাপের মাধ্যমে এই নৃত্যের শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে।

                  

  মণিপুরে গুরুগৃহে গুরু মাইস্নাম অমুবি সিং এর সঙ্গে শ্রীমতী  দেবযানী চলিহা

    

তাঁর প্রতিষ্ঠিত নৃত্যপ্রতিষ্ঠান ‘মৈতৈ জগোই’  মণিপুরী নৃত্যের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে মণিপুরের বাইরে তথা বাংলায় একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। নৃত্যশিক্ষক হিসেবে তিনি নিজ গুরু মাইস্নাম অমুবী সিং এর ঘরানাকেই অনুসরণ করেছেন এবং প্রথাগত মণিপুরী নৃত্যকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে অবিকৃত অবস্থায় পৌঁছে দেবার গুরু  দায়িত্বটি পালন করেছেন।‘মৈতৈ জগোই’ এর সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালে।  এখানে ‘মৈতৈ জগোই’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কোলকাতায় বা সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে বাংলায় মণিপুরী নৃত্য চর্চা, প্রচার ও প্রসারের একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো। গুরু অমুবির নৃত্য ঘরানার ধাঁচে শ্রীমতী চলিহার হাত ধরে তৈরী হতে লাগলো প্রচুর ছাত্রী।

এইবার আসা যাক নাচ শেখানোর বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে।  শ্রী অমুবি সিং এর নৃত্যশিক্ষাদান পদ্ধতি যেমন নিশ্ছিদ্র ছিল তাঁর যোগ্য শিষ্যা রূপে শ্রীমতী চলিহাও তৈরী করেছিলেন একটি পঞ্চস্তর বিশিষ্ট প্রণালী যার মধ্য দিয়ে গিয়ে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর শরীর ও মন মণিপুরী নৃত্যপযোগী হয়ে উঠতো সহজেই। এই স্তরগুলি হল –

১। ব্যায়াম অভ্যাস (এর ধারণা পেয়েছিলেন কুলদা ভট্টাচার্যের কাছে। এর মধ্যে একটি শিখেছিলেন শ্রী তরুণ কুমারের কাছে, বাকি গুলি নিজে সংযোজন করেন )।

২। যোগাসন অভ্যাস।

৩। রিদিমিক্স স্তর বা তালের এক্সারসাইজ।

৪। ছোট ছোট স্টেপ অভ্যেস

৫। তালের প্র্যাকটিস।

এই পাঁচটি স্তর অতিক্রম করে একটি ছাত্র/ছাত্রী চালি নাচ (বেসিক মণিপুরী নাচ) শেখার উপযুক্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। ‘মৈতৈ জগোই’ একটি বৈতনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গড়ে উঠেছিল তবে ‘মৈতৈ জগোই’ মুক্ত শিক্ষালয়  হিসেবে পথচলা শুরু করেছিল ১৯৭৯ এ। শ্রীমতী রেখা বসু অর্থাৎ শ্রীমতী দেবযানী চলিহার দিদি ‘সর্বহারা শিশুতীর্থ’ নামের একটি নন ফরমাল অবৈতানিক স্কুল শুরু করেছিলেন পথ শিশুদের ও বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে। সেই  বাচ্চাদের শ্রীমতী চলিহা অবৈতনিক ভাবে নৃত্যশিক্ষা দানের মহৎ কর্মযজ্ঞ শুরু   করেন।

গুরুর কাছে শেখা বিদ্যার যথাযথ প্রয়োগ ও চর্চার দ্বারা নৃত্য শিক্ষাদান ছাড়াও নিজেকে ও দর্শক তথা অন্যদের সমৃদ্ধ করার কাজটি তিনি করেছেন দায়িত্ব সহকারে। এই ব্যাপারে ‘অন্তরঙ্গ দেবযানী’ বইতে অধ্যাপক শ্রী আবুল আহসান চৌধুরীকে জানিয়েছেন, ১১৩ ও ১১৫ নং পৃষ্ঠা থেকে পাই –“কলকাতায় কলামন্দিরে নৃত্য পরিবেশনার পরে, কলকাতাতেই ম্যাক্সমুলার ভবনে এবং বিভিন্ন জায়গায় আমাদের নিমন্ত্রণ করা হয় নৃত্য পরিবেশনের জন্য। তারপরে আমরা নিজেরা একটা আসাম ট্যুর organize করেছিলাম। অসম ও মেঘালয় থেকে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। শিলং, গৌহাটি, ডিব্রগড়, তেজপুর তারপরে ডিগবয়, নলবাড়ি অনেক জায়গাতে আমরা ট্যুর করেছিলাম। … ৭৪ এর একেবারে গোড়ার দিকে হবে। ফখরুদ্দিন আলি আহমদ যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন …. তখন দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে মানে ওনার রাষ্ট্রীয় বাসভবনে নৃত্যপরিবেশন করার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম।” আরও বলেছেন “…. তখন মাদ্রাজই বলতো …. তারপরে বোম্বে – আমি এগুলোতে গিয়েছি, কিন্তু দল নিয়ে আমি যাইনি। তখন দল নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন উঠতো না, কেননা আমি যখন শুরু করেছিলাম তখন আমি ছাড়া কেউই নাচতে জানতো না। তারপরে আমার ছাত্রীরা যখন নাচ শিখলো তখন তাদেরকে নিয়ে আমি অনুষ্ঠান করতাম – তার আগে আমি একক নৃত্যই পরিবেশন করতাম।”

নিজের প্রতিষ্ঠিত নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মৈতৈ জগোই এ দিদি রেখা বসু ও ছাত্রীদের সঙ্গে শ্রীমতী চলিহা

        

এতো গেলো কলকাতা, বাংলা তথা ভারতবর্ষের কথা। তবে শুধু এখানেই তিনি থেমে থাকেননি মণিপুরী নৃত্যকে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে প্রচারের কাজটিও করেছেন যত্ন সহকারে। ১৯৭৪ সালে আমেরিকায় ওয়াশিংটন ডিসিতে এছাড়া সুইজারল্যান্ড এর জুরিখে, ২০০০ সালে শ্রীলঙ্কায় এলফিনস্টোন হলে, এছাড়া বাংলাদেশের মতো জায়গাগুলিতে তিনি তাঁর নৃত্যের জাদুতে মাতিয়েছেন দর্শকহৃদয়।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ এই দুই বছর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মণিপুরী নৃত্য বিভাগের অধ্যাপিকা হিসেবে যুক্ত হন।  বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও সঙ্গীত ভবনে রবীন্দ্র সঙ্গীত নৃত্য ও নাট্য বিভাগে পাঠসমিতি, মডারেশেন কমিটিতে পরীক্ষা সংক্রান্ত ও শিক্ষা সম্বন্ধীয় কাজে যুক্ত থেকেছেন বহুদিন। আজও পর্যন্ত এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যবিভাগের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত রয়েছেন। ১৯৩৪ থেকে ২০২১ সাল জীবনের দীর্ঘ সাতাশিটি বছরের মধ্যে প্রায় চৌষট্টি বছর যাবৎ তাঁর শাস্ত্রীয় মণিপুরী নৃত্যচর্চা ও পঞ্চাশ বছরের নৃত্য শিক্ষকতার জীবনে তাঁর এই নৃত্যের জগতে অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য৷ মণিপুরী নাচকে মণিপুরের বাইরে বাংলায়, ভারতে তথা বর্হিবিশ্বে প্রচার ও প্রসারের কাজে দেবযানী চলিহা একটি উজ্জ্বল নাম৷

গুরু শ্রীমতী দেবযানী চলিহা ও অধ্যাপক ডঃ সুমিত বসুর সঙ্গে  লেখিকা

                        

Bibliography :-

1.Choudhury Abul Ahsan. Antaranga Devjani: published by- Mohammad

mizanur Rahman, Shova prakash,38/4 Banglabazar, Mannan market, Dhaka 1100, Bangladesh. lSBN- 984 70084 04178.

2. Documentary on Guru Shrimati Devjani Chaliha “Nrityer Tale Tale” by Indrajit Narayan and Sudip Mirdha.

3.Chowdhurie Tapati.(18 oct 2016) The Hindu Friday Review. ‘Mould it like Manipuri.

4.Chaliha Devjani.(2015) Maisnam Amubi Singh, (Jawaharlal Nehru Manipur Dance Academy). Printed at Iboyaima printers, Moirangkhom Loklaobung Imphal.

5. Interview of shrimati Devjani Chaliha by Miss Ahana Chakraborty. (11/04/2021)

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

संस्कृत नाटकों में राजनीति के आयाम : भास के महाभारत आधारित नाटकों के विशेष संदर्भ में।

MADAN MOHAN

1

                 

                        संस्कृत नाटक भारतीय रंगमंच के आरंभिक काल को दर्शाता है जिसका आधार नाट्यशास्त्र है। भारतीय रंगमंच की शुरुआत नाट्यशास्त्र से ही मानी जाती है जिसकी भाषा संस्कृत है। नाट्यशास्त्र में मिले संदर्भ के अनुसार भारतीय रंगमंच परंपरा के प्रथम नाटक में ही राजनीति का समावेश हो जाता है जब नाटक देवासुर-संग्राम को भरतमुनि के शिष्यों के द्वारा खेला गया जिसे देखकर असुरों को लगा कि ये उनके खिलाफ राजनीतिक षड्यंत्र है असुरों को नीचा दिखाने के लिए और फिर असुरों ने बहुत उत्पात मचाया जिसके परिणाम स्वरूप रंगमंडप विधान तैयार किया गया तथा रंगमंडप का निर्माण कर उसके अलग अलग कोने में देवताओं को बैठाया गया उसकी रक्षा करने के लिए साथ ही जर्जर ध्वज की स्थापना भी की गई।

                       चुकि नाटक आम जीवन का ही प्रतिविम्ब है अतः जब जीवन ही राजनीति से अछूता नहीं है तो रंगमंच कैसे रह सकता है। आमतौर पे राजनीति का जो मतलब लोग समझते हैं उसकी बात नहीं कर रहा क्योंकि राजनीति का सही अर्थ है किसी समूह, समाज, राज्य अथवा देश की उन्नति के लिए उसके विकास के लिए एक नीति तैयार करना तथा उसे लागू करने के लिए ठोस कदम उठाना अतः हम एक छोटे से परिवार को चलाने के लिए भी राजनीति का सहारा लेते हैं। यही वजह है कि जब से नाटकों का लेखन आरम्भ हुआ और उसका मंचन होने लगा तब से ही उसमे राजनीति किसी न किसी रूप में विद्यमान हो गयी और आरम्भ से अब तक जितने भी नाटक लिखे गए जिन भी भाषा मे लिखे गए सब मे थोड़ी बहुत राजनीति अलग – अलग स्वरूप में दिखाई देती है उसके अलग अलग आयाम देखने को मिलता है।

                     विभिन्न युग अथवा समय के नाटककारों के नाट्यरचनाओं में उस युग की राजनीति की झलक मिलती है जो समय परिवर्तन के परिवर्तित रूप

2

में उभर कर सामने आई है। चाहे वो आदिकाल, मध्य काल अथवा आधुनिक काल के नाटककार हों सबने अपनी रचनाओं में समकालीन राजनीति के स्वरूप को पिरोया है। बात करें  तीनो काल के संस्कृत नाटककारों यथा भास, कालिदास, भवभूति, शूद्रक, भट्टनरायण, महेंद्र विक्रमवर्मन, क्षेमेन्द्र, विशाखदत्त, मुरारि, राजशेखर, अश्वघोष, हर्ष, चंद्र, राजशेखर आदि के अधिकांश नाटकों में राजनीति के विभिन्न पहलुओं को हम देख पाते हैं।

         चाहे वह प्रतिमानतकम हो या अभिषेक नाटक, बालचरित हो अथवा उरुभंगम या कर्णभरम, अभिज्ञान शाकुंतलम, मालविकाग्निमित्र, वेणीसंहार, मृच्छकटिक, अविमारक, स्वप्नवासवदत्ता, उत्तररामचरित, मुद्राराक्षस, किरातार्जुनीयम, मेघदूत, शिशुपाल वध, विक्रमोर्वशीयम, कुमार सम्भवम, प्रतिज्ञा यौगन्धरायण, रावण-वध, त्रिपुरदाह, समुद्रमंथन, रुक्मिनिहारण, महावीर चरित, आदि, सभी नाटकों में राजनीति की झलक देखने को मिलती है या यों कह सकते हैं कि केवल झलक ही नही वल्कि राजनीति की एक मजबूत व्याख्या भी मिलती है जो हमारे समाज की राजनीतिक दृष्टि सशक्त करने में एक अहम भूमिका निभाती है।

                     प्रथम नाटककार भास की बात करें तो उनके सभी नाटकों में कुछ न कुछ राजनीतिक तत्व हैं जो हमे एक मजबूत राजनीति का पाठ पढ़ा जाते हैं। उनका कोई भी नाटक राजनीति से अछूता नहीं है। उनके किसी भी नाटक की बात करें चाहे रामायण आधारित नाटक हों या महाभारत आधारित अथवा भागवत कथा मिश्रित नाटक हों सभी मे राजनीति की एक अतुलनीय व्याख्या मिलती है, जो राजनीति के विभिन्न आयाम को प्रदर्शित करती है। उनके नाटकों में जो राजनीति का स्तर है वह पायदान दर पायदान सशक्त होता दिखाई देता है।

3

उनके नाटकों में महाभारत आधारित नाटकों की बात की जाए तो उनमे राजनैतिक दृष्टि से एक क्रम उभर कर सामने आता है। उरुभंगम, कर्णभराम, दूतवाक्यम, दूत घटोतकचम, मध्यमव्यायोग और पंचरात्रम इनके लिए विद्वानों का मानना है कि भास ने एक अलग ही महाभारत की रचना की है जो महाभारत के घटनाओं से तो मिलते हैं पर साथ मे एक निष्कर्ष भी छोड़ जाते हैं। भास के नाटक पंचरात्र को केंद्र में रखकर देखने पर यह पता चलता है कि इसके अलावा जितने भी नाटक हैं उनमें महाभारत की घटनाएं समान रूप से तो चलती है किंतु निष्कर्ष में पंचरात्र के रूप में एक उपाय बताया है जिससे महाभारत का युद्ध बिना किसी लाग – लपेट के टाला जा सकता था। पंचरात्र में गुरु द्रोणाचार्य के द्वारा एक बहुत ही सुंदर राजनीतिक चाल का वर्णन किया गया गया है जो आसानी से युद्ध की संभावना को भी खत्म कर सकता था साथ ही भास यह भी बताने की कोशिश करते हैं कि जब बच्चे आपस मे झगड़ रहे हों तब गुरु और बड़े बुजुर्गों को आगे बढ़कर उसका ऐसा निदान ढूंढना चाहिए जिससे विनाश को टाला जा सके या विनाश की संभावना को खत्म ही कर दिया जा सके।

“Bhasa has introduced certain changes in the play: For instance, Krishna himself gives a hint to Bhima to smash Duryodhan‟s thighs. The changes introduced by the dramatist offer new perceptions in the character of Duryodhan, the protagonist of the play. Duryodhan has been transformed completely and made Suyodhan (good warrior) here.”

                       युद्ध मे किसी भी प्रकार की भावना का कोई स्थान नहीं होता युद्ध जीतने के लिए सबसे ज़रूरी है सही समय पर फैसला लेना चाहे वह फैसला छल का ही क्यों न हो। फैसला गलत या सही नही होता, वह फैसला

4

किस समय अथवा स्थान पर लिया गया है यह महत्वपूर्ण होता है। भूमि पर गिरे निहत्थे दुर्योधन के जंघे को भीम के गदा से तोड़ने का फैसला यदि कृष्ण ने न लिया होता तो शायद आज पांडव युद्ध के विजेता के रूप में न जाने जाते। वहीं दूसरी ओर अगर दुर्योधन को छल से न पराजित किया जाता तो शायद दुर्योधन नायक (सकारात्मक चरित्र) के रूप में उभर कर न आता। क्या उस समय कृष्ण को इस बात का भान न होगा कि दुर्योधन के साथ छल करने से उसकी छवि सकारात्मक हो जाएगी? अवश्य होगा ! फिरभी उन्होंने यह फैसला लिया क्योंकि एक बेहतर राजनीतिज्ञ होने के कारण वह जानते थे कि उस समय की प्राथमिकता पांडवों (जिसके पक्ष में वो थे) को विजय दिलाने की है ना कि यह सोचने की कि दुर्योधन की छवि बिगड़ेगी या बनेगी। राजनीतिक दृष्टि से समग्रतम परिणाम मायने रखता है न कि व्यक्तिगत। कर्णभारम में कर्ण के व्यक्तिगत छवि को केंद्र में रख कर भास ने राजनीति में भावनागत फैसले के दुष्परिणाम को दर्शाया है।

                        कर्ण को यह ज्ञात था कि उसका कवच कुंडल ही उसका रक्षक है उसके होते उसे कोई पराजित नहीं कर सकता फिर भी कर्ण ने अपनी दानवीर की छवि बनाये रखने के लिए कवच कुंडल दान कर दिए। पूरे नाटक में कर्ण के व्यक्तिगत भावनाओं के उतार-चढ़ाव का चित्रण है। युद्ध के पहले कुंती का कर्ण के पास आना, उससे भावनात्मक बातें करना और उस भावना में बह कर कुंती को उसके पांचों बेटे जीवित रहने का वचन देना, भावना में बह कर अपनी रक्षा कवच दान करना, युद्ध मे परसुराम के श्राप कि ‘उसका अस्त्र युद्ध मे काम न करेगा’ के भावना मन मे लाकर आत्मविश्वास खो देंना आदि। कर्ण अपनी व्यक्तिगत भावना के चलते अपनी व्यक्तिगत छवि को बनाये रखने के चक्कर मे इतने बडे राज्य और उसकी सेना को विनाश की ओर अग्रसर कर दिया। राजनैतिक दृष्टि से या किसी भी दृष्टि से हो भावनाओं में बह कर लिए गए फैसले का परिणाम कभी भी सकारात्मक नहीं होता वह किसी न किसी रूप में नुकसान पहुंचता ही है, फैसले हमेशा व्यावहारिक आधार पर सोंच समझकर आंखें खुली रख

5

कर ही लेना उचित है और एक राजनैतिक व्यक्ति को इसका ध्यान हमेशा रखना चाहिए।

संदर्भ :

1.  URUBHANGAM (BREAKING OF THIGHS) – A TRAGEDY IN INDIAN TRADITION, DR. BHAGVANBHAI H. CHAUDHARI,  Scholarly Research Journal’s for Interdeciplinary Research, MAY-JUNE 2017, VOL- 4/31.

2. Sanskrit natakon me samaj adhyayan, Chitra sharma, sanskrit pustakalay 2736 kucha chela dariyaganj Delhi – 6, December 1969.

3. Mahakavi Bhasa : A Study, Baldeva Upadhyaya, The Chowkhambha Vidyabhavan, Varanasi-1, 1964.

4. Abhas Roooak (Khand-1), Prabhat Kumar Bhattacharya, Sasta Sahitya Mandal Prakashan, new Delhi – 01, 2016.

 MADAN MOHAN KUMAR, PhD Research scholar, Department of Drama, RBU, Kolkata.

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

ঠাকুরবাড়ি ও বাঈজি সংগীত


 
অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়


 
উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলার সেই ইতিহাস লগ্ন৷ সাংস্কৃতিক নানা বিভাগেই সেই শতাব্দীর শেষার্ধে বিপুল প্রেরণা যুগিয়েছিল৷  কলকাতার তথা বাংলার সংগীত ক্ষেত্রেও তখন নব নব কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টিতে বিভোর৷  ভারতীয় সংগীতের মূল ধারা রাগ সঙ্গীতের চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে বাঙালি প্রতিভা৷ কলকাতায় খেয়াল ঠুংরির  সত্যিকারের চর্চা ও খানদান শুরু হয় ১৮৫৬ সালে যখন লক্ষ্মৌ থেকে নবাব ওয়াজেদ আলী শা মেটিয়াবুরুজে বন্দীজীবন কাটান  সঙ্গে আনা ওস্তাদ কলাবন্তদের সাহচর্যে৷  ঠুংরি গানের যোগসূত্র যেন নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ দরবারের তওয়ায়েফ বা বাঈজিদের সঙ্গে৷  নবাবের মৃত্যুকাল পর্যন্ত প্রায় তিরিশ বছর ধরে সেই দরবারে নিয়মিত বসতো নাচ-গানের মেহফিল৷ ভারতবর্ষের নানা স্থান থেকে ওস্তাদ বাঈজিরা আসতো এই দরবারে৷ কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মায়া এড়াতে পারত না তাঁরা৷ উত্তর ভারতের অনেক বাইজি কলকাতাতে বসবাস শুরু করে দিলেন৷ এঁরা কলকাতার বিভিন্ন ধনী গৃহে সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করতেন৷  যেমন বড়ী মালকাজান, গওহরজান, মালকাজান, আস্রাওয়ালী, জানকীবাঈ, মালকাজান চুলবুলওয়ালী প্রভৃতি  অবাঙালি বাঈজি। বাঙ্গালীদের মধ্যে যাঁরা বিখ্যাত ছিলেন তাঁরা হলেন হরিমতি, যাদুমণি, মানদা সুন্দরী, পান্নাময়ী, আশ্চর্যময়ী, কৃষ্ণভামিনী ইত্যাদি৷ 
সেই সময়ে যাঁরা এই বাঈজিদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাঁরা হলেন রাধারমণ রায়, নীলমণি মল্লিক, রূপচাঁদ রায়, গোপীমোহন দেব, রাজা রামমোহন রায়, রাজা রাজকৃষ্ণ, রাজা নবকৃষ্ণ দেব প্রমুখ৷ তখনকার বিখ্যাত বাঈজিরা যাঁরা উল্লিখিত ব্যক্তিদের বাড়ি গান ও নৃত্য প্রদর্শন করতেন তাঁরা হলেন  নিকিবাঈ, হিঙ্গুনবাঈ, বেগম জান, সুনন বাঈ, হুসনা বাঈ, আশরুন বাঈ, হীরা বুলবুল প্রমুখ৷ পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িতে ও কলকাতার অন্যান্য বনেদি বাবুদের বাড়ির মতোই বাঈ নাচের আসর বসতো৷ দুর্গাপূজোয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি তখনও গড়ে ওঠেনি৷  বাবু দর্পনারায়ণ ঠাকুর দুর্গাপূজায় খরচ করতেন দরাজ হাতে৷ পুজোর সময় সাহেব সুবোদের পাশাপাশি দেয়ান, বেনিয়ান, মুৎসুদ্দিরাও নিমন্ত্রণ পেতেন৷  তাঁদের মনোরঞ্জনের জন্য বসতো  পানভোজন আর বাঈ নাচের মজলিস। 
দর্পনারায়ণের পুত্র গোপীমোহন ঠাকুরের আমল থেকেই ঠাকুরবাড়িতে নিয়মিত জমজমাট মজলিস বসতে শুরু করে৷ জোড়াসাঁকো বাড়িতে বাঈ নাচের আসর বসানো শুরু করেন নীলমণি ঠাকুরের পুত্র রামলোচন ঠাকুর৷ বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আমোদপ্রমোদ এর আয়োজন করার কথা ভেবেই রামলোচনের পালিতপুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুর বাড়ির পাশেই বানিয়েছিলেন বৈঠকখানা বাড়ি৷ অতিথিদের আপ্যায়ন ও ভোজসভার আয়োজন এর জন্যই দ্বারকানাথ বেলগাছিয়া ভিলা বানিয়ে ছিলেন৷  সেখানে ভোজসভার পাশাপাশি বাঈনাচ ও নানান আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করতেন৷  ১৮৪০ সালের ২৯ শে ফেব্রুয়ারির ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকা সূত্রে জানা যায়-‘গত বুধবারে শ্রীযুত বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুর বেলগাছিয়ার স্বীয়োদ্যান বাটীতে এতদ্দেশস্থ অনেক ইউরোপীয় সাহেবদিগকে মহাভোজ করাইলেন …..এবং গত রবিবারে শ্রীযুত বাবু ঐ উদ্যানে স্বদেশীয় স্বজনগণকে লইয়া মহাভোজ আমোদ প্রমোদাদি করিলেন এবং তদুপলক্ষে বাঈয়ের নাচ হইয়াছিল তাহাতে কলিকাতার মধ্যে প্রাপ্য সর্বাপেক্ষা যে প্রধান নর্তকী ও প্রধান বাদ্যকর তাহাদের নৃত্য গীত বাদ্যাদির দ্বারা আমোদ জন্মাইলেন এতদ্ভিন্ন উৎকৃষ্ট আতসবাজির রোশনাই ও হয়েছিল৷’ 
পাথুরিয়াঘাটা বাড়ির গোপীমোহন ঠাকুরের পঞ্চম পুত্র ছিলেন হরকুমার ঠাকুর৷ হরকুমার হিন্দুস্থানী রাগ সংগীত ও সেতার বাদন এ পারদর্শী ছিলেন৷ তাঁর দুই পুত্র যতীন্দ্রমোহন ও সৌরীন্দ্রমোহন ছিলেন সংগীতের সমঝদার  এবং  সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রে  পারদর্শী৷ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দ্বারকানাথ ঠাকুর সুগায়ক না হলেও ছিলেন সমঝদার৷ ওঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ কালোয়াতি গান ও  পিয়ানো  শিখেছিলেন৷  ভক্ত ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের৷ তাঁর উৎসাহে বাড়িতে শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞদের মজলিস বসতো৷  দেবেন্দ্রনাথের ভাই গিরীন্দ্রনাথের ছিল অনেক রকম শখ৷  যাত্রা দেখা, নাটক লেখা, কবিতা লেখা, ছবি আঁকা, গান শোনা এবং গান লেখা৷  মাঝে মাঝে বেলগাছিয়া ভিলাতে মজলিশ বসাতেন  আর দুর্গাপূজার সময় বাঈ নাচের আসর ও  বসাতেন৷  ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করার পর দেবেন্দ্রনাথ নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেন৷  কীর্তন, বাঈ নাচ সব বন্ধ করে দেন দেবেন্দ্রনাথ৷  বৈঠকখানা বাড়িতে গিরীন্দ্রনাথের পুত্র গুণেন্দ্রনাথ কিন্তু সাবেক রীতিতে নাচ ঘরে গান ও বাঈজি নাচের আসরের আয়োজন করতেন৷ 
রামলোচন বা দ্বারকানাথের আমলে যেরকম গানের আসর বসতো যুগের পরিবর্তনে সে আসরের রূপ পাল্টাতে শুরু করে দিলো গুণেন্দ্রনাথ এর আমল থেকেই৷ তৎকালীন যুগের অবক্ষয়ের হাত থেকে বাড়ির ছেলেদের বাঁচাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বাড়ির অভিভাবকেরা। এঁদের মধ্যে প্রধানা ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের মা সৌদামিনী দেবী৷ পরবর্তীকালে অবনীন্দ্রনাথ গান ও বাঈজি নাচের আসর বসিয়েছেন তবে তা শুধুই শিল্প রসের জন্য৷  কয়েকজন বাঈজির গান শোনার গল্প লিখে গেছেন অবনীন্দ্রনাথ  ৷ এক জায়গায় বলছেন,” শ্রী জান ও  আসে৷  সেও বুড়ো হয়ে গেছে৷  চমৎকার গাইতে পারে৷  মাকে (সৌদামিনী দেবী) বললুম,”মা একদিন ওর গান শুনবো৷” মা বললেন শ্রীজান কে?” ….শ্রীজান রাজি হলো৷ একদিন সারারাত ব্যাপী শ্রীজানের জলসায় বন্ধু-বান্ধবদের ডাক দেওয়া গেল৷  নাটোর (জগদিন্দ্রনাথ রায়) ছিলেন তার মধ্যে৷ বড় নাচঘরে গানের জলসা বসল৷ শ্রীজান গাইবে চার প্রহরের চারটে গান। শ্রীজান আরম্ভ করল গান।| …. কি গলা কোকিল কন্ঠ যাকে বলে৷ এক একটা গান শুনি আর বিস্ময়ে কথা বন্ধ হয়ে যায়৷”  আরেক জায়গায় বলছেন,”তখন আমি দস্তুরমতো গানের চর্চা করি৷ কোথায় কে গাইয়ে বাজিয়ে এলো সব খবর আসে আমার কাছে৷  কাশী  থেকে এক বাঈজি এসেছে৷  নাম সরস্বতী৷ চমৎকার গায়৷ ….. তোড়জোড় সব ঠিক৷  দশটা বাজল গান আরম্ভ হলো। একটি গানে রাত এগারোটা, নাটোর মৃদঙ্গ কোলে নিয়ে স্থির৷ সরস্বতীর চমৎকার গলার স্বরে অত বড় নাচ ঘরটা রমরম করতে থাকল৷” গগনেন্দ্রনাথ এর পুত্র গেহেন্দ্রনাথের বিয়ে উপলক্ষে ঠাকুরবাড়িতে গওহরজান এর গান হয়েছিল বলে জানিয়েছেন গগনেন্দ্রনাথের মেয়ে পূর্ণিমা ঠাকুর৷  তিনি বলছেন,”তার পরদিন ফুলশয্যার আসর৷ মেয়েমহলে খেমটা নাচ গান সন্ধ্যে থেকেই শুরু হলো৷ পুরুষ মহলের আগেই খাওয়া হয়ে গেলে রাত আটটা থেকে বাঈ নাচ শুরু হয়৷ দুজন বাঈজি আসে,শ্রীজান ও গহরজান,কলকাতার নামকরা বাঈজি৷ …… গহরজান বৈঠকখানার গান হয়ে গেলে দিদিমাকে গান শোনাতে যায়৷ …..গহরজান তাঁকে ‘হরিনাম মহামন্ন হৃদয়ে জপ রসনা’ গানটা গেয়ে শুনিয়ে ছিলেন৷” 
সে যুগের আরেক বিখ্যাত বাঈজি ছিলেন এলাহাবাদের মুস্তুরিবাঈ। সেই মুস্তুরিবাঈকে একবার কলকাতা এনেছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ রাইচাঁদ বড়াল মহাশয়৷ ওঁর সেই মেহফিল ই  কলকাতায় আকাশবাণীর প্রথম ওবি বা আউটসাইড  ব্রডকাস্টিং প্রোগ্রাম। হাজির ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। আর বাড়িতে বসে রেডিও মারফত মুস্তুরির বেহাগ শুনে  রবীন্দ্রনাথ রাইচাঁদ কে ফোন করে বলেছিলেন,”এ তুমি কী স্বর্গীয়  গান শোনার সুযোগ করে দিলে  রাই? আমি কবে এই কিন্নরিকে সামনাসামনি দেখতে পাবো? “জোড়াসাঁকোতে বসে মুস্তুরির গান শুনে চোখে জল এসেছিল রবীন্দ্রনাথের৷  রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন,”হোসনা বিবির মুখে শাস্ত্রীয় সংগীত শুনে বুঝলাম এঁদের মত সঙ্গীতজ্ঞা ও কণ্ঠস্বর ধারিণীদেরই  আছে শাস্ত্রীয় সংগীত গাওয়ার অধিকার৷ দুটি ঘন্টা যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝা গেল না-যেন সকলকে আনন্দ  রসে ডুবিয়ে  দিলো৷ “গুরুদেব সে সংগীত সুধায় মুগ্ধ  হয়ে অনেক প্রশংসা করে বলেন,”এ কণ্ঠস্বর এমন সংগীত দুর্লভ৷” বাঈজি বলেন,”আজ আমার সমস্ত শিক্ষা ও জীবন সার্থক৷’ 
কালের নিয়মেই  বৈভবের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছিল,তাই মজলিশি গান-বাজনাও আসছিল কমে৷ ধীরে ধীরে ঠাকুর পরিবারে ও সাংস্কৃতিক হাওয়া বইতে শুরু করেছিল অন্যদিকে৷  জমিদারির আয়ত্ত গিয়েছিল অনেক কমে৷ মেহফিলের যুগ ঠাকুরবাড়ি থেকে বিদায় নিলেও সঙ্গীতচর্চা,নাট্যচর্চা,সাহিত্য চর্চা এবং শিল্প চর্চার ধারাটা আরো অনেকদিন ধরে চলেছিল রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শান্তিনিকেতন কে কেন্দ্র করে৷। 
 
 অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়
০৫/০৫/২১

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment

ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র ও যন্ত্রসঙ্গীতের সেকাল-একাল

ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র ও যন্ত্রসঙ্গীতের সেকাল-একাল

দেবাশিস মণ্ডল  

মানুষের জীবনযাত্রা ও কর্মসূত্রে যেমন সংগীতের সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি মানুষের জীবন যুদ্ধের সঙ্গে যন্ত্রসংগীতের সম্পর্কেও জড়িয়ে আছে। শিকার, আত্মরক্ষা ও শিকারের প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরি করতে হয়েছিল। এইসব হাতিয়ারগুলি মানুষের প্রথম আবিষ্কার। আর এইসব হাতিয়ার থেকেই পরবর্তীকালে নানা ধরনের যন্ত্র তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে বাদ্যযন্ত্রও অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। টুকরো পাথর বা পাথরের নুড়ি থেকে তৈরি হয়েছে ঘন বাদ্য। ধনুক থেকে হয়েছে ধনুর্যন্ত্র। বান থেকে বীণা। বাঁশ থেকে বাঁশি। পশুর চামড়া কে ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে অবনদ্ধ বাদ্য বা চর্মজ বাদ্য। এইসব বাদ্যযন্ত্র থেকে নানাবিধ শব্দ উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে কৌতুহল ও আনন্দের সঞ্চার করেছিল। সে যতই এলোমেলো হয়ে থাকে ছন্দ থাকুক আর না থাকুক ভালো লাগার সঙ্গে তার আদিম সম্পর্ক ছিল সুগভীর। দীর্ঘদিন ধারাবাহিক ভাবে ব্যবহার করতে করতে তাদের ছন্দ আসে। সুর এর সম্পর্ক গড়ে ওঠে মানুষের জীবন যাত্রার সঙ্গে। একটি ধনুর্যন্ত্রের ছিলাতে আর একটি ধনুর্যন্ত্রের ঘর্ষণে বিতত বা বোয়িং বাদ্যযন্ত্র। ধনুর্যন্ত্রে একটা তন্ত্রী থেকে দুটো তিনটে কিংবা আরো বেশি তন্ত্রী যুক্ত করে নানা ধরনের শব্দ তারা আবিষ্কার করেছে। হয়তো অনেকগুলি তন্ত্রী থেকে শব্দের ভিন্নতা লক্ষ্যকরে প্রতিটি স্বরকে পৃথক ভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে অপেক্ষাকৃত সভ্য মানুষ। 

এই কাজ হয়েছে বৈদিক যুগে বা তার আগে। একটি একটি করে সাতটি স্বরের বিকাশ হয়েছে। সে সময় বেশিরভাগ তন্ত্র বাদ্যকে বীণা বলা হত। শততন্ত্রী বীণা, গোধা বীণা, ক্ষৌনি বীণা, আঘটি বীণা, ঘটলিকা বীণা  ইত্যাদি। এই সময়কার বাদ্যযন্ত্রগুলি কিভাবে বাজানো হোতো সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। বিভিন্ন টীকাকাররা বেদের মন্ত্রগুলি ব্যখ্যা করতে গিয়ে শুধু বলেছেন, শততন্ত্রী  বীণা তে ১০০টি তার থাকতো। গোধা বীণা গো সাপের চামড়া দিয়ে তৈরি হোতো। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বা মাটির বড়ো চর্মাচ্ছাদিত মাটির বাদ্যযন্ত্রকে বলা হত ভূমি দুন্দুভি।   বেদের মন্ত্র যখন গানে পরিণত হোলো তখন এসব গানের সঙ্গে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গত করা হোতো। স্বাভাবিকভাবেই থেকে ধরে নেওয়া যায় বাদ্যযন্ত্রগুলি যথেষ্ট উন্নত হয়েছিল এবং সংগতের উপযোগী ছিল। 

বৈদিক যুগ পার হয়ে যখন আমরা গন্ধর্ব যুগে যাই তখন সংগীতের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাদ্যযন্ত্রগুলিও যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে। ভরতের নাট্যশাস্ত্রে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা ও সেগুলোকে কিভাবে মার্জনা করা হোতো তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তখন আমরা দু’রকম বীণা পেয়েছি। চিত্রা বিনা ও বিপঞ্চি বীণা। পুষ্কর জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের বেশকিছু নাম পাওয়া গেছে। যার মধ্যে মৃদঙ্গ, ঢাক, তুরি, ভেরি ইত্যাদি। ভরত বাদ্যবৃন্দ বা কুতপবিন্যাসের কথা বলেছেন। অর্থাৎ নাটকের প্রয়োজনে বাদ্যবৃন্দ রচনা করা হত। ফলে বাদ্যযন্ত্রের নির্মান, বাদন শৈলী আর নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রের সম্মেলকের মতো কর্মকাণ্ডের থেকে বোঝা যায় সে এক অসাধারণ অগ্রগতি। সেই অগ্রগতি উত্তর ভারত থেকে ক্রমেই পূর্বে পশ্চিমে আর দক্ষিনে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে কেন্দ্র করে সঙ্গীতের প্রাসার ঘটত। আর সাধারণের মধ্যেও সঙ্গীতের চর্চা ছিল।  

বহুকাল ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে লোকসংগীত যেমন ভাবে বিকশিত হয়েছে তেমনি লোকবাদ্যগুলোও নিজেদের মতো করে বিকশিত হয়ে চলেছে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের ভিন্নধারার সঙ্গীত এবং পৃথক ধরনের কিছু বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। তার আকৃতি, বাদন পদ্ধতি এবং এগুলির শব্দ সৌন্দর্য অনেক ক্ষেত্রে পৃথক রকমের। অভিজাত বাদ্যযন্ত্রগুলির বিকাশের ক্ষেত্রে এইসব লোকবাদ্যযন্ত্র গুলির গুরুত্ব কম নয়। এগুলি থেকেও নানা অভিজ্ঞতা ও গঠন কৌশল কে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা হয়েছে অভিজাত বাদ্যে বা উচ্চাঙ্গশ্রেণির বাদ্যযন্ত্রের গঠনে।

মধ্যযুগে অনেক পারস্য বাদ্যযন্ত্রের আগমন ঘটেছে। ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের সংস্পর্শে এসে সেগুলি বদলেছে। অথবা বলা যায় ভারতের বিভিন্ন ধরনের বীণাজাতীয় বাদ্যযন্ত্র পারস্য বাদ্যযন্ত্রের সংস্পর্শে এসে নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে। বিভিন্ন গীতরীতির যেমন উদ্ভব ঘটেছে, তেমনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বদলেছে, বদল হয়েছে তাদের বাদন পদ্ধতিও। সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীতের চর্চা বেড়েছে অনেকখানি। অভিজাতদের অন্দরমহলে সঙ্গীত অনেক সম্মানের জায়গা  পেয়েছে। ক্রমে রাজা মহারাজা, জমিদার ও সাধারণ অভিজাত মানুষদের পরিবারের সঙ্গে সংগীতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। দক্ষিন ভারতে মুশলিম শাসকদের আধিপত্য না থাকায় সেখানে পারস্য বাদ্যযন্ত্রগুলির কোন প্রভাব পড়েনি। সেখানে সনাতন ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রগুলির বাদন রীতির স্বাভাবিক ভাবেই উন্নত হয়েছে বা আধুনিক হয়েছে।   

‘One of the main differences between North Indian and South Indian music is the increased influence of Persian music and musical instruments in the north. From the late twelfth century through the rise of British occupation, North India was under the control of a Muslim minority that was never able to extend its sphere of influence to South India. During this time, the music of North India began to acquire and adapt to the presence of Persian language, music, and musical instruments, such as the setar, from which the sitar got its name; the kamanche (1998.72) and santur, which became popular in Kashmir; and the rabab (alternately known as rebab and rubab), which preceded the sarod. New instruments were introduced, including the tabla and sitar (1999.399), which soon became the most famous Indian musical instruments worldwide. Legend has it that the tabla was formed by splitting a pakhavaj drum in half, with the larger side becoming the bayan and the smaller side the dahini. The barrel-shaped pakhavaj drum, which was the ancestor of both the tabla and the mrdangam, has been depicted in countless paintings and prints. New genres of music were formed as well, such as khayal and qawwali, that combine elements of both Hindu and Muslim musical practice’.

ভারতে, মুসলিম শাসকদের আবির্ভাবের সাথে, বিভিন্ন রীতির সঙ্গীত এবং অন্যান্য ঐতিহ্য দরবারী সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। দিল্লীর সুলতানেরা (১২০৬-১৫২৬) তাদের দরবারে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে মর্যাদার সঙ্গে স্থান দিয়েছিল। সুলতানরা তাদের ও তাদের লোকজনদের সাথে যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রভাব বহন করে এনেছিল তা তাদের অন্তরে রয়েই গিয়েছিল। ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮) বিশেষ করে তাঁর দরবারে ভারতীয় সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। ভারতে সঙ্গীত শুধুমাত্র দরবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মন্দির এবং উপাসনালয়গুলি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রচার এবং বিকাশে সহায়তা করেছিল। সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে একজন ছিলেন হজরত আমীর খসরু। একজন পণ্ডিত ও সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি নিজাম-উদ-দিন আউলিয়ার (১২৫৩-১৩২৫) শিষ্য ছিলেন এবং সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির দরবারে ছিলেন, যিনি ১২৯৬ থেকে ১৩১৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। তিনি খেয়াল-গানের পথিকৃৎ।

এই সময় পারস্যের বাদ্যযন্ত্র ও ভারতীয় বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের বাদন পদ্ধতি ও গঠনগত দিকগুলি নিয়ে নানা গবেষণা চলতে থাকে। নতুন ধরণের নানা রকম বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়। ভারতীয় বীণা ও পারস্যের তিন তার বিশিষ্ট সেতারের সংমিশ্রনে হয় ভারতীয় সাত তারের সেতার। ‘Setar is a Persian musical instrument with an interesting story. It has a pear-shaped body. Although the word “setar” means three strings in persian, a modern setar has four strings. First setars had three strings but 150 years ago a fourth one was added by a famous setar master Moshtagh Ali Shah. The fourth string gave Persian Setar a better sound and players a possibility of more complex tuning alternatives.

আফগান রবাব এবং ভারতীয় সুরশৃঙ্গার এর সংশ্লেষণের ফলে সরোদ যন্ত্রটি তৈরি হয়েছিল। আফগান রবাবের রবাবে একটি কাঠের আঙুলের বোর্ড থাকে। আর সরোদ নিকেল করা লোহার পাত বা একটি স্টিলের পাত ব্যবহার করে তৈরি হয়। রবাব যন্ত্রে অন্ত্রের স্ট্রিং ব্যবহার করা হয়। আর সরোদে, সুরশৃগারের মতো ধাতব তার ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এভাবেই নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়। লোকসঙ্গীতে ও লোক বাদ্যযন্ত্রেও পারস্য রীতির প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ সম্বন্ধে সেভাবে কোন গবেষণা হয়নি। 

দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুন তাঁর দরবারে সঙ্গীতজ্ঞদের মর্যাদাপূর্ণ স্থান দিয়েছিলেন। অবশ্যই, হুমায়ুনের পুত্র আকবর, তার দরবারের সমস্ত গৌরব এবং জাঁকজমক সহ, কমপক্ষে ৩৬ জন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞকেও পুরস্কৃত করেছিলেন। আকবরের দরবারে দুটি প্রাচীন সংস্কৃতির একীকরণ ও আত্তীকরণ সম্পূর্ণ হয়েছিল। এই সময়কার মুঘলরা সকলেই ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিল। তারা ও তাদের সবার মা ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেরই মানুষ হয়েছিলেন। মুঘল দরবার তখন ভারতীয় রাজদরবার ছিল। তাঁরা ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, বহুত্বের সংমিশ্রিত সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছিলেন। আকবরের দরবারের রত্ন ন’জন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। যারা তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন এবং তাদের কৃতিত্বের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল।

রত্নগুলির মধ্যে একজন ছিলেন মিয়াঁ তানসেন (১৫০০-১৫৮৬) যিনি আজও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রতিভা এবং দক্ষতার উচ্চতার প্রতীক। তানসেন ছিলেন স্বামী হরিদাসের শিষ্য, যিনি ভারতীয় সঙ্গীতের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে একজন। হরিদাস একজন কবি এবং একজন সঙ্গীত রচয়িতা ছিলেন এবং গভীরভাবে আধ্যাত্মিকতায় দীক্ষিত ছিলেন। তিনি কেবল তার সময়ের সঙ্গীতই নয়, সেই যুগের আধ্যাত্মিক সংলাপ ও দর্শনকেও প্রভাবিত করেছিলেন। সমাজে তাঁর শিক্ষার মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ নতুন চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে – যা আজও অব্যাহত রয়েছে। তানসেন এক পর্যায়ে ষোড়শ শতকের একজন সুফি সঙ্গীতজ্ঞ মুহাম্মদ গাউসের কাছ থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রভাবিত হয়েছিলেন। মুহাম্মদ গৌস নিজেও ভারতীয় দর্শন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন।

সম্রাট আকবরের দরবারে স্থান পেতেন এমন সংগীত গুণীদের মধ্যে অনেকেই বাদ্যযন্ত্রী ছিলেন। শাহজাহানের রজত্বকালে সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের ধারার ও বৃন্দবাদনের বিশেষ অগ্রগতি ঘটেছিল। তখন পারস্য ও ভারতীয় শিল্পকলার মধ্যে মিলনের যথার্থ পরিবেশ রচিত হয়েছিল। ভারতীয় বা পার্সি সঙ্গীত উভয়ই এখানে তার স্বতন্ত্রতা হারায় এবং উভয়ই একত্রিত হয়ে একটি ইন্দো-পার্সিয়ান সঙ্গীতের রূপ নেয়। লক্ষ্যনীয় আকবরের দরবারে যখন অর্ধ ডজনেরও বেশি সঙ্গীতজ্ঞ এবং যন্ত্র-বাদক ছিলেন যাদের মধ্যে দুজন পারস্যের মাশাদ ও হেরাতএর অধিবাসী ছিলেন। তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের দেশের প্রচলিত বাদন পদ্ধতি অনুসরণ করেই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, শাহজাহানের শাসনকালে, সঙ্গীত যথেষ্ট পরিশীলিত ও সন্মানের জায়গায় পৌঁছেছিল যা অতীতে কখনো ছিলনা। সঙ্গীতের বিকাশের ক্ষেত্রে এই পর্যায়টি সম্রাটের ব্যক্তিগত পরিমার্জিত রুচির প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে হয়। সম্রাট শাহজাহান নিজেকে শিল্পী এবং বিশিষ্ট মানুষদের পরিবৃত হয়ে থাকতে পেরে আনন্দিত ছিলেন ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

শাহজাহান হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের অনুরক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কণ্ঠশিল্পী। তার খুব মিষ্টি কণ্ঠ ছিল। যা তাঁর শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। সূর্যাস্তের পরে রাজকাজ শেষ করে নিয়মিত গান শোনা তাঁর অভ্যাস ছিল। রাতে খাবার এবং ঘুমের আগে হারেমের মহিলা-গায়িকাদের গান ও বাজনা শুনতেন। প্রতিদিনের রুটিন ছাড়াও আনন্দ এবং উত্সবের একটি অপরিহার্য অংশ ছিল সঙ্গীত। সম্রাটদের সমাদর পাবার জন্য সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে চর্চা বেড়েযায়। নতুন নতুর রাগ, সুর মূর্ছনায় ভরে ওঠে। সাধারণের মধ্যেও সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ ও চর্চার বিস্তৃতি ঘটে।

ফকিরুল্লাহর রাগদর্পনেউল্লেখ রয়েছে যে সেসময় নানা ধরণের বাদ্যবৃন্দ রচিত হত। বৃন্দবাদ্যের তিনটি ভাগ ছিল। উত্তম (ভালো), ‘মধ্যম’ (মাঝারি), এবং নিকৃষ্ট (তৃতীয়-শ্রেণির)। একটি উত্তম ধরনের বৃন্দবাদনে প্রথম সারির চারজন, মধ্যম মানের আটজন, বারোজন সুন্দরী নারী, বাঁশির চারজন বাদক এবং চারজন মৃদঙ্গ (পাখাওয়াজ) বাদক থাকতেন। মাঝারি বৃন্দবাদনে দুজন মহিলা সঙ্গীতশিল্পী থাকতেন। আর বাকী সবই থাকত উত্তম শ্রেণীর বাদ্যবৃন্দের মত। হারেমের মহিলা সংগীত শিল্পীদের উত্তম কনসার্টে দুজন মহিলা সংগীত শিল্পী, দুজন মধ্যমানের মহিলা সংগীত শিল্পী, দু’জন মহিলা বাঁশি বাদক এবং তিনজন ‘মৃদংগ’ বাদক থাকতেন। মধ্যম শ্রেণির মহিলা কনসার্টএ একজন দক্ষ মহিলা তন্ত্রবাদ্য বাদক থাকতেন। বাঁশি বাজাতেন চার জন মহিলা বাদক।

সে সময় শেখ বাহাউদ্দিন নামের একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। শাহজাহানের দরবারে গান গাইতেন ও বাজাতেন। তিনি ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখেছিলেন। দাক্ষিনাত্যেও গিয়েছিলেন সঙ্গীত শেখার জন্য। তিনি অমৃতবীণ নামের একটি বাদ্যযন্ত্রের বাদক ছিলেন এবং খিয়াল নামক একটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। যার অদ্ভুত আকৃতি ছিল। তাঁর দুই শিষ্য—রশিদ ও আসাদ—তাঁকে সঙ্গ দিতেন। যখন তিনি গান গাইতেন রশিদ ভগবান (বীণা) নামক একটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, যা অন্য কেউ বাজাতে পারত না।

ঔরঙ্গজেব প্রথম জীবনে সঙ্গীত চর্চা করতেন। তখন তিনি ধ্রুপদ ও অন্যান্য সঙ্গীত রচনা করেছেন। তাঁর রাজ্যাভিষেকের সময় প্রচুর সঙ্গীতানুষ্ঠান হয়েছিল। কিন্তু পরে নানা কারনে তিনি সঙ্গীত চর্চা বন্ধ করে দেন।

‘For several years after this alleged episode, the official Mughal chronicler recorded male and female instrumentalists and dancers dominating the anniversary celebrations of Aurangzeb’s coronation, including rabab, tanbur and flute players, and the emperor’s notable bestowal of 7000 rupees on his principal musician, Khushal Khan Kalawant. A number of dhrupads composed in Aurangzeb’s honor still preserved in oral and written forms bear witness to his active involvement as a patron of music’.৪

ঔরঙ্গজেবের সময়কাল ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস অন্ধকার সময়কে চিহ্নিত করে। ঔরঙ্গজেব তার রাজত্বের শেষের দিকের বছরগুলিতে সঙ্গীত নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে সঙ্গীতজ্ঞরা নিজেদের মধ্যে চর্চা চালিয়েছেন। আর তাঁদের মধ্যে অনেকে লেখা ও গবেষণার কাজ চালিয়েছেন। এই সময়ে হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের উপর প্রচুর সংখ্যক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, মুঘল অভিজাতদের দরবারী ভাষা ফার্সিতে।

সঙ্গীত চর্চা নিষিদ্ধ করলেও পরে তাঁরই বংশধর সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর সঙ্গীত চর্চা করতেন। তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। যিনি চার দশক ধরে ভারত শাসন করেছিলেন। তাঁর শাসনকাল ছিল ১৮৩৭-১৮৫৭ সাল পর্যন্ত। বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন একজন কবি, সঙ্গীত রচয়িতা। একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়ে একজন সুমানবিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৮৫৭ সালের প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ভারতীয় সৈন্যদের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে পরাজয়ের পর ব্রিটিশরা তাকে বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) পাঠায় যেখানে তিনি মারা যান।

বাহাদুর শাহ জাফর নিজেও একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান উর্দু কবি এবং সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি প্রচুর সংখ্যক গজল লিখেছিলেন এবং তার দরবারে মির্জা গালিব, দাগ, মুমিন এবং জাউক সহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত উর্দু লেখক স্থান পেয়েছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি খুব বেশি উচ্চাভিলাষী ছিলেন না। দেশের রাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে সুফিবাদ, সঙ্গীত ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি।

মুঘল সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির পর, লখনউ, পাতিয়ালা, অযোধ্যা, রামপুর ও বেনারসের মতো ছোট ছোট রাজ্যগুলিতে পৃথকভাবে সঙ্গীত বিকেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। রাজ্যগুলিতে সঙ্গীত গুনীদের সমাদর ছিল। সেখানে যথাযথভাবেই সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত ছিল। এই রাজ্যগুলিতে পৃথকভাবে সঙ্গীত চর্চা ও এর ধারাবাহিকতা সঙ্গীত শৈলীর বৈচিত্র্যের জন্ম দেয়। যা আজ ঘরানা নামে পরিচিত।

এরপরেও ইংরেজদের আক্রমন রাজ্যগুলিকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সবই তাদের দখলে চলে যায়। অযোধ্যার পরাজিত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ (১৮২২-১৮৮৭) কে নির্বাসন দেয় কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। তিনি সঙ্গীতগুনী বলেই কলকাতায় তাঁর সাঙ্গীতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন সঙ্গীতগুনী এভাবেই কলকাতায় ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। তাই, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত আরো দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

ইংরেজদের আমলে আধুনিক কারিগরী শিল্পের অগ্রগতির ফলে সঙ্গীত ও সংস্কৃতিরও নানা অগ্রগতি ঘটে। রেকর্ডিং শুরু হয়। শুরু হয় গান আর বাজনার ব্যাপক প্রচার-প্রসার আর সংরক্ষনের এক নতুন অধ্যায়। ১৯০৪ সালে প্রথম একক বাদ্যযন্ত্র সেতার রেকর্ড করা হয় ইমদাদ খাঁন এর।এর দুবছরপরে ১৯০৬ সালে প্রথম সরোদিয়া ওস্তাদ ছুন্নু খান (১৮৫৭-১৯১২) এর বাজানো সরোদ রেকর্ড করা হয়। 

রেকর্ডগুলি শুনলে বোঝা যাবে নানা যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে সেগুলি তত ঝকঝকে ছিলনা। কিন্তু তার গুরুত্ব অসীম। আমরা সেই কলের গান থেকেই অনেক ইতিহাসকে আরো নিখুঁতভাবে পাচ্ছি। যা অন্য কোন ভাবে খুঁজে পাবার সেরকম কোন সম্ভাবনা ছিলনা। যাইহোক, যান্ত্রিক বিকাশ সঙ্গীতের সামগ্রিক বিকাশকে অনেক ত্বরান্বিত করেছে। আধুনিক যুগের সঙ্গীতে ফিউশন মিউজিক, আর ব্যাণ্ডের গানের প্রাধান্য বাড়ছে। আর অন্যদিকে ঘরানার আধিপত্য কমলেও মৌলিক সঙ্গীত হিসেবে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা, প্রচার ও প্রসার নিরবচ্ছিন্ন ধারায় এগিয়ে চলেছে ও চলতেই থাকবে। যার কোন বিকল্প এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।    

তথ্যসূত্র

১।  Musical Instruments of the Indian Subcontinent | Essay | The Metropolitan Museum of Art | Heilbrunn Timeline of Art History (metmuseum.org)  

২। All About Persian Setar | Setar Persian Instrument | Iranian Setar – Sala Muzik

৩।  RAG — DARPAN (A Summary) on JSTOR

৪। 2004BrownSchofieldPhD.pdf (kcl.ac.uk)

৫। First Recorded Sound of Sitar/Imdad Khan/1904/Raag Behag/Rashmita Jha – YouTube

৬। The first Sarod record coln: Rantideb Maitra – YouTube

Posted in Indigenous Art & Culture | Leave a comment