পৌণ্ড্র, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও সমাজ চেতনা ১৮৫৭-১৯৪৭

ডঃ শ্যামা প্রসাদ মন্ডল

মানবসভ্যতার আদি কাল থেকে ভারতীয় সমাজ শ্রেনী, বর্ণ ও কৌমে বিভক্ত ছিল। তাই তাদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কারও বিভিন্নরুপে বর্তমান। তবে সময়ের দীঘ্য যাত্রাপথে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কারের জনগোষ্ঠী পারস্পারিক মিলন ও বিরোধের মধ্য দিয়ে সমন্বয়ের পথে অগ্রসর হয়। হিন্দুধর্ম প্রভাবিত ভারতবর্ষে যে ধর্মসাধনা তা আর্য এবং অনার্য এই দুই ধর্মসাধনার মিলন রূপ। বস্তুত ভারতীয় ধর্মসাধনায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আর্য ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারোকেরা পারস্পারিক বোধ ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই তাদের ধর্মসাধনা ও ধর্মবিশ্বাস প্রচার করেছিলেন। প্রাক-আর্য অধিবাসীরা কখনই তাদের ধর্মসাধনা ও ধর্মবিশ্বাস আর্য ব্রাহ্মণ্য বা বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহে বিসর্জন দেয়নি। চলমান আর্য প্রভাব স্বীকৃতি লাভ করললেও তার মধ্যেই অনার্যরা তাদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি চর্চা করেছিলেন এবং ক্রমে ক্রমে তা ভারতীয় সংস্কৃতির চলমান প্রবাহের অঙ্গীভূত হয়েছে কখনও অবিকৃত রূপে আবার কখনও বিবর্তিত রূপে, যে প্রকৃয়া আজও প্রবাহমান। ঐতিহাসিক নীহার রঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালির ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন বাঙ্গালীর ধর্মকর্মের গোড়াকার ইতিহাস হইতেছে রাঢ়-পুণ্ড্র-বঙ্গ প্রভৃতি জনপদের অসংখ্য জণ ও কৌমের, এক কথায় বাংলার আদিবাসীদেরই পূজা, আচার, অনুষ্ঠান, ভয়, বিশ্বাস সংস্কার প্রভৃতির ইতিহাস।  ভারতে আর্যদের আগমণ, তাদের প্রভাব বিস্তার ও আর্য ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অভিঘাতে পুণ্ড্র-জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে এবং তারা বৌদ্ধধর্ম  গ্রহণ করে পুনরায় উঠে আসার চেষ্টা করে। 

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার মাধ্যমেই প্রতিটি জাতি তার অস্তিত্ব ও গৌরব বাড়াতে সক্ষম হয়। বাংলার মাটিতে যুগ যুগ ধরে বহু জাতি, জনজাতির মানুষ বসবাস করেছে। সময়ের বিবর্তনে এই জাতি পুনরায় এগিয়ে যাওয়ার স্বাদ পায় আধুনিক শিক্ষার আলোকে। তবে প্রথমদিকে পশ্চাদ্ পদ জাতির এই শিক্ষা গ্রহণের কোন অধিকার বা সুযোগ ছিল না। উপনিবেশিক শাসককুল ১৮৫৬ খ্রীষ্টাব্দে  প্রথম বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে পশ্চাদ্পদ জাতিকে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার প্রদান করে। এই আইনি আধিকারের হাত ধরে ধীরে ধীরে  অন্যান্য সম্প্রদায়ের মত বাংলার পৌণ্ড্র, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী  সম্প্রদায়ের মধ্যেও শিক্ষার প্রসার ঘটতে শুরু করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ন্যায় বাংলাতেও আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। ইংরাজী শিক্ষা সকলের জন্য উন্মোচিত হওয়ায় অনগ্রসর সমাজের মধ্যেও শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পৌণ্ড্র, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সমাজের মধ্যে শিক্ষার যে প্রসার ঘটেছিল তার উল্লেখ ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দের ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশনের রিপোটে পাওয়া যায়। রিপোর্টের নবম ধ্যায়ের ৫৫৩ স্তবকে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

সূচক শব্দ– পুণ্ড্র, শিক্ষা, জাগরণ, উচ্চবর্গ, সামাজিক জাগরণ, চাঁদসী চিকিৎসা,  মুষ্টিভিক্ষা, ছাত্রাবাস  

প্রাচীন ভারতীয় সমাজ শ্রেনী, বর্ণ ও কৌমে বিভক্ত ছিল। তাই তাদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কারও বিভিন্নরুপে বর্তমান। সময়ের দীর্ঘ যাত্রাপথে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কারের জনগোষ্ঠী পারস্পারিক মিলন ও বিরোধের মধ্য দিয়ে সমন্বয়ের পথে অগ্রসর হয়। হিন্দুধর্ম প্রভাবিত ভারতবর্ষে যে ধর্মসাধনা তা আর্য এবং অনার্য এই দুই ধর্মসাধনার মিলন রূপ। বস্তুত ভারতীয় ধর্মসাধনায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আর্য ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারোকেরা পারস্পারিক বোধ ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই তাদের ধর্মসাধনা ও ধর্মবিশ্বাস প্রচার করেছিলেন। প্রাক-আর্য অধিবাসীরা কখনই তাদের ধর্মসাধনা ও ধর্মবিশ্বাস আর্য ব্রাহ্মণ্য বা বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহে বিসর্জন দেয়নি। চলমান আর্য প্রভাব স্বীকৃতি লাভ করললেও তার মধ্যেই অনার্যরা তাদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতি চর্চা করেছিলেন এবং ক্রমে ক্রমে তা ভারতীয় সংস্কৃতির চলমান প্রবাহের অঙ্গীভূত হয়েছে কখনও অবিকৃত রূপে আবার কখনও বিবর্তিত রূপে, যে প্রকৃয়া আজও প্রবাহমান। ঐতিহাসিক নীহার রঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালির ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন বাঙ্গালীর ধর্মকর্মের গোড়াকার ইতিহাস হইতেছে রাঢ়-পুণ্ড্র-বঙ্গ প্রভৃতি জনপদের অসংখ্য জণ ও কৌমের, এক কথায় বাংলার আদিবাসীদেরই পূজা, আচার, অনুষ্ঠান, ভয়, বিশ্বাস সংস্কার প্রভৃতির ইতিহাস।  ভারতে আর্যদের আগমণ, তাদের প্রভাব বিস্তার ও আর্য ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অভিঘাতে পুণ্ড্র-জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে এবং তারা বৌদ্ধধর্ম  গ্রহণ করে পুনরায় উঠে আসার চেষ্টা করে। 

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার মাধ্যমেই প্রতিটি জাতি তার অস্তিত্ব ও গৌরব বাড়াতে সক্ষম হয়। বাংলার মাটিতে যুগ যুগ ধরে বহু জাতি, জনজাতির মানুষ বসবাস করেছে। অতীত বাংলার এমনই জাতি হল পৌণ্ড্র, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী জনগোষ্ঠী। কালের আঘাতে তারাই একদিন হারিয়ে যায় সমাজের অতল তলে। মহেন্দ্রনাথ করণ এই অবস্থাকে The Poundres are a dring race  বলে অবহিত করেছেন। সময়ের বিবর্তনে এই জাতি পুনরায় এগিয়ে যাওয়ার স্বাদ পায় আধুনিক শিক্ষার আলোকে। তবে প্রথমদিকে পশ্চাদ্ পদ জাতির এই শিক্ষা গ্রহণের কোন অধিকার বা সুযোগ ছিল না। উপনিবেশিক শাসককুল ১৮৫৬ খ্রীষ্টাব্দে  প্রথম বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে পশ্চাদ্ পদ জাতিকে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার প্রদান করে। এই আইনি আধিকারের হাত ধরে ধীরে ধীরে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মত বাংলার পৌণ্ড্র,নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যেও শিক্ষার প্রসার ঘটতে শুরু করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ন্যায় বাংলাতেও আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। ইংরাজী শিক্ষা সকলের জন্য উন্মোচিত হওয়ায় অনগ্রসর সমাজের মধ্যেও শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়। এই শতাব্দীর শেষার্ধে পৌণ্ড্র, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সমাজের মধ্যে শিক্ষার যে প্রসার ঘটেছিল তার উল্লেখ ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দের ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশনের রিপোটে পাওয়া যায়। রিপোর্টের নবম অধ্যায়ের ৫৫৩ স্তবকে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের প্রথমেই যে পৌণ্ড্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল তার প্রমান কয়েকটি রিপোর্টে পাওয়া যায়, এগুলির মধ্যে Progress of Education Bengal 1912-1913  to  1916-1917, First Quinwennial Review by W. W. Harvel (Calcutta 1918 Chaptar IX, Para 610) এবং Calcutta University Commission Report 1917-1918 (Vol-1, Part – V, Chaptar – VII) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

১৯২১ খ্রীষ্টাব্দের সেন্সাস বিবরনীতে পৌণ্ড্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষিতের সংখ্যা ছিল প্রতি এক হাজারে ১৩৮ জন। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দের সেন্সাস বিবরনীতে উল্লেখ আছে  The Pods have  taken to education and are improving their position . They are 9.7 percent more numenous that in 1911 and 26.6 percent more than in 1901 (Sensous Report 1921, Chaptar XI, PARA – 358)

ঠিক কত বছর আগে পৌণ্ড্রগণ পূর্বভারতে পুণ্ড্ররাজ্য গড়ে তুলেছিল তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে তারা বাংলাদেশ অ্যার্যপূর্ব যুগ থেকেই বসবাস করছে। মহাভারতে উল্লেখিত আছে মহারাজ বলীর পুত্রগন অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুক্ষ পূর্ব  ভারতের পাঁচটি স্থানের শাসক ছিলেন। মহাভারত থেকে আরো জানা যায় যে, মহারাজা পুণ্ড্র দিগ্বিজয়ে বহির্গত হয়ে পুণ্ড্র রাজকে পরাজিত করেছিলেন।খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক দ্বিতীয় শতকের মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপিতে এক পুন্দনগল বা পুণ্ড্র নগরের উল্লেখ আছে। শশাঙ্কের জীবিৎকালে না হলেও ৬৪৩ খ্রীষ্টাব্দে পুণ্ড্রবর্ধন  কামরুপের  শাসনে  এসেছিল।

প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ছিল পৌণ্ড্র জাতির অদি বাসভূমি। সভ্যতা সংস্কৃতির দিক থেকে তারা ছিল অনেকটাই এগিয়ে। সময়ের দীর্ঘ যাত্রাপথে একসময় তারা পুণ্ড্রবর্ধন থেকে বিতাড়িত হন এবং জীবন রক্ষার তাগীদে বাংলার  বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। ফলে তাদের জীবনে নেমে আসে অনগ্রসরতার অভিসাপ আর আর্থিক অনটন। এই প্র্তিকূল অবস্থা থেকে পৌণ্ড্র সমাজকে রক্ষার একমাত্র পথ হল শিক্ষা। শিক্ষা জাগায় চেতনা, চেতনা আনে মুক্তি। উপনিবেশিক শাসন কালে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা পৌণ্ড্র জাতিকে যে প্রভাবিত করেছিল তার সুস্পষ্ট ইঙ্গীত পাওয়া যায় পৌণ্ড্র সমাজের বিশিষ্ট কয়েকজনের  শিক্ষা চেতনা থেকে। এরা হলেন শ্রীমন্ত কাব্যতীর্থ সিদ্ধান্ত বাগীশ, বিপিন বিহারী মনি কাব্যসাগর, রাইচরণ সরদার, গৌরমোহন মণ্ডল, বেনীমাধব দেব হালদার, রাজেন্দ্রনাথ সরকার, অক্ষয় কুমার কয়াল, ধ্রুবচাঁদ হালদার, মহেন্দ্রনাথ করণ, ভূষণচন্দ্র নস্কর প্রমুখ।

পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের শিক্ষা জাগরণে যারা সারা জীবণ অতিবাহিত করেছেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন পণ্ডিত বিপিন বিহারী মনি কাব্য সাগর। ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে ‘Vernacular Mastership Examination’ এবং ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে ‘Medium First Grade’-এ তিনি উত্তীর্ণ হয়ে প্রশংসাপত্র পান। ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দ থেকে বিপিনবাবুর কর্মজীবন শুরু হয়। প্রথমে তিনি জালিমপুর গ্রামের বিশিষ্ট জমিদার বাড়ির জে. এম. ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষক পদ গ্রহণ করেন। পরে তিনি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ইনস্পেক্টর পদ গ্রহণ করেন। তবে তা তার মনপুত না হওয়ায় তিনি ময়দা মধ্য বাংলা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ১৯২০-১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল তিনি দক্ষিন বারাসত বিদ্যালয়ের হেড পণ্ডিত দায়িত্ব পালন করেন। স্বজাতিকে শিক্ষিত ও আধুনিক মণস্ক করে তুলতে ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি নিজ মনিপুর বাঁশতলা গ্রামে একটি মধ্য ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বিদ্যালয় স্থপনের সময় তার আর্থিক অবস্থা ভাল না থাকায় তিনি নিজ গ্রাম সহ নিকটবর্তী গ্রাম ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করেন। একাজে তার বিশেষ সহযোগী হয়েছিলেন ভাগ্নে পণ্ডিত মানিকচন্দ্র হালদার ও ভাইপো দিনতারণ মনি। বিপিন বিহারী মনির চেষ্টা যে অনেকটা সফল হয়েছিল তা সহজে অনুমান করা যায় এই বিদ্যালয়ের প্রথম যুগের ছাত্রদের সাফল্য থেকে। এই বিদ্যালয়ের প্রথম যুগের কৃতি ছাত্ররা হলেন– পণ্ডিত গৌরহরি বিদ্যাবিনোদ, পণ্ডিত দিগম্বর সাহিত্যরত্ন, পণ্ডিত হরিপদ গায়েন, মুরতি মোহন নস্কর, কাশীনাথ মণ্ডল, রতনচন্দ্র সরদার প্রমুখ।

শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই নয়, শিক্ষা-দিক্ষায় পিছিয়ে থাকা পৌণ্ড্র জাতিকে যুগোপযোগী করে তুলতে ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি সরকারি সহযোগিতায় মনিপুর বাঁশতলা গ্রামে নৈশ বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ গ্রাম সহ নিকটবর্তী গ্রামের বয়স্ক ছাত্ররা এখান থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা লাভের সুযোগ পেত।

সুশিক্ষিত ও আধুনিক মনস্ক পরিবারের সন্তান ছিলেন মহাত্মা রাইচরণ সরদার। রাইচরণ সরদার মহাশয় স্বজাতির জাগরণে ও শিক্ষা চেতনা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিজ গ্রামে একটই বিদ্যালয় ও একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। মধুসূদন সরদার, রামতারন নস্কর, নন্দলাল মণ্ডল প্রমুখের সহযোগীতায় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে (১৯০৯) ‘ব্রাত্যক্ষত্রিয় সমিতি’ স্থাপন করেন।১০ এরপর তিনি ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দে ডায়মণ্ডহারবার থেকে ‘ব্রাত্যক্ষত্রিয় বান্ধব’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। স্বজাতির মধ্যে শিক্ষার জোয়ার এনে তাদেরকে আধুনিক মণস্ক করার প্রথম প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন তিনি। রাইবাবুর অনুরোধে জনৈক সমাজসেবী কালীচরণবাবু নিজ গ্রামে তিনশ বিঘা জমি ও ছাত্রাবাস সহ উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করেন। অক্লান্ত পরিশ্রমে নিম্নবঙ্গে এইসময় আরে পাঁচটি ইংরাজী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর অন্যতম কীর্তি হল মন্দিরবাজারের জগদীশপুর গ্রামের হাউড়িরহাট সংলগ্ন  স্থানে ‘সিতিকণ্ঠ ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠা। স্কুলটি ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায়।১১ নিম্নবঙ্গে উচ্চশিক্ষা লাভের কোন সুযোগ না থাকায় উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তাদেররকে আসতে হত কলকাতায়, যাছিল অনেকটাই ব্যায়বহুল ও কষ্ট সাপেক্ষ। স্বজাতির ছাত্ররা যাতে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পায় তারজন্য তিনি ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ মার্চ ১৪৪ নং আমহাস্ট স্ট্রীটে ‘আর্যপৌণ্ড্রক ব্রহ্মচর্য আশ্রম’ নামে একটি ছাত্রাবাস স্থিপন করেন।১২ এই ছাত্রাবাস স্থাপনে পৌণ্ড্র সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আর্থিক ও মাণষিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন।

পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের শিক্ষা জাগরণে বেণীমাধব দেব হালদারের ‘জাতি বিবেক’, ‘ব্রাত্যক্ষত্রিয় পরিচয়’, ‘ব্রাত্যক্ষত্রিয় সমিতি’ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। নর্মাল স্কুলের শিক্ষা শেষ করার পর কলকাতার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্যদিয়ে তাঁর কর্মজীবণ শুরু হয়। এরপর তিনি উলুবেড়িয়ার মাইন স্কুলে হেড পণ্ডিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে পিতার ইচ্ছানুসারে উলুবেড়িয়া থেকে নিজ গ্রামের স্কুলে হেডপণ্ডিতের দায়িত্ব গ্র্রহণের চেষ্টা করেন। তার এই প্রচেষ্টা উচ্চবর্গীয় সমাজের মানুষদের বিচলিত করে। এবং একজন চাষীর ছেলেকে গুরু বলা সম্ভব নয় বলে তারা আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু সেইসময়কার ২৪ পরগনা জেলার স্কুল সমূহের ডেপুটি ইনসপেক্টর জগদীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় ও দৃঢ়তায় বেনীমাধববাবু রঙ্গীলাবাদ বিদ্যালয়ের হেড পণ্ডিতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।   

পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের প্রথম এণ্ট্রান্স পাশ করা ব্যক্তি হলেন শ্রীমন্ত কাব্যতীর্থ সিদ্ধান্ত বাগীশ। তিনি একদিকে যেমন ‘জাতি বিবেক’, ‘জাতি চন্দ্রিকা’ ও পরবর্তীকালে ‘ব্রাত্যক্ষত্রিয় পরিচয়’ প্রনমণ করে একদিকে যেমন স্বজাতির অতীত গৌরব খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন, তেমনি তাদেরমধ্যে শিক্ষার প্রসার  ঘটাতেও উদোগী হয়েছিলেন।

পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের শিক্ষা জাগরণে মহেন্দ্রনাথ করণের অন্যতম প্রধান অবদান হল ‘খেজুরি সাধারণ পাঠাগার’ স্থাপন। এছাড়া তিনি ‘A Short History and Ethnology of the Cultivating Pods’ ‘হিজলি মসনদ-ই-আলা’ ‘খেজুরি বন্দর’ ‘পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাচার’ ‘পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় কল প্রদীপ’ প্রভৃতি ঐতিহাসিক গ্রন্থ প্রকাশ করে পৌণ্ড্র জাতির শিক্ষা চেতনাকে আরো জাগ্রত করেন।

বর্তমান বাংলাদেশের খুলনা জেলার রাজেন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন উক্ত জেলার পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের প্রথম গ্রাজুয়েট। ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ‘খুলন পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় ছাত্র সংঘ’ নামে একটি সমিতি গঠন করেন। তিনি সমিতির সম্পাদকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন। এই ছাত্র সংঘ পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের  মধ্যে শিক্ষা, সংহতি, জনসেবা ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে ভবানীপুর সাউথ সুবারবন স্কুলে গঠিত হয় ‘পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় ছাত্র-যুব পরিষদ’। ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি খুলনা জেলা বোর্ডের প্রতিনিধি থাকাকালিন তিনি নিজ নির্বাচিত এলাকায় পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাজের শিক্ষা জাগরণের অপর মহান ব্যক্তিত্ব হলেন গৌরমোহন মণ্ডল। নিকটবর্তী উপযুক্ত ও উন্নতমানের শিক্ষ প্রতিষ্ঠানের অভাব তিনি ব্যক্তিজীবনে মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন। গৌরমোহনবাবুর প্রেরনায় ও ঘাটেশ্বর বিশ্বাস পরিবারের সহযোগীতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঘাটেশ্বর বিজয় কিষেন বিদ্যামন্দির’। তবে তার প্রধান স্বপ্ন ছিল নিম্নবঙ্গের এই অঞ্চলে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। এবং এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি আপ্রান প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। তবে তার জীবিতকালে না হলেও তাঁর মৃত্যুর অল্পকালের মধ্যেই ১৯৬৮ সালে বিরেশ্বরপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গৌরমোহন শচীন মণ্ডল মহাবিদ্যালয়’।

ডাক্তার ধ্রুবচাঁদ হালদার মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দ থেকে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন করতে শুরু করেন এবং সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার হ্যারিসন রোডে (বর্তমান মহাত্মা গান্ধী রোড) ‘হালদার ফার্মেসী’ নামে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ শিক্ষানুরাগী। সুধাংশুসেখর গায়েনের  অনুরোধে তিনি নিম্নবঙ্গে একটি কলেজ স্থাপনে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং কলেজ প্রতিষার লক্ষ্য তিনি এক লক্ষ টাকাও প্রদান করেছিলেন। যদিও কলেজটি প্রতিষ্ঠা হয়ছিল ভারত স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ১৯৬৫ খ্রীষ্টাব্দে তথাপি নিম্নবঙ্গের পশ্চাদ্ পদ পৌণ্ড্র সম্প্রদায়ের শিক্ষার অগ্রগতিতে তার অবদান অনস্বীকার্য।

অক্ষয় কুমার কয়াল ছিলেন একজন পুঁথি প্রত্ন পণ্ডিত। তাঁর সংগৃহীত পুঁথির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এরমধ্যে দেড় হাজার পুঁথি তিনি বিশ্বভারতী সংগ্রহশালায় প্রদান করেছেন। কিছু পুঁথি সুকুমার সেনের মাধ্যমে বর্ধমান সাহিত্যসভা লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। কিছু পুঁথি সংগৃহীত আছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে। তার উজ্জ্বল প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় ‘পট ও পটুয়া’ বিষয়ক ইংরাজীতে লেখা তাঁর গবেষণা মূলক গ্রন্থ থেকে।

অনুকূলচন্দ্র দাস নস্কর নিজে বি.এ., বি.এল. ও এম.এ. পাশকরে একদিকে যেমন নিজে সুশিক্ষিত হয়েছিলেন, তেমনি তাঁর শিক্ষানুরাগ পৌণ্ড্র সমাজের শিক্ষা চেতনাকে জাগ্রত করেছিল। বাংলার পৌণ্ড্র সম্প্রদায়ের মধ্যে যে শিক্ষা চেতনা জাগ্রত হয়েছিল এবং তাদেরমধ্যে যে ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রসার ঘটটেছিল গববেষক এই গবেষণার মাধ্যমে তার একটটি ক্ষুদ্র চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 বাঙালী নমঃশূদ্র সম্প্রদায় কৃষি প্রধান সম্প্রদায় বলে তাদের মধ্যে লোকসংস্কৃতির প্রভাব ও প্রাধান্য বেশি। জনসংখ্যার দিক দিয়ে একালের নমঃশূদ্র কিংবা সেকালের চণ্ডালেরা ছিল পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে বড় হিন্দু জাতি।১৫ তবে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও বহিজাগতিক ঞ্জানের প্রসারের ফলে এই সম্প্রদায়ের জনসাধারণের কিছু অংশের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশ করতে থাকে। ফলে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বুদ্ধিজীবী ও চাকুরীজীবী শ্রেনীর সৃষ্টি হয় যারা নতুন চিন্তা ধারার প্রসার ঘটিয়ে সমগ্র জাতিকে নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করার পথ প্রশস্থ করেছিলেন।

১৯১১ এর সুমারিতে সারা বাংলার নমঃশূদ্রের সংখ্যা গোনা হয়েছিল প্রায় ২১ লক্ষ। এর পরের সুমারি গুলোতে জাত জানাতে আপত্তি শুরু হয়ে যায় । আর একারনেই ১১ সালের সুমারিকেই প্রমান ধরা হয়। এই প্রায় ২১ লক্ষ নমঃশূদ্রের ছ-আনি আট লাখই থাকত বাখরগঞ্জ, দক্ষিণ ফরিদপুর, নড়াইল, মাগুরা, খুলনা, বাগের হাট মিলিয়ে যে ডাঙা সেখানে।

 একথা আমাদের সকলের জানা যে আর্থিক পরিকাঠামোর উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। অস্পৃশ্য জাতি গুলির আর্থিক পরিকাঠামো ভাল না থাকায় তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে অনেক দেরিতে। ১৮৮০ বা ৮৫ থেকে ১৯২০ বা ২৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে বাংলার পাট চাষের সুবাদে নমঃশূদ্রদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভাল হয়। ফলে এই সময়থেকে তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশ করতে শুরু করে।

১৮৮০-১৯২৫ এই সময়কালে খ্রীষ্টান মিশনারীরাও একটা ভূমিকা পালন করেছিল। মিশনারীরা  বাখরগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা অঞ্চলে তারা বহু দিন ধরে কাজ করছিল। এই কাজের ফলে সেখানের সমাজে একটা প্রভাব পড়েছিল গুরুচাঁদ ঠাকুরের বাড়িতে বা মন্দিরে শাহেবের যাতায়াতের ফলে নমঃশূদ্রদের নিজস্ব ধর্ম ‘মতুয়া ধর্ম’ প্রতিষ্ঠিত ও প্রচারিত হয়েছিল। ১৮৮০/৮৫ থেকে ১৯২০/২৫ সময় কালে নমঃশূদ্রদের একটু ভাল থাকা থেকেই নমঃশূদ্ররা তাদের সামাজিক মর্যাদার কথা তুলতে লাগে। ‘চন্ডাল’ নামের পরিবর্তে ‘নমঃশূদ্র’ নাম চাওয়া হল, দেয়া হল অথচ আজও জানা যায়নি নমঃশূদ্র শব্দটিতে কি বোঝান হল।

কোন জাতির অগ্রগতির পথে কবি, সাহিত্যিক গোষ্ঠী বিশেষ অগ্রজ  ভূমিকা পালন করেন। নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশের পর এই জাতির অগ্রগতির পথকে প্রশস্ত করেছেন এই সম্প্রদায়ের কবি তারকচন্দ্র সরকার রচনা করেন ‘শ্রী শ্রী হরিচাঁদ চরিত’। শ্রী মহাপন্দ হালদার রচনা করেন ‘শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ চরিত’  আরও পরবর্তী কালে কবি ও সাহিত্যিক শ্রী জলধর বিশ্বাস তাঁর লেখা ‘ডালি’ ও ইংরাজী কবিতা ‘To My Love’  প্রভৃতি কবিতা বিশেষ  উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কবি শ্রী শৈলেন্দ্রনাথ সমাদ্দার, সাহিত্যিক শ্রী অনিল বিশ্বাস প্রমুখের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই সকল কবি ও সাহিত্যিক তাদের লেখনির মাধ্যমে জাতির আত্মজাগরনের পথকে প্রশস্থ করেছিলেন। নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার যে প্রসার তাঁর প্রতিফলন ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকাশিত হতে থাকে নানান সাহিত্য পত্রিকা। এই বিষয়ে শ্রী মজুমদার পাথেয় শ্রী মনোরঞ্জন বড়াল সম্পাদিত ‘কোনপথে শ্রী যোগেশচন্দ্র বিশ্বাস’ ও অন্যান্য সম্পাদিত ‘সমকাল’ ও ‘ভারতবানী’ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য যা জাতির আত্মজাগরনের পথ কে সুগম করেছিল।

আবার এই সময়ে প্রকাশিত কতগুলি পত্রিকা ও পুস্তক এদের জাগরণের পথকে প্রশস্থ করে। ১৯১২ সালের পূর্বে গুরুচাঁদ ঠাকুরের সম্পাদনায়  প্রকাশিত হয় ‘নমঃশূদ্র সুহৃদ’ পত্রিকা। এই সকল পত্রিকা এদের মধ্যে সামাজিক অধিকার বোধ জাগ্রত করতে সহায়তা করে। অনেক সময় উচ্চবর্গীয়  সমাজ দরদি ও এই সকল পত্রিকায় তাদের প্রবন্ধ লিখতেন যেমন শ্রী দিগিন্দ্রনারায়ান ভট্টাচার্য নমঃশূদ্র পত্রিকায় ‘নিপীড়িতের উত্থান’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন যদিও পরবর্তী কালে এই প্রবন্ধের কিছুটা পরিবর্তন করে ‘নিপীড়িতের নিদ্রাভঙ্গ’ নামে তাঁর ‘জাতিভেদ’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে পুনর্মুদ্রিত করেন। এই সকল পত্রিকা এদের সামাজিক শিক্ষার সর্বস্তর আরো বেশি প্রভাবিত করে।

বিংশ শতকের প্রথম ভাগে সমগ্র নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের জীবনে এক স্মরণীয় সময়। অস্ট্রেলিয়ান মিশনারী সাহেব ডঃ. সি. এস. মিড যিনি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের পথ প্রশস্থ করেন। মিড সাহেবের, গুরুচাঁদ ঠাকুর, অন্যান্য সংস্কারক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ রাজশক্তির সাথে যোগসূত্র স্থাপন করেন। লাট সাহেবকে তাঁদের উপর আরোপিত সামাজিক অবিচারের কথা জানান এবং তাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের জন্য আবেদন জানান। একই সাথে তাঁদের উপর আরোপিত ‘চন্ডাল’ নামক কুখ্যাত আখ্যা মোচনের আবেদন জানান। গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে এই কুখ্যাত চন্ডাল আখ্যা মোচনের জন্য শুরু হয় সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলনে তাঁকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন যশোরের শ্যামলাল বিশ্বাস, ডঃ দীনবন্ধু বড়াই, ডঃ কালী চরণ মওল, ফরিদ পুরের ভীষ্মদেব দাস, পূর্ণচন্দ্র মল্লিক, ডঃ তারিনী চরণ বালা প্রমুখ। এই সামাজিক আন্দোলনের ফলে ইংরেজ রাজ সরকার ১৯১১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট নমঃশূদ্রদের ‘চন্ডাল’ এর পরিবর্তে ‘নমঃশূদ্র’ হিসাবে লেখা হয়।১৬

চাঁদসী চিকিৎসা ব্যবস্থা সেযুগে এতটাই সুফল বহন করেছিল যে এর সুবাদে ইংরেজদের অনুগ্রহ লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। “সম্রাট পঞ্চম জর্জ’ রাজ পরিবারের ক্ষত চিকিৎসার জন্য ডাঃ মহিনী রোহণ দাসকে তৎকালীন গভনর জেনারেল লর্ড চেম্‌স্‌ফোর্ডের মারফতে আমন্ত্রণ করিয়া ছিলেন। (১৯২০ খ্রীঃ লাটভবন)১৭-এ থেকে বোঝা যায় যে উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা পেলে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা যে বিশেষ কল্যাণ সাধন করতে পারত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

পঞ্চানন বর্মা ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ওকালতি আরম্ভ করে দেখতে পেলেন যে রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজ শিক্ষায় অত্যন্ত পশ্চাদপদ। বর্তমান পাশ্চাত্য জগতের সাথে সম্পর্ক রাখতে হলে ইংরাজী শিক্ষা গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক। গরীব গ্রামবাসীর পক্ষে গ্রামে থেকে ইংরাজী শিক্ষা গ্রহণ করতে যেমন অসমর্থ তেমনি অর্থাভাবে পুত্রকে শহরে পাঠাতেও অসমর্থ। যদিওবা দুই চারজন অর্থশালী ব্যাক্তি শহরে রেখে শিক্ষালাভে সমর্থ হয় তথাপি সেক্ষেত্রেও দেখা যায় যে শহরের ছাত্রাবাসে এই পশ্চাৎপদ জাতির ছাত্রদের থাকবার কোন ব্যবস্থাই নেই।

রায়সাহেব উপলব্ধী করেন যে শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া রাজবংশী জাতির অগ্রগতি যেমন সম্ভব নয় তেমনি উচ্চশিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে কতগুলি অসুবিধাও তিনি অনুভব করেন। সে সময় ছাত্রাবাসে কোন ক্ষত্রিয়ের স্থান নেই। যদিও বা কখনও কেউ দয়া করে কোন ছাত্রাবাসে  কোন ক্ষত্রিয়ের ছাত্রকে স্থান দিতেন তথাপি তার সাথে নিকৃষ্ট জাতির ন্যায় ব্যবহার করে। এই অসুবিধা দুর করার জন্য একটি ছাত্রাবাস স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। সরকার ছাত্রাবাস তৈরির টাকা দিতে সম্মত হলেও নিজের সমাজ থেকে ৫০০০ টাকা সংগ্রহ করতে বলেন। পঞ্চানন বর্মা ছাত্রাবাস স্থাপনের জন্য  ৪৯০০ টাকা সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়। ব্রিটিশ রাজসরকার ৯৮০০ টাকা দেয় । ফলে মোট ১৪৭০০ টাকা সংগ্রহ হয়। এই টাকায় ৩২ জন ছাত্রের বাসউপযোগী একটি ছাত্রাবাস নির্মাণ করেন। রাজবংশী সমাজের সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তাকরে ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতির আরেক অগ্রদূত রচনা করেন ‘রাজবংশী কুল প্রদীপ’। বইটি প্রকাশিত হলে রংপুর অঞ্চলের ক্ষত্রিয়দের আরও প্রানবন্ত করে তোলে। ১৯১০ সালের ১লা মে রংপুর শহরে  ক্ষত্রিয় সমিতি গঠিত হয়।১৮

ক্ষত্রিয় সমিতি সমাজের সুচিন্তার উন্মেষ ঘটানোর জন্য এবং সমাজের কুপ্রথা রহিত করার জন্য সমিতি বিভিন্ন কর্মপন্থা গ্রহণ করেছে। ক্ষত্রিয় সমিতির সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি ছিল উপনয়ন গ্রহণের মাধ্যমে রাজবংশী জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ঠের বিকাশ সাধন করা। এই বিকাশ সাধনের প্রধান হাতিয়ার হল শিক্ষা, তাই শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে নির্মিত হল ছাত্রাবাস। সমাজের দরিদ্র মানুষদের সহযোগিতা করার জন্য স্থাপিত হল ক্ষত্রিয় ব্যাঙ্ক। অসহায় নির্যাতিতা নারীর সম্মান রক্ষার্থে গঠিত হল নারীরক্ষা বাহিনী।

বস্তুত অবহেলিত, পিছিয়েপড়া জাতির কিশোর তরুনদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ আনার জন্য এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ভজগোবিন্দরায়, শ্যামাপ্রসাদ বর্মণ এবং সত্যচরণ দাস প্রমুখ। ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা অনুরাগী ক্ষত্রিয়প্রাণ ব্যক্তিগণ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ক্ষত্রিয় সমাজদরদী ব্যক্তিগণের সহায়তায় ১৯২০ সালে বর্তমানে উত্তর দীনাজপুর জেলার রায়গজ্ঞের উকিলপাড়ায় একটি ছাত্রাবাস নির্মাণ করেন। ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার উপদেশ হল,  ‘মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশই শিক্ষার লক্ষ্য…’ ‘বিদ্যাশিক্ষাই জাতির উন্নতির মূল  ভিত্তিস্বরূপ।’১৯ বলাবাহুল্য তৎকালীন ক্ষত্রিয় সমিতির বার্ষিক অধিবেশনগুলিতে শিক্ষাবিষয়ে বিস্তার আলোচনা হতো এবং শিক্ষা প্রসারের অবলম্বন হিসেবে কার্যকর কিছু কিছু প্রস্তাব গ্রহণ করা হত। ক্ষত্রিয় ছাত্ররা ছাত্রাবাসে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

তথ্যসূত্র

১. নীহার রঞ্জন রায়, অগ্রহায়ন ১৪১৪,বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব, কলকাতা-৭৩, পৃঃ-১৪৪।

২. শ্যামল কুমার প্রামানিক, ১৫ আগস্ট ২০১০,পুণ্ড্রদেশ ও জাতির ইতিহাস, কলকাতা- ১২, পৃঃ- ১৯০।

৩.   তদেব , পৃঃ- ১৯২।

৪. Sensous Report 1921, Chaptar XI, PARA – 358।

৫. শ্রী উপেন্দ্রনাথ বর্মণ, ২৭ মাঘ ১৪০১, রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতির ইতিহাস, কলকাতা- ৯, পৃঃ- ১৬।

৬. সুকুমার দাস, উত্তরবঙ্গের ইতিহাস,  ১৯৮২ পৃঃ- ৬৫।

৭. নীহার রঞ্জন রায়, অগ্রহায়ন ১৪১৪, বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব,   কলকাতা- ৭৩, পৃঃ- ১৪৪ ।

৮. শ্যামল কুমার প্রামানিক, ১৫ আগস্ট ২০১০, পুণ্ড্রদেশ ও জাতির   ইতিহাস, কলকাতা-১২, পৃঃ- ১৬৭।

৯. তদেব, পৃঃ- ১৬৭ ।

১০.  ধূর্জটি নস্কর, মার্চ ২০০৮, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় কলতিলক, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় উন্নয়ন  

 পরিষদ, দক্ষিন ২৪ পরগনা, পৃঃ-৪৭।

১১.    তদেব, পৃঃ- ৪৮ ।

১২. শ্যামল কুমার প্রামানিক, ১৫ আগস্ট ২০১০, পুণ্ড্রদেশ ও জাতির   

ইতিহাস, কলকাতা-১২, পৃঃ- ১৭৬।

১৩. তদেব, পৃঃ- ১৬৯ ।

১৪. ধূর্জটি নস্কর, মার্চ ২০০৮, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় কলতিলক, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় উন্নয়ন

পরিষদ, দক্ষিন ২৪ পরগনা, পৃঃ-৭২।

১৫. শেখর বন্দোপাধ্যায় ও অভিজিত দাশগুপ্ত (সঃ), জাতি, বর্ণ ও বাঙালি

সমাজ, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃঃ ১২৭।

১৬. মহানন্দ হালদার, শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ চরিত, ২৪ পরগনা (ঊ), ২য় সং,

১৯৮২, পৃঃ-৪৪৩।

১৭. নরেশ চন্দ্র দাস, নমঃশূদ্র সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ, কলকাতা, ১৩৬৮,

পৃঃ-৩২।

১৮. শ্রী ক্ষেত্রনাথ সিংহ, রায়সাহেব পঞ্চানন বর্মার জীবন বা রংপুর ক্ষত্রিয়

সমিতির ইতিহাস, কলকাতা, ২০০৮, পৃঃ-৫১।

১৯.  তদেব, পৃঃ- ১০।

Dr. Shyama Prasad Mondal  (M.A., B.Ed., M.Phil., Ph.D.) -Guest Faculty, Dept. of History, Dr. B. R. A. S. Mahavidyalaya, Helencha, Bagdah, North 24 Parganas 743270. Mobile No- 9143556240 / 7980712097, Email ID– spmondalwb@gmail.com

About LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705

Online traditional art, literature, history & education based research journal.
This entry was posted in Indigenous Art & Culture. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Your email address will not be published.