November 1, 2021

কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

বিশ্বজিৎ নন্দী

কলকাতা আমাদের প্রাণের শহর। বর্তমান ভারতের তথা সমগ্র বিশ্বের সংস্কৃতিচর্গর অন্যতম গীঠস্থান। আজকের কলকাতার এই সাংস্কৃতিক অবস্থান বহু বছরের নিরলস অধ্যাবসায়, পদ্ধতিগত তথা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণ চর্চ এবং তার বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ মাধূর্যের ফলেই সম্ভব হয়েছে। নান্দনিকতার উৎকৃষ্টতম অবস্থানে অনায়াস বিচরণকারী  শিল্পীদের সিংহভাগ কলকাতা কেন্দ্রীক।

নদী কেন্দ্রিক এই শহরের সূচনাপর্ব সপ্তদশ শতাব্দীতে। ধীরে ধীরে কলেবর বৃদ্ধি হতে আনাগোনা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। মূলত বাণিজ্যকেন্দ্রিক এই শহরের ধনবান ব্যক্তিরা ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদির ভ্রমোনতির সাথে সাথে বিনোদন-এর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছিল। ইতিপূর্বে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিনোদনের গণ্ডী মূলতঃ রাজা বাদশার দরবারেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষেরা বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত সঙ্গীত ও নৃত্যচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল নিজেদের।

আখড়াই, পাঁচালি, তরজা, খেউড়, কবিগান, কীর্তন এইসবই বিক্ষিপ্তভাবে তখনকার সমাজে বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হত। যখন ইংরেজ আধিপত্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করল। দেশীয় রাজা বাদশা, নবাবদের প্রতিপত্তি কমতে শুরু করেছে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য তথা নবাব বাদশাদের দরবারে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে প্রচলন বা চর্চা ছিল তা ক্রমান্বয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়ল। দরবারের সভাগায়ক বাদকগণ, অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ছোট ছোট শহরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলেন। উত্তর ভারতের দিল্লি, আগ্রা, গোয়ালিয়র, লখনৌ, বেনারস, রামপুর থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পীরা পূর্বভারতে তথা কলকাতায় পাড়ি জমাতে শুরু করলেন । পাথুরিয়া ঘাটার ঠাকুরবাড়ি উত্তর কলকাতার দেববাড়ি, মল্লিকবাড়ি, বেহালার চৌধুরী বাড়িতে মুসলিম ওস্তাদদের আনাগোনা শুরু হল।

কলকাতার সাধারণ জনগণ পাঁচালি, খেউড়, কবিগান, আখড়াই, কীর্তন গানের সাথে সাথে রাগসঙ্গীতের অপার মহিমার সাথে পরিচিত হতে শুরু করল। শুধুমাত্র রাগসঙ্গীত নয়, নৃত্য সহযোগে রাগসঙ্গীত পরিবেশনে পটু বাইজি সম্প্রদায় ও কলকাতার ঘরোয়া বৈঠকে স্বমহিমায় উপস্থিত থেকে মানুষের মনোরঞ্জন করতে শুরু করল।

পঞ্চদশ খিস্টাব্দে সমগ্র ভারতবর্ষে ভক্তিপদ আন্দোলন শুরু হয়। একটি রামভক্তি অন্যটি কৃষ্ণভক্তি উত্তর ভারতের মথুরা-বৃন্দাবন অঞ্চলে বৈষ্ণবরা ভজন জাতীয় বিষ্ণুপদ নামক শাস্থীয়গীত প্রচার করেছিলেন। রাজস্থান, গুজরাটে বৈষবগণ কৃষ্ণভজন ও কীর্তন, দক্ষিণের বৈষ্ণবরা কীর্তনমকে এবং পূর্ব ভারতের গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের লোকেরা বৈষ্ণবরা পদাবলী কীর্তনকেই ধর্মীয় গীত হিসাবে ব্যবহার করত। আর সে কারণেই কীর্তন গানের প্রসারতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিভিন্ন প্রদেশে ভজন, কীর্তন গানের প্রচলন থাকার সুবাদে বিশেষত উত্তর ভারতের কীর্তন শিল্পীরা ভারতীয় রাগসঙ্গীতের সুর বৈচিত্রের সংমিশ্রণে কীর্তন গানের এক নতুন ধারা উপস্থাপন করেছিলেন। রাগ সঙ্গীতের প্রভাবে প্রাচীন কীর্তনগান পরিবর্তিত হয়ে তখনকার কলকাতাবাসীকে নতুন ভাবে মোহাবিষ্ট করে তুলেছিল। তখনকার সময়ে অভিজাত বাংলাগান বলতে কীর্তনকেই বোঝাত। শিল্পীরা কীর্তনকে দু’রকম ভাবে পরিবেশন করতেন, নামকীর্তন ও লীলাকীর্তন বা রসকীর্তন বা পালা কীর্তন। নামকীর্তনে সংক্ষিপ্ত পদ সুর ও তালসহ গাওয়া হত আর লীলা কীর্তন-এ কৃষ্ণের জীবনের কোনও ঘটনার বর্ণনা সুর করে গাওয়া হত। গানের সুর প্রথমদিকে রাগভিত্তিক ছিল না। পরবর্তীকালে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভক্তদের গায়নরীতি অনুসরণ করে রাগের মূল স্বরকাঠামো কীর্তন গানে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। শাস্ত্রীয় পালা কীর্তনের মুখ্য প্রচারক ছিলেন শ্রীল নরোত্তম দত্তঠাকুর। ব্রজভূমি থেকে শিখে আসা শাস্ত্রীয় রাগ-তাল-আলাপ বিশিষ্ট বিষ্ণুপদ অনুসরণে শাস্ত্রীয় কীর্তন পরিবেশন করে বাংলার এই অভিজাত গীতধারাটিকে এক উচ্চ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ।

নারোত্তম শাস্ত্রীয় কীর্তনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল দুটি ১. গান শুরুর আগে রাগালাপ এবং ২. শ্রীকৃষ্ণের জীবনলীলা বিষয়ক পদাবলী গাইবার আগে শ্রীগৌরাঙ্গের জীবন লীলার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে অনুরূপ ঘটনাযুক্ত একটি পদ গৌরচন্দ্রিকা হিসাবে গাওয়া। এছাড়াও বৈষ্ণব মহাজনদের রচিত পদগুলির শীর্ষে নির্দিষ্ট রাগতাল অনুসারে শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী গাইবার রীতিও তিনি প্রচার করেন। অভিজাত সমাজে এই কীর্তন ধারা “গড়েরহাটা” শৈলীর কীর্তন নামে প্রচলিত হয়েছিল। যদিও তা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়নি।

প্রধান কারণ হিসাবে এটা ভাবা যেতে পারে যে শাস্ত্রীয় রীতির কীর্তন গাইতে যে শিক্ষা বা প্রচুর অনুশীলন লাগে কীর্তনিয়া সমাজে সেই শিক্ষা সেই অনুশীলন সেই বুদ্ধিমত্তার অভাব ছিল। বর্তমানে নব্য প্রজন্মের মধ্যে কীর্তনের শাস্তীয় ধারার অনুশীলন অনেক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ সঙ্গীত বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পদ্ধতিগতভাবে কীর্তন শেখানো হচ্ছে।

কলকাতার সঙ্গীত চর্চার ইতিহাসে আরও কয়েকটি বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । “পদ ও ট”। কলকাতার অনতিদূরে বিফুপুর অঞ্চলের বিশিষ্ট গুণী শিল্পীদের হাত ধরেই কলকাতায় ধ্রুপদ গানের চর্চা শুরু হয়েছিল,বিষ্ণুপুর বাংলার এক সুপ্রাটীন সংগীতচর্চা কেন্দ্র। বাংলার ধ্রুপদ গানের শুরুয়াৎ বিষ্ণুপুরেই হয়েছিল। তখনকার সময়ে ওই অঞ্চলের রাজা বাদশাবা পশ্চিমের দরবারি সঙ্গীত শিল্পীদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসতেন। রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য । তিনি নিজেও সংগীতজ্ঞ ছিলেন। বিষ্ণুপুরের রামশ্কর ভট্টাচার্য মহাশয়কে এই আদি পদসংগীত গুণী রূপে মান্যতা দেওয়া হয়। রামশঙ্কর মহাশয়ের কৃতি শিষ্যমগুলীর দ্বারা বিষ্ণুপুরের ধ্রুপদ বিষ্ণুপরের গণ্ডি ছাড়িয়ে কলকাতা সহ সমগ্র দেশে প্রচারিত ও প্রসারিত হতে শুরু করেছিল। তীর শিষ্যমগুলীর মধ্যে ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী, রামকেশব ভট্টাচার্য, কেশবলাল চক্রবতী, দীনবন্ধু গোস্বামী, রমাপতি বন্দ্যোপাধ্যায়, অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালের স্বনামধন্য যদুভট্ট ছোটবেলায় অল্প কিছুসময় রামশঙ্কর মহাশয়ের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এই সমস্ত মহান গুণীদের হাত ধরে তৎকালীন কলকাতায় ধ্রপদ গানের প্রচলন ও চর্চা শুরু হয়েছিল।

অন্যদিকে কলকাতার রাগসঙ্গীত চর্চার সেই প্রথম যুগে শাস্ত্রীয় রীতি মেনে টপ্‌পা গানের যে ধারা তখন কলকাতায় শুরু হয়েছিল তাকে আরও অনেক সমৃদ্ধশালী করে তুলেছিলেন_ কালিদাস চট্টোপাধ্যায় বা কালী মীর্জা এবং রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু। কালী মীর্জার জন্ম হুগলি জেলার শুপ্তিপাড়ায়। পরিণত বয়সে পশ্চিমাঞ্চলে উনি টপ্পা শিক্ষা করে দেশের বাড়ি ফিরে আসেন। কলকাতার তৎকালীন সঙ্গীত সমাজে ওঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। তার জীবনী বিষয়ে একমাত্র প্রামাণ্য পুস্তক “গীত লহরীতে তার সম্পর্কে সবিস্তারে জানা যায়। উনি গীত রচনাও করেছিলেন। কলকাতার রাগসঙ্গীত চর্চার সেই প্রথম যুগে অন্যতম নেতৃস্থানীয় শিল্পী এবং একজন আদি অগ্রাচার্য হিসাবে ওর নাম চিরম্মরণীয় হয়ে আছে। অন্যজন রামনিধি গুপ্ত বাংলা ভাষায় শাস্ত্রীয় টপ্পা গান রচনা করেন ও শাস্ত্রীয় রীতি মেনে নতুন এক সঙ্গীত ধারার প্রবর্তন করে্ন। সেসময় সঙ্গীত প্রেমী মানুষদের মনোরঞ্জনে রামনিধি গুপ্ত মহাশয় যিনি নিধুবাবু নামেই সংগীত সমাজে পরিচিত হয়েছিলেন। নিধুবাবু চাকরি সূত্রে বিহারের ছাপরা শহরে কিছুকাল বাস করার সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহন করেছিলেন। বৈচিত্রময়, সুর ঐশ্বর্ষে ভরপুর, প্রগাঢ় ভাব গন্তীর এতিহ্যমণ্ডিত ধারার প্রাণবন্ত একান্তিক সাধনা সাপেক্ষ হৃদয়গ্রাহী রাগ সঙ্গীতের চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। ভারতীয় রাগসঙ্গীতের প্রচলিত গানগুলি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাঙালি তথা কলকাতার শ্রোতৃমণ্ডলীর রসাস্বাদন করিয়েছিলেন।

মাতৃভাষার মাধ্যমে রাগসঙ্গীত চর্চার নতুন ধারা বাংলাদেশে তথা কলকাতায় প্রচলন শুরু করেন। বাংলা ভাষায় শাস্ত্রীয় ধারার টগ্লা গান রচনার মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গীতপ্রেমী জনগণকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ ও শ্রদ্ধা ভালবাসা বৃদ্ধি করেছিলেন। বড় বড় পশ্চিমি কলাবৎ বা ওস্তাদদের গানবাজনা শোনা ও তাদের কাছে তালিম নেবার উৎসাহ বৃদ্ধি করেছিলেন।

সেইসময়ে কলকাতার নব্যশিক্ষিত অভিজাত সম্পন্ন সমাজে সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক বাঙালি ধনী গৃহে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। সেই সব অনুষ্ঠানে পশ্চিমি কলাবৎদের আগমন ও সঙ্গীত পরিবেশন হত। এতিহ্যমণ্ডিত রাগ সঙ্গীতকে আত্মস্থ করার কলকাতাবাসীর এই প্রয়াস কালীবাবু ও নিধুবাবুর দৌলতে সার্থক পরিণতির পথে অগ্রসর হয়েছিল। সেই সময়কার কলকাতায় বিভিন্ন প্রকার নিজন্ব সঙ্গীত চালু ছিল-_ তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পাঁচালি ও কবিগান। পাঁচালিতে মূলত কোন দেবদেবীর কর্মকুশলতা বর্ণনা করে তার অনুগামী হবার কথা সুর করে বলা হত। আর কবিগানে দুই ভাগে ভাগ হয়েদুইজন স্বভাব কবি তৎক্ষণাৎ রচিত কবিতায় সুর করে কোনও বিষয়ে বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হত। সাধারণ দর্শক শ্রোতাদের কাছে সেই অনুষ্ঠান খুবই চিত্তাকর্ষক ও মনোরঞ্জক হত।

গৌজলা গুই, রঘুনাথ দাস, নন্দলাল বসু, নৃসিংহ, হরেকৃষ্ণদীর্ঘাঙ্গী বা হরু ঠাকুর, নিত্যানন্দ ছিলেন। পাঁচালি গানের জনপ্রিয়তা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি কারণ প্রথম দিককার পাঁচালির কোনও সাহিত্য মূল্য ছিল না বা পরিবেশনে কোনও চমৎকারিত্ব দেখা যেত না। তবে পাচালিকে বিবর্তিত রূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন দাশরথি রায়। দাশরথি রায়ের রচনা ও তাহাতে সুরারোপ বেশ কিছুটা উন্নত ও গ্রহণযোগ্য অবস্থানে উন্নত হয়েছিল। সেই সময়ের কলকাতায় প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও ধনী অভিজাত পরিবারে সান্ধ্যাকালীন অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো। সেখানে উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এবং বিষুপুর, বর্ধমান থেকে শিল্পীরা নিয়মিত আসা যাওয়া করেন। কালীবাবু ও নিধুবাবুর সময়কালে বাংলা তথা কলকাতায় রাগ সঙ্গীতের একটি অভিনব রীতি “খেয়াল’ গান এর চর্চা শুরু হয়েছিল। বর্ধমানের দেওয়ান রঘুনাথ রায় বাংলায় প্রথম খেয়াল গানের চর্চা শুরু করেছিলেন।তিনি মূলত খেয়াল গানের রচয়িতা ছিলেন। খেয়াল রচনায় তার এই স্বভাবজাত ক্ষমতা তৎকালীন সময়ে কলকাতায় খেয়াল গানের চর্চা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ধ্রুপদ, ধামার গানে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ এই চার তুক বা কলিতে ভাগ করা হয়। সেই প্রথাকে অনুসরণ করে রঘুনাথ বাবু চার তুকের খেয়াল রচনা করেন। খেয়াল গান ধ্রুপদ গান অপেক্ষা সরল হওয়ায় সাধারণ কলকাতার মানুষরা খেয়াল গানকে বেশি পছন্দ করতে শুরু করেছিল। উনবিংশ শতকের প্রথমদিকে কিছু বাঙালি খেয়াল গায়কের নাম পাওয়া যায় যারা পশ্চিমি গায়কদের কাছ থেকে সঠিক ভাবে খেয়াল গান শিক্ষা করেছিলেন। এদের মধ্যে ধ্রুপদী বিষ্ণু চক্রবর্তী অন্যতম। উনি কাওয়াল-বাচ্চা ঘরানার মিঞা মীরনের কাছে খেয়াল শিখেছিলেন।

কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ক্রমোন্নতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সময় হল উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ। এই সময় কলকাতায় খেয়ালচর্চা বৃদ্ধি পায় বাঙালি সঙ্গীতগুণীরা এইসময় পশ্চিমাঞ্জলের উল্লেখযোগ্য প্রসিদ্ধ ঘরানা যেমন মনোহর ঘরানা, গোয়ালিয়র, আগ্রা, রামপুর, গয়া ঘরানা, কাশী ঘরানা, কিরানা ঘরানার বিভিন্ন গুণীশিল্পীদের সংস্পর্শে এসে ব্যাপকভাবে খেয়াল গানের চর্চা শুরু করেন।

কলকাতার দর্পনারায়ণ ঠাকুর বংশীয় কালীকৃ্ষ্ণ ঠাকুরের সঙ্গীত সভায় মনোহর ঘরানার গুণী শিল্পী রামকুমার মিশ্রর আগমন ঘটেছিল। কলকাতা অবস্থানকালে উনি প্রচুর শিষ্য মণ্ডলী তৈরি করেছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন__ মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (মহেশ ওস্তাদ), সতীশচন্দর চট্টোপাধ্যায়, উনি সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সভায় গায়ক ও তবলাবাদক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। লক্ষ্মী নারায়ণ বুয়াজী, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, তুলসীদাস চট্টোপাধ্যায় ( ধ্রুপদী গঙ্গানারায়ণের পৌত্র) কালীপ্রসন্ন ঘোষ, নিবারণ কথক, যোগীন্দ্রনাথ ঘোষ, শত্তুচরণ মুখোপাধ্যায়, জীতেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আগ্রা ঘরানার খ্যাতি মুলত খেয়ালের জন্য । বাংলায় এই ঘরানার খেয়াল গানের প্রচার করেন ফৈয়াজ খাঁ এবং তার শিষ্য-শ্যালক আত্তা হুসেন খাঁ। গোয়ালিয়র ঘরানার বিখ্যাত ধ্রুপদীয়া শিবনারায়ণ ও গুরুপ্রসাদের কাছে সে সব বাঙালি সঙ্গীত গুণী তালিম পেয়েছিলেন তারা হলেন- শশীভূষণ দে, যদুমণি, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, রাধিকা প্রসাদ গোস্বামী, আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এঁদের মধ্যে রাধিকা প্রসাদ গোস্বামী এই ঘরানার বৈশিষ্ট্য বহুদিন বজায় রেখেছিলেন। তার শিষ্যমগুলীর মধ্যে মহীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, গিরিজাশক্কর চক্রবর্তী, কিশোরীমোহন ভাস্কর, ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ললিত মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দপ্রসাদ গোস্বামী এবং নাটোরের যোগীন্দরনাথ রায় উল্লেখযোগ্য। রামপুর ঘরানার খেয়াল কলকাতায় প্রচলিত হয় মূলত মেহেদি হোসেন খাঁ এবং খাদেম হুসেন খাঁ-এর মাধ্যমে। মেহেদি হোসেনের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে-_ গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী প্রবোধচন্দ্র দাস, জয়কৃষ্ণ সান্যাল, সচীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, কালিদাস সান্যাল প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এঁরা ছাড়াও কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ক্রমান্বয়ে উন্নতি ও পরিচিতির পিছনে উল্লেখযোগ্য নামগুলি হল ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, উজির খা, ভৃপেন্দ্রনাথ ঘোষ, সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর, উস্তাদ আলাউদ্দিন খা প্রমুখ।

১৭৮৪ খ্রি. কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারে গৃহ বিবাদ ও শরিকি বিবাদের ফলে মন কষাকযির দরুন ক্রমশই নানা শরিকে ভাগ হতে হতে নীলমণি ঠাকুর সপরিবারে জোড়াসাঁকোতে চলে আসেন। নীলমণির ভাই দর্পনারায়ন ঠাকুর থেকে যান সাবেকি বাড়ি পাথুরিয়াঘাটাতে। পাথুরিয়াঘাটার ধীরে ধীরে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মহারাজা স্যর যতীন্দ্রমোহন ও তীর ভাই রাজা স্যর সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর।

সৌরীন্দ্র মোহন প্রচুর অর্থের বিনিময়ে প্রাচীন সংস্কৃত পুথি সংগ্রহ করেছিলেন এবং অধ্যয়ন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর রচিত “সঙ্গীত দর্পণ” ও “সঙ্গীতসার সংগ্রহ” এই দুটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।

তিনি যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ওঁর রচিত ইংরাজি ভাষায় লেখা সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য তিনি”ডক্টর অফ মিউজিক” উপাধিকে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত বিদ্যালয়ে প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত গুরুর কাছে শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিত। বিখ্যাত সঙ্গীত গুণীদের সহায়তায় নিয়মিত সঙ্গীত সন্মেলন-এর আয়োজন করা হত। তিনি জীবনে প্রভূত খ্যাতিমান হয়েছিলেন। যথা-_ সেতারবাদক ও নাট্যকার বৈকুষ্ঠনাথ বসু পরে রায়বাহাদুর। বুরিবন ক্রেস্টার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক দক্ষিণাচরণ সেন, ধ্রুপদি কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রভৃতি। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের পিতা হরিদাস চট্টোপাধ্যায় সৌরীন্দ্র মোহনের সঙ্গীত বিদ্যালয়ে বেহালাবাদন শিক্ষা করেছিলেন।

পাথুরিয়া ঘাটার মতো জোড়াসীকো ঠাকুর বাড়িতেও নীলমণি ঠাকুরের বংশধর প্রিন্স দ্বারকানাথ ও তৎপুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেমেয়ে ভাইপো ভাইবি এবং তাদের ছেলেমেয়েরাও সাহিত্য ও সঙ্গীতের চর্চা করেন একাগ্রচিভে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর উদ্ভাবনকরেছিলেন মৌলিক স্বরলিপি পদ্ধতি। হেমেন্দ্রনাথ সঙ্গীতে পারদর্শী হয়েছিলেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৌলিক নাটক ও প্রাচ্য সঙ্গীতের পাশাপাশি পাশ্চাত্য সঙ্গীতেরও চর্চা করতেন । তিনি আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। দেবেন্দ্রনাথের কন্যা সৌদামিনী দেবী বরাহ্মসঙ্গীত রচনা করেন, অপরকন্যাস্বর্ণকুমারী দেবী সাহিত্য ও সঙ্গীতে সমান ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ভ্রাতুষ্পুত্রদের মধ্যে গগন ঠাকুর, অবন ঠাকুর চিত্রশিল্পে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ছিল বহুমুখী। কলকাতার সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চায় ঠাকুরবাড়ির অবদান অনস্বীকার্য। এই দুই ঠাকুর পরিবারে কলকাতার নবজাগরণ শুরু হয়েছিল। এছাড়াও গৌরীপুরের রাজা ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, মুক্তাগাছার সূর্যকান্ত আচার্য, নাটোরের মহারাজা, গোবরডাার সারদা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, ত্রিপুরার বীরবিক্রম বাহাদুর, পাথুরিয়াঘাটার ভূপেন্দরনাথ ঘোষ, দমদমের শ্যামলাল ক্ষেত্রী, শেঠ খাঁ এরা যুগে যুগে কলকাতাকে সাংগীতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য দিল্লিতে মুঘল সম্রাজ্য ছত্রভঙ্গ হবার পর বিভিন্ন প্রান্তিক রাজারা স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচানা করতে শুরু করেন। ওয়াজেদ আলীও লক্ষৌ-এ তাঁর দরবারে শিল্পী, বীণকারদের মর্যাদার সঙ্গে স্থান দিয়েছিলেন। ইংরেজরা ওয়াজেদ আলীর বিরুদ্ধে কুশাসনের অভিযোগ এনে রাজ্যচ্যুত করেন। ১৮৫৬ সালে বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা বৃত্তি দিয়ে কলকাতার উপকণ্ঠে মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে নির্বাসিত করেন। কলকাতা আসার দু’বছরের মধ্যেই মেটিয়াবুরুজেও ওয়াজেদ আলী দরবার বসান। ওয়াজেদ আলীর দরবার কলকাতার রাগসঙ্গীত চর্চার মান উন্নয়নে প্রভূত সাহায্য করেছিল । শোনা যায় লক্ষ থেকেই প্রচুর গায়ক বাদক ও নর্তকীকে তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নিয়ে এসেছিলেন। তখনকার সময়ের কলকাতার প্রখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্বরাও ওয়াজেদ আলীর দরবারে সঙ্গীত সভায় অংশগ্রহণ করতেন। ওয়াজেদ আলী নিজেও কথক নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। তিনি সঙ্গীত রচয়িতা হিসাবেও খ্যাতি আর্জন করেছিলেন। বিশেষত ঠুংরি গান রচনায় তার চর্চার মান উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছিল । তিনি প্রায় ৬৪ খানা বই লিখেছিলেন। এর মধ্যে আখতারের বেদনা “হুজন ই আখতার” বইটি ওর আত্মজীবনী । তিনি আখতার পিয়া ছদ্মনামে বই লিখতেন। ওয়াজেদ আলী একাধারে সঙ্গীত শিল্পী ও লেখক হওয়ার কারণে তার দৃষ্টিভঙ্গি অনেক স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত ছিল।

১০

উনি বুঝতে পেরেছিলেন খেয়াল গানের ব্যাকরণগত জটিলতা সাধারণ মানুষকে সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণকে কমিয়ে আনছে। কলকাতার সাধারণ দেশীয় সঙ্গীতপ্রেমী বা দেশীয় সঙ্গীত চর্চাকারী জনসাধারণকে সঙ্গীতমুখী করে তুলতে তিনি খেয়াল গানের ব্যকরণগত দিকটাকে একটু শিথিল করে নতুন একধারার ঠুংরি গানের প্রচলন করেন। প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিল্পীদের দরবারে স্থান দিয়ে তাদের গায়নের মাধ্যমে কলকাতার জনগণকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতমুখী বা সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছিলেন। ঠুংরিগানে ভাবপ্রবণতা সনারিত হবার সাথেসাথে প্রকাশভঙ্গির কাঠিন্য যেন ক্রমেই শিথিল হয়েছিল । ব্যাকরণ ও শাস্তরগত কাঠামো কলকাতায় সমাদর লাভ করেছিল । খেয়াল গানে রাগ-রাগিনীর বিশুদ্ধতা সেটা ঠুংরি গানে প্রয়োজন না থাকার কারণে সাধারণ গায়ক গায়িকারা ঠুংরি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

সঙ্গীতের সাথে নৃত্য পরিবেশন সেই সময় ত্রমে ত্রমে বহুল প্রচলিত হতে শুরু হল। ওয়াজেদ আলী নৃত্যবিশারদ হওয়ার কারণে সঙ্গীত রচনায় এক বিশেষে ভঙ্গিমার উদ্ভাবন হল। গুংরির ভাবধর্মী স্বাধীন পদক্ষেপ খেয়াল গানের মহলে তেমন সমাদর লাভ না করলেও তার জয়যাত্রার গতি কেউ রোধ করতে পারল না। ওয়াজেদ আলী নিজেই ভালো ভালো ঠুংরি গান রচনা করলেন। তারমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভৈরবী রাগে “বাবুল মেরা নইহার ছুট যায়”। তার দরবারে কথক নৃত্যবিদ বৃন্দাদীন__ “সনদপিয়া” ছদ্মনামে বহু ঠুংরি গান রচনা করে গেছেন। ওয়াজেদ আলী সাহেবের দরবারে অন্য একজন সঙ্গীতজ্ঞের নাম এখানে উল্লেখ্য। তিনি হলেন সাদিক আলী খাঁ। তখনকার কলকাতায় ঠুংরী গানের প্রচলনে সুপ্রসিদ্ধ সাদিক আলী খাঁ-এর আবদানও আনস্বীকার্য।

১১

ওয়াজেদ আলী সাহেবের কলকাতা আসার পর থেকে কলকাতার ধনী ব্যক্তিদের বাড়িতেও গান বাজনার আসর বসতে শুরু করে। সেখানে শাস্ত্রীয় গানের শিল্পীদেরও আমন্ত্রণ জানানো শুরু হয়। ক্রমে প্রায় প্রত্যেক জলসায় বা বিনোদনের আসরে বাইজিদের প্রাধান্য দেওয়া হত। বিশ শতকের শুরুতে কলকাতায় বাইজি প্রাধান্য বিশেষ ভাবে দেখা যেতে থাকে। এতে তাদের উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে পড়ে। নাচ-গান দিয়ে জলসা জমিয়ে দেওয়াই ছিল তীদের প্রধান ছিল না। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে গহরজানের পারিশ্রমিক ছিল এক থেকে দেড় হাজার টাকা। খেয়াল ঠুংরি, ইংরাজি গানের সাথে সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও গাইতেন গহরজান।

গহরজানের সাথে মালকাজানের নামও শোনা যায়। এই দুই জনের রূপ সৌন্দর্যে ছলাকলায়, কষ্ঠমাধূর্যে শ্রোতৃমগ্ডলী মোহিত হয়ে পড়তেন। ওই সময় আগ্রার ফরিদাবাদ থেকে কলকাতায় বাঈ-এর রূপ অতটা ভালো না থাকলেও সঙ্গীতের খুব পারদর্শী ছিলেন। শোনা যায় কলকাতায় বেশ কয়েকটি আনুষ্ঠানে মোস্তারি বাঈ-এর গানের পর কেউ গান করতে রাজি হতেন না। সুরের মায়াজাল বিস্তার করে শ্রোতৃমণ্ডলীকে বুঁদ করে রাখতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একবার মোস্তারি বাঈ-এর গান শুনে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। রীতিমতো ওস্তাদদের কাছে গানের তালিম নিয়েই বাইজিরা অনুষ্ঠান করতেন। তবে গুণী হওয়া সত্বেও সমাজের চোখে ওরা খুব নিচু ছিলেন। সম্মান পেতেন না খুব একটা। তবে কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যচর্চার ইতিহাসে বাইজিদের অবদান বিশেষ ভাবেই উল্লেখযোগ্য । ওই সময়ের আরও কিছু কিছু বাইজিরা বাইরে থেকেও আসতেন কলকাতায়। তাদের মধ্যে পাশাপাশি বাঙালি বাইজিরাও তখন বেশ সুনামের সাথে জলসায় অংশ নিতেন। এরা সকলেই গুণী ওস্তাদদের কাছে তামিলপ্রাপ্ত হয়ে দক্ষ শিল্পী হিসাবে পশ্চিমি বাইজিদের মানদাসুন্দরী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে যদুমণি জীবনের চড়াইউত্রাই পেরিয়ে মানদা, কৃষ্ণভামিনীর মতো বাইজিরাও রাগসঙ্গীতে যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। ওরা সাধারণশ্রোতা ও গুণী শিল্পীদের প্রচুর বাহবা কুড়িয়েছিলেন। এইসব বাইজিরা প্রায় সকলেই কলকাতার বহু সঙ্গীত পিয়াসি ছাত্রদের সঙ্গীতের শিক্ষাদান করেছিলেন। গহরজানের কাছে গান শিখেছিলেন প্রখ্যাত তবলাবাদক শ্যামল বসু মহাশয়ের বাবা অনাথনাথ বসু, ইন্দুবালা।

১২

শোনা যায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যদুমণির ভক্ত ছিলেন। দেশবন্ধুর বাড়িতেও যদুমণির গানের অনুষ্ঠান হয়েছিল। তখনকার সময়ে দমদমে ব্যবসায়ী শেঠ দুলিচাঁদের বাগানবাড়িতে বেশ বড় আকারের জলসার আয়োজন হত। সেখানে ঠুংরির রাজা মৌজুদ্দিন, তারাবাঈ এঁরা সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তারাবাঈকে তালিম দেবার জন্য দুলিচাঁদ, বাদল খাঁ-এর মতো সঙ্গীত গুণীকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। সেই সুবাদে গিরিজাশঙ্কর, জমিয়দ্দিন খাঁ, ভীম্মদেব চট্টোপাধ্যায় এঁরাও তালিম পেয়েছিলেন। কলকাতার ৬ নং ল্যান্সভাউন রোডে “নাটোর ভবন’-এ জগদীন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতে নিয়মিত আসর বসত। সেখানে বিশ্বনাথ রাওয়ের ধ্রুপদ, জিতেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সেতার-সুরবাহার, ্মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের খেয়াল ও টপ্পার অনুষ্ঠান হত। কালে খাঁ, ফৈয়াজ খাঁ-এর মতো সঙ্গীত গুণীকে আমন্ত্রণ করেও অনুষ্ঠান করানো হত।

কলকাতার লোহিয়া মাতৃসদনে একসময় আশুতোষ ও দুনিয়া লাল শীলের বাসভবন ছিল। বিশিষ্ট সুরবাহার বাদক হরেন্দ্রকৃষ্ণ শীল ছিলেন ওই বাড়ির সন্তান। ওই বাড়ির দোতলার ঘরে নিয়মিত আসর বসত। এরকম বহু বহু ধনী গৃহের বাসভবনে পালাপার্বণে ও শৌখিন জলসাঘরে আয়োজিত সঙ্গীতানুষ্ঠানে বড় বড় ওস্তাদদের আগমন হত। ক্রমে ক্রমে সেই সব জলসাঘরের অনুষ্ঠান সাধারণ মানুষের মিলিত প্রচেষ্টায় মাঠে ময়দানে সম্মিলনী কক্ষে স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছিল। এক একজন দিকপাল সঙ্গীত গুণীর অনুরাগী ও শিষ্যমণ্ডলী বা গোষ্ঠী তৈরি হতে হতে ব্যাপকভাবে কলকাতায় শাস্তীয় সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয়েছিল।

১৩

সঙ্গীতানুরাগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সঙ্গীত শিক্ষার স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। সঙ্গীতকে সহজতর উপায়ে শেখানোর জন্য স্বরলিপি পদ্ধতিকে আরও পরিচ্ছন্ন ও বোধগম্য করার লক্ষ্যে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়েছিল। এক্ষেত্রে ঠাকুরবাড়ি বিশেষ ভূমিকা ছিল। পূর্বেকার ক্ষে্রমোহন গোস্বামী প্রবর্তিত দণ্ডমা্রিক ও কৃষ্ণধন প্রবর্তিত রৈখিক পদ্ধতি অবলম্বনে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈজ্ঞানিকভাবে যে স্বরলিপি প্রবর্তন করেন তাকে বলা হত কসিমাত্রিক স্বরলিপি । মাত্রা দেখাবার জন্য কসি, তারা গ্রাম নির্ধারণ করার জন্য উপরে ফুটকি চিহ-__ এক পঞঙ্ভ্তিতে সমগ্র লিপিটি লেখা হত। ক্ষেত্রমোহনের মতো তিন পঙ্ভ্তি ছিল না। ব্যবহারের পক্ষে যথেষ্ট সুবিধাজনক ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত এই স্বরলিপি প্রথম প্রকাশিত হয় তার সম্পাদিত তত্ববোধিনী পর্রিকায়। কিন্তু এই কসিমাত্রিক পদ্ধতিকে প্রচলিতকরার জন্য যথোচিত তৎপর ও উদ্যোগী না হওয়ায় সঙ্গীত জগৎ থেকে এটি অবলুপ্তি হয়। অবশেষে নিরন্তর গবেষণার ফলে জ্যোতিরিক্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ভাবিত আকারমাত্রিক প্রণালী সবচেয়ে কার্যকরী ও সুপ্রচলিত হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নানা স্বরলিপি গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করে মাসিক পত্রিকায় মাসের পর মাস বছরের পর বছর প্রচার করে আকারমাত্রিক স্বরলিপিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রচার প্রসারে এই স্বরলিপি পদ্ধতির উদ্ভাবন সেই সময়ের এক উল্লেখযোগ্য অবদান।

জমিদারদের বা ধনী ব্যক্তিদের জলসাঘরের বাইরে প্রথম শাস্ত্রীয় সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজক হিসাবে “ভবানীপুর সঙ্গীত সম্মিলনী”্র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজও ওঁরা ধারাবাহিক ভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান আয়োজন করে চলেছেন। এছাড়াও মৃদক্গাচার্য মুরারিমোহন গুপ্তের স্মৃতিতে তীর শিষ্য-প্রশিষ্যরা “মুরারি সন্মেলন”। শিবরাত্রির দিনে ১৮ নং রাধানাথ মল্লিক লেনে দুই বিখ্যাত পাখোয়াজ বাদক দীননাথ হাজরা এবং নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে শঙ্কর উত্সব” নামে একটি ধরপদি সঙ্গীত সম্মেলন, বউবাজারে হিদারাম ব্যানার্জি লেনে দীননাথ হাজরার নামে আরো একটি সম্মেলন শুরু হয়েছিল। এই সমস্ত ছোট ছোট ঘরোয়া সন্মেলনগুলি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি কিন্তু আগ্রহী সঙ্গীত পিপাসুদের সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। বউবাজার অঞ্চলে ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য প্রেমচাঁদ বড়ালের বাড়ি কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চার একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল। সঙ্গীত চর্চার প্রতি তেমন উৎসাহ দেবার লোক ছিল না। তাই গোপনে তিনি মুরারিমোহন গুপ্তর কাছে পাখোয়াজ তালিম নিয়েছিলেন। পরে বাজনা ছেড়ে বেনারসের কাশীনাথ মিশ্র ও কাশীর বিশ্বনাথ রাওয়ের কাছে ধ্রপদ ধামার এবং রমজান খাঁ-এর কাছে টপ্পা শিখেছিলেন।

১৪

পরবর্তীকালে গোপাল চক্রবর্তীর কাছে খেয়ালের তালিম নিয়ে গায়ক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯০৭ সালে মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে লালচাঁদের মৃত্যু হয়। ওর তিনপুত্র কিষণচাঁদ, বিষেণচাঁদ ও রাইচাঁদ বড়াল। প্রত্যেকেই সঙ্গীত গুণী হিসাবে কৃতিত্ব পেয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে রাইটাদ বড়ালের প্রধান উদ্যোগে কিছু সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের সহযোগিতায় বড়াল বাড়ির অন্দরমহলেই শিল্পীদের মেলা বসেছিল। লালচাঁদ উৎসব নামে এই সঙ্গীত সভার খ্যাতি সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। বড়াল ভাইদের উদ্যোগে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের নামী শিল্পীরা কলকাতায় এসে একাধিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যশ, খ্যাতি ও অর্থ উপার্জন করতেন। বর্তমানের দিকপাল শিল্পী আমজাদ আলী খান সাহেবের বাবা হাফিজ আলী খান সাহেব বড়াল বাড়িতেই অতিথি হিসাবে দীর্ঘকাল কাটিয়ে কলকাতায় এবং বহিরাগত শিল্পীদের নিয়ে তখন থেকেই উদ্যোক্তাগণ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর বসাবার ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিল। সুরসম্রাট আলী আকবর খাঁন সাহেবও পঞ্চিত রবিশঙ্করের গুরু বাবা আলাউদ্দিন খান সাহেবও লালচাঁদ উৎসবে অনুষ্ঠান করে তখনকার কলকাতায় নিজেকে ধবজা বহন করে চলেছেন। তবলার জাদুকর ও্তাদ আহমেদ জান থেরকুয়া সাহেবের কলকাতা আগমনও এই লালটাদ উৎসবে। বর্তমানকালের অন্যতম-তবলিয়া তথা গজল গায়ে সাবির খান-এর পিতা তখনকার সময়ের একমদ্বিতীয়ম। সঙ্গতকার ওস্তাদ কেরামতু্লা খানের প্রথম তবলাবাদন অনুষ্ঠানও এই লালচাঁদ উৎসবের শুরু হয়েছিল। কলকাতার এইসব সঙ্গীত সন্মেলনের অনেক স্মৃতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আজও দেখা যায়। আমার তবলা শিক্ষার গুরু আচার্য শঙ্কর ঘোষ মহাশয়ের কাছে পুরোনো দিনের অনেক অনেক ঘটনা শুনেছি। কলকাতায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে বহু মানুষ শীতের মধ্যেই সারারাত অনুষ্ঠান শুনতেন।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কলকাতা এইভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাণকেন্দ্র রূপে পরিচিতি পেতে শুরু করেছিল। সারা ভারতে ক্রমে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হতে হতে দেশ স্বাধীন ও দেশভাগের পর নতুন ভারতের জন্ম হল। আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষা সংস্কৃতির উপর প্রভাব ফেলতে মানুষের কর্মসংস্কৃতি পরিবর্তিত হতে থাকল।

১৫

কলকাতার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি ও রেডিওর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। পরে কখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব। স্বাধীনতা পরবতীকালে কলকাতার সঙ্গীত জগতে তবলা বাদনে প্রভূত উন্নতিসাধিত হয়েছে। বর্তমানের সারা পৃথিবীতে উচ্চমানের তবলাবাদকদের মধ্যে সিংহভাগই কলকাতার শিল্পী। এ বিষয়ে আমার দাদা গুরু আচার্য দেশিকোত্তম পদ্মভূষণ পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ওর ডিকশন লেনের বাড়িতে বড় বড় ওস্তাতদের অতিথি করে এনে দিনের পর দিন তাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সামিল করে নিজ অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমে বিভিন্নভাবে ওস্তাদদের সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে সঙ্গীতের ও তালবাদ্যের দুরূহ সব কেরামতির সূত্র তথা চলন তথা রাস্তা আয়ত্ত করে পরবর্তীকালে ছাত্রদের মাঝে বিতরণ করেছিলেন । বিনা গুরু দক্ষিণায় নিজের বাড়িতে রেখে তবলা শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই এক একজন দিকপাল তবলাবাদক হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমান কালের সিংহভাগ যুগে সারা পৃথিবী একটা গ্রাম বা শহরের মতো রূপ নিয়েছে। সঙ্গীত সাহিত্য সংস্কৃতিতে বিভিন্ন জাতি দেশ সমাজের প্রভাব পড়েছে। নব্যযুগের এই সময়ে হঠাৎ করেই বিশাল এক পরিবর্তন এসেছে। এসব কিছুর মাঝেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অপার মহিমা সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে এখনো মোহাবিষ্ট ও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ভাইরাসের এখনকার এই অতিমারীর প্রভাবে সাময়িকভাবে অনুষ্ঠান বন্ধ থাকলেও উৎসাহী ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও পেশাদার সঙ্গীতবিদরা নিয়মিত ভাবেই সঙ্গীত শিক্ষা ও চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমানকালে চিকিৎসাশাস্ত্রেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে ব্যবহার করে মরণাপন্ন রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে। কলকাতার সঙ্গীতচর্চার ইতিহাসের মহাসমুদ থেকে স্বল্প পরিসরে আমি কিছুটা আলোকপাত করলাম।