সাধারণ মানুষ

অবহেলিত বা নিম্নবর্গীয় মানুষ কথাটা শুনতে খুবই খারাপ লাগে। স্বাধীনতার পরে অনেকগুলো বছর পেরিয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশ পরে স্বাধীন হয়েও নিজেদের দারিদ্র্যকে মোকাবিলা করেছে। আমাদের দেশের মতো এত বেশি সংখ্যক দরিদ্র মানুষ পৃথিবীর আর কোন্‌ দেশে আছে?  এত বৈষম্য আর কোথায়? রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের নজর বা দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করে নানাভাবে।  কখনও নোট বন্দি, বিনা জমায় ব্যাংক একাউন্ট, ঋণ ছাড়, ভারত পাকিস্তানের লড়াই, হত্যা বন্ধ করার জন্য আইন, চীনের জিনিস বয়কট করার মতো নানা হুজুক তৈরি করে। বিদেশ থেকে কালো টাকা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে রাজনৈতিক দল, সরকার। কিন্তু ফুটপাতে, বস্তিতে, ঝুপড়িতে নিরন্ন মানুষদের নিয়ে কোন কথা কখনো কেউ বলেছে? কোন সরকার? রাজনৈতিক দল? না, বলেনি। এরই মধ্যে অনেকেই পাপ পূণ্যের হিসাব কসে নিয়েছে!  মাঝেমধ্যে সাধারণ নিরন্ন মানুষদের কোন দাবি দাওয়া নিয়ে বড়ো আন্দোলন হলে কিংবা নিজেদের ঔদার্য প্রমাণ করার জন্য রুটির টুকরো ছেড়ে দেবার মতো করে কিছু প্রকল্প ঘোষণা করা হয়।  পথ শিশুদের জন্য, বস্তির শিশুদের জন্য, কন্যা সন্তানদের জন্য, বিধবাদের  আর বৃদ্ধদের জন্য কিছু বরাদ্দ হয়। দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেয়। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ দেয় সরকার। আমরা সাধারন মানুষ এতেই খুশি। আমরা হাততালি দিই। সরকারের জয়গান করি। তাদের কথায় লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। গরিব মানুষের হাতে লাঠি, তাদের হাতে পতাকা। তাদেরকেই মিছিলের সারিতে দেখি, মিটিংয়ে দেখি।

সাধারণ মানুষের একটা সংজ্ঞা দেওয়া যাক্‌।  এরা চালের দাম বাড়লে কিংবা কেরোসিনের লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে নিজেদের অদৃষ্টকে কিংবা ডিলারকে দোষারোপ করতে করতে বাড়ি ফিরে যায়। ব্লাকে কেরোসিন কিনে চালে ডালে মিশিয়ে খাবার তৈরি করে। অভাবের সংসারে যাদের নিত্য অশান্তি মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, শশুর-শাশুড়িরা বাদানুবাদ করে ঘুমোতে যাওয়া, ঝগড়া করে বাড়ি থেকে চলে যাওয়া, তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যা করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আবার কেউ গৃহদেবতার কাছে মনের কথা জানায়, ছেলেটা যেন একটা চাকরি পায়। মেয়ের বিয়ে যেন ভাল ছেলের সঙ্গে হয়। কর্তার অসুখটা যেন তাড়াতাড়ি সেরে যায়। জল পড়া, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথির সঙ্গে ঝাড়ফুঁক টোটকা মাজারে কিংবা মন্দিরে আশীর্বাদ ভিক্ষে করে। দুবেলা ঘরে ক্যালেন্ডারের ছবিতে সিঁদুর, ফুল, মালা দিয়ে পুজো করে। একই ঘরে মন্দির মসজিদ গির্জা। এরাই হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এরাই আবার কখনো কেউ খাঁটি হিন্দু, খাঁটি মুসলমান। কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ শূদ্র। একটা ছুতো পেলেই হল। রাম রহিমের কোলাকুলি হাতাহাতিতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্বীকার হতে বেশি সময় লাগে না। তারপর গুলি বন্দুক, রক্ত আর কান্নার দীর্ঘশ্বাস বাড়তে থাকে। ‘হায় ছায়াবৃতা, কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিতের চেহারা। মুহূর্তেই হারিয়ে যায় সব বন্ধুত্ব!

দারিদ্র আর পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক আছে। সাধারণভাবে কায়িক পরিশ্রম যারা বেশি করে, তারা অনেক বেশি পরিশ্রম করে কম হয় উপার্জন করে। আর যারা মেধা বা বুদ্ধি নিয়ে কাজ করে তাদের আয় বেশি। তাই গ্রাম নগর মাটির দিকে মুখ করে দিনান্ত পরিশ্রমী মানুষরাই পিছিয়ে পড়েছে। তাদের না ছিল অতীত, না আছে বর্তমান। এরা নাম-গোত্রহীন  হয়ে পড়ে। এরা কাজের সঙ্গে মিলিয়ে একটা পদবী জোগাড় করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু সেটা তাদের নিজেদের জন্যে নয়, বাবুদের সুবিধার জন্যে।  রামু মুচি,  শ্যাম মেথর, গগন  চণ্ডাল, কৃষ্ণ ডোম, গৌর হাঁড়ি ইত্যাদি, ইত্যাদি। জন্ম জন্মান্তর ধরে সেই পদবী বয়ে নিয়ে চলেছে সবাই। দাসত্বের এ এক শৃঙ্খল সরকারী নিয়মে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে  জন্ম জন্মান্তর ধরে। আর এটা হয়েছে অভিভাবকদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঠিক ঠিকভাবে লোক গুলোকে চিনে নেবার জন্য, আইন রক্ষার জন্য, অভিজাতদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। একসময় ছিল এরা নিজেদের এক একটা পাড়ায় মিলেমিশে থাকতো। এখনো থাকে, তবে এরাও বদলে যাচ্ছে। এরা কোথাও ভূমিজ, কোথাও চন্ডাল।

সাধারণ মানুষ ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিনে পায়ে হাঁটে, ট্রেনে বাসে ঝুলতে ঝুলতে যায়। রাস্তায় পড়ে থাকা সামগ্রী নিশ্চিন্তে কুড়িয়ে নেয়। আবার এরাই কুড়িয়ে পাওয়া টাকার থলি থানায় জমা দিয়ে আসে। ভোট দেয়। নেতারা ডাকলে দল বেঁধে হাজির হয়। মাঠে ময়দানে, কলে কারখানায় তুফান তোলে। এদের হাতেই বোমা আর পিস্তল দিয়ে নেতারা নিশ্চিন্তে ঠাণ্ডা ঘরে বসে ফোন করে। গণতন্ত্রের স্বাদ এরা বোঝে না। নেতারা বললে থালা বাজায়, মোমবাতি জ্বালে, বাজি আর বোমা বাঁধতে গিয়ে খণ্ড বিখণ্ড হয়ে হারিয়ে যায়। তবু গণতন্ত্রে এরাই শেষ কথা বলে। সবুজ থেকে গেরুয়া হয়ে লালে কিংবা তেরঙ্গায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া।

https://lokogandhar.com/wp-content/uploads/2020/10/অবহেলিত-বা-নিম্নবর্গীয়-মানুষ.docx-2.pdf

Leave a Comment