শেষ দৃশ্য শুধু নিজের জন্য?-অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়


আশির দশকের প্রথম পরিচিতি। তারপর নানা মুহর্তে একজোট হওয়া। আর শেষ লগ্নে ছবিতে অভিনয়। স্মৃতি। ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রসঙ্গে অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায


আশির দশকে কর্মসূত্রে আমাকে প্রায়ই যেতে হত ‘রেসপন্স’ নামের একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায়। সেই সময় চোখে বড়াে ফ্রেমের চশমা, কোকড়ানো চুল, শ্যামলা দোহারা একটি অল্প বয়সী মানুষকে দেখতে অভি কমনীয়তার সঙ্গে অফিসের এদিক-ওদিক যাতায়াত করছে। চোখে পড়ার মতাে চেহারা না হলেও একটা হালকা সৌন্দর্য ছিল চেহারাটার মধ্যে। পরবর্তীকালে বুঝেছিলাম সেটা ওর নরম স্বভাবটার জন্য। সেই সময় ওর নামও জানতাম না বা ব্যক্তিগত পরিচয়ও ছিল না।

এই বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ঋতুপর্ণর সঙ্গে আমার আবার যােগাযােগ হয় আমার দীর্ঘ দিনের বন্ধু সুপণ্ডিত অধ্যাপক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। সেই সময় ঋতুপর্ণ নিয়মিত রবীন্দ্রনাথ পড়তে যেতেন শিবাজীর কাছে। রবীন্দ্রনাথের পরিবার নিয়ে একটা ছবি করার পরিকল্পনা ছিল ওঁর, যার চিত্রনাট্য লিখছিলেন শিবাজী। এত দিন শিবাজীর বাড়ির আড়ার মধ্যমণি ছিলেন শিবাজী নিজেই, কিন্তু ঋতুপর্ণ আসার পর থেকে ওই কেন্দ্র হয়ে উঠলেন আজ্ডাটার।

গত পয়লা বৈশাখের দিন আমি শিবাজীর বাড়ি গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল সন্দেশ পত্রিকার শতবর্ষ উপলক্ষে যে ক্যালেন্ডার বার করেছেন সংগ্রাহক পরিমল রায় আর কাজী অনির্বাণ, সেটি ওঁর আর ঋতুপর্ণর হাতে তুলে দেওয়া। এর পর আড্ডার ফাঁকে এক সময় ঋতুপর্ণ শিবাজীকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন আর পাঁচ মিনিট বাদে। আমাকেও ডেকে নিলেন সেখানে। প্রথমে আমাকে বললেন একটা চেয়ারে গা এলিয়ে বসতে। এই আচমকা ব্যাপারে খুবই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম, খুব স্বচ্ছ ভাবে তাই বসতে পারিনি গা এলিয়ে। ঋতুপর্ণ তখন আমার কাছে এসে আমার ঘাড়টায় হাত দিয়ে বললেন, তুমি একদম ঘাড়টাকে স্টিফ কোরাে না, শরীরটাকে হালকা করে এলিয়ে বােসাে। কোনও রকম টেনশন করবে না। এর পর উনি আমাকে বললেন ঘাড়টাকে ডানপাশে এলিয়ে নিচের দিকে তাকাতে। তার পর চোখের ইশারায় শিবাজীর মতটা জেনে নিয়ে বললেন, তােমাকে আমার ‘সত্যান্বেষী’ ছবিতে একটা ছােট চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। এটা শুনে আমি যেমন আশ্চর্য হয়েছিলাম তেমন খুশিও। স্বভাবতই ওঁকে ধন্যবাদ জানাতে উনি বললেন, তুমি যে অভিনয় করতে রাজী হয়েছ তার জন্য আমি তােমায় ধন্যবাদ দিচ্ছি। এর পর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন গোঁফ রাখতে আমার কোনও অসুবিধা আছে কি না। আমি রাজি হওয়াতে চুলটাও কাটতে নিষেধ করে শুটিং এর জনা দু’টো তারিখ আমাকে জানিয়ে দিলেন।

২৮ তারিখ সকাল বেলায় মােবাইলে মেসেজ পেলাম, আগামী দু’দিন যেন দাড়ি না কামাই। এ দিকে ২৯ তারিখ ভাগ্নের বিয়ে, বরযাত্রী যেতে হবে। কি করি, শুটিং-এর খাতিরে দাড়ি কামালাম না দু’দিন। ৩০ তারিখ ভােরে, আমি তখন লেকে প্রাতভ্রমণ করছি, ওঁর ফোন পেলাম। জিজ্ঞাসা করলেন, অল্প অল্প সাদা দাড়ি বেরিয়েছে কি না আর আমি বড় ঘেরের জামা পরি কি না। সাদা দাড়ি অল্প অল্প বেরিয়েছে জানালাম। এও জানালাম যে বড়াে ঘেরের পাজামা না আমি পরি, না আমার আছে। বললেন, “ঠিক আছে, চিন্তা করো না, আমি প্রোডাকশন ঘেরের জামার ব্যবস্থা করতে। বলে দিচ্ছি, তোমার মাপের একটা বড়াে

ওঁর ‘সত্যান্বেষী’ ছবিতে আমি যে চরিত্রে অভিনয় করেছি, সেটা এক মহারাজার চরিত্র। আমি মাঝারি উচ্চতার সাধারণ দর্শন মানুষ। আমাকে কেন যে ঋতুপর্ণ এই চরিত্রটার জন্য বাঁচল, তা বুঝে উঠতে পারিনি। আবার সরাসরি ঋতুপর্ণকে প্রশ্নটা করেই উঠতে পারিনি। শিবাজীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছিলাম যে ঋতুপর্ণ আমার চেহারায় কোথাও একটা আভিজাত্যের ছাপ খুঁজে পেয়েছিল। আর আমার স্বাভাবিক সাদা চুলটাও ওর এই চরিত্রের জন্য উপযুক্ত মনে হয়েছিল।

আমার প্রথম দৃশ্যটি টেক হয় দু’বার, কারণ আমি অতি উৎসাহে সংলাপ গড়গড়িয়ে । বলতে শুরু করে দিয়েছিলাম। তখন ঋতুপর্ণ আমাকে পুরো দৃশ্যটা নিজে অভিনয় করে দেখিয়েও দিলেন। উনি এত চমৎকার অভিনয় করে দেখিয়েছিলেন যে আমার বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি। যাই হোক, এই দৃশ্যের সময় ঋতুপর্ণ নিজের হাতে আমার মেক-আপ করে দেন। তাতে আমি বাড়তি প্রেরণা পাই।

আমি আগেও লিখেছি যে ঋতুপর্ণ নরম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। চলনে বলনে। একটা শীলিত কোমল ভাব ছিল, কিন্তু প্রয়ােজনে উচু গলায় কথা বলতে বা বকাবকি করতে একেবারে কুষ্ঠিত হতেন না। লক্ষ্য করে দেখেছি, যে সেটের প্রত্যেকে ওকে যেমন সমীহ করে চলত তেমন ভালওবাসত। সেটে ওর সহকারীরা ওকে ‘দাদা’ বলেই সম্বােধন করত। কী কারণে এক দিন কোনও একজন ওকে দিদি বলে ডেকেছিল। আমার মনে হয়েছে হয়তো ঋতুপর্ণ রেগে যাবেন। বরং উল্টোটাই হল, উনি এই ডাকে খুশি হলেন। এত খুশি হলেন যে মেক-আপ রুমে গিয়ে মেক-আপ সহকারী রুনাদিকে বললেন ওকে ভালাে করে লিপস্টিক কাজল পরিয়ে দিতে। পরে নিজেই কপালে একটা লাল টিপ পরে সাজবে। তার পর কস্টিউম ডিজাইনারের কাছ থেকে একটা লাল ফেজ টুপি নিয়ে সেটা বাঁকা ভাবে মাথায় বসিয়ে আবার শুটিং করতে চলে গেলেন। ঋতুপর্ণার এই খেলোয়াড় সুলভ মনোভাব আমার বেশ ভালাে লেগেছিল। স্পষ্ট বােঝা যাচ্ছিল যে ওর মধ্যে কোন ইনহিবিশন’ নেই।

ছবির একাদশ দৃশ্য এবং আমার পঞ্চম ও শেষ দৃশ্য ছিল। সে দিনের শুটিং-এর সবচেয়ে কঠিন দৃশ্য। এখানে আমি অথাৎ রাজা অসুস্থ, প্রায় মৃত্যুশয্যায়। ঋতুপর্ণর নিজের মুখেই শুনেছি যে ছবির এই দৃশ্যটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবু জানি না কেন এই দৃশ্যটি ঋতুপর্ণ আমাকে বুঝিয়ে দেননি বা অভিনয় করে দেখিয়েও দেননি। তবে এর শুটিং শেষে ও মাইকে আমার কাজের প্রশংসা করেছিলেন, আর এটাও বলেছিলেন যে ওই কঠিন দৃশ্যটা ঠিক উতরাবে কি না তা নিয়ে ওঁর একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। সে দিনই শুটিং-এর শেষে আমার হাত থেকে চিত্রনাট্য নিয়ে তাতে লিখে দিয়েছিলেন, অনিন্দ্যকে অরুণাংশু (চরিত্রটির নাম)-র সাফল্যে ঋতুপর্ণ। ওর ছবিতে সব অভিনেতা-অভিনেত্রী যে এত সাবলীল ও স্বাভাবিক অভিনয় করেন তার অন্যতম কারণ ওঁর চিত্রনাট্য। এত সহজ ভাষায় নির্দেশ দিয়ে লেখা যে চিত্রনাট্যটি পড়লেই চরিত্রগুলি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।

৩০ শে মে সকালে কাজী অনির্বাণ কাছে ঋতুপর্ণর চলে যাওয়ার খবর পাই। প্রথমে আর পাঁচজনের মতো আমিও বিশ্বাস করতে পারিনি। দু’দিন আগেই আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। অসুস্থ। ছিলাম তাই বেশি কথা হয়নি। ওর শোবার ঘরের কারুকার্যময় চার-ছাত্রীর খাটের এর চিরনিদ্রার সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল। আমিও তো আমার শেষ দৃশ্যে এই রকম খাটে ওই রকমই কাঁথা গায়ে মৃত্যুশয্যায় রাজার অভিনয় করে এলাম কয়েক দিন আগেই। তা হলে কি ঋতুপর্ণ বুঝতে পেরেছিলেন যে ওই দৃশ্যটা ও একবারই করবে?

একেবারে নিজের জন্য, কাউকে দেখাতে নয়, কাউকে শেখাবার জন্য নয়। এক-দু’মিনিটের বেশি ওর সামনে থাকতে পারিনি, শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে এসেছিলাম। চিত্রলেখার ওপারে উনি যেন শান্তিতে থাকেন।

Leave a Comment