January 1, 2023

মানভূমের জমিদার ও আদিবাসীদের ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গণসংগ্রাম ১৭৯৫-১৮৩৩

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

       

প্রণব কুমার মাহাত

সিধো-কানহো-বীরশা বিশ্ববিদ্যালয়,

পুরুলিয়া                                                              

E-mail-pranab.prl1991@gmail.com

Mobile:9679147428

ভূমিকা :  অষ্টাদশ শতাব্দীতে মোগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগে ভারতে বেশ কিছু আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে। এ প্রসঙ্গে বাংলা, অযোধ্যা ও হায়দ্রাবাদ ছিল উল্লেখযোগ্য। মোগল সম্রাটদের বার্ষিক রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে তারা নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীন ভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। একইরকম ভাবে বাংলার নবাবদের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় বেশকিছু স্বাধীন জমিদার শ্রেণির উত্থান ঘটেছিল। এই জমিদার গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- পাঞ্চেত, মানভূম, বরাভূম, ধলভূম, ছাতনা, রাইপুর, কুইলাপাল, ঝালদা, মাঠা। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম পর্বে এই জমিদারেরা জঙ্গল জমিদার নামে পরিচিতি লাভ করে ছিল। মোগল শাসনকালে বারো ভুঁইয়াদের মতোই নবাব আলীবর্দী খানের পরবর্তী সময়ে মানভূম অঞ্চলের জমিদারেরা স্বাধীনভাবে নিজ নিজ জমিদারিতে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তাই মানভূমের জমিদারি গুলিতে পৃথক ও স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে পাঞ্চেত জমিদারিতে দিগওয়ারী ব্যবস্থা ও বরাভূমের সর্দার ঘাটোওয়ালী এবং তরফ সরদারী  ব্যবস্থার কথা উল্লেখ যেতে পারে।[1]

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব মীরকাশিমের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি  বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের জমিদারি থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব লাভ করেন। এতে বর্ধমানের জমিদার তিলক চাঁদ ও কর্ণ গড়ের রাণী শিরোমণি ব্রিটিশ কতৃত্বের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপত্তি জানায় নি। কিন্তু এই সময়কালে মেদিনীপুর চাকলার অন্তর্ভুক্ত মানভূম, ধলভূম, বরাভূম, পাঞ্চেত সহ বেশ কিছু অঞ্চলের জমিদারেরা যেহেতু নবাব আলীবর্দী খানের সময় থেকে নিয়মিত কোন ভূমিরাজস্ব প্রদান করতেন না, তাই তারা তাদের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আরোপিত রাজস্বের দাবী মানতে অস্বীকার করেন। তাই মানভূম অঞ্চলের জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জন্য ১৭৬৭খ্রী: থেকে অনবরত সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। এই সামরিক অভিযান গুলি ছিল মূলত পাঞ্চেত, মানভূম, বরাভূম, ধলভূম, কুইলাপাল, ছাতনা, রাইপুর, সুপুর ও অম্বিকা নগরের বিরুদ্ধে। [2]আর এই কারণেই হয়তো ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মানভূম অঞ্চলের জমিদারদের এক শত্রুতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, ঠিক যেমটি হয়েছিল ভারতের মুসলিমদের সাথে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এতটাই তিক্ত হয়ে উঠেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে মানভূমের জমিদার ও তাদের আদিবাসী প্রজারা যুদ্ধে পেরে উঠতে না পারায় ১৭৯০খ্রী: মধ্যেই সমগ্র মানভূম অঞ্চলের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই অঞ্চলের জমিদার ও আদিবাসী প্রজারা বহিরাগত ব্রিটিশদের শাসন, আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারে নি। তাদের এই চির শত্রুতার সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে অনবরত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ গুলির মধ্যে।

১৭৯৫-১৮০৫খ্রী: পর্যন্ত মানভূমের জমিদার ও আদিবাসীদের সশস্ত্র ব্রিটিশ বিরোধী গণসংগ্রাম : ১৭৯৫-১৮০৫ খ্রি: মধ্যবর্তী সময়ে মানভূম জেলার ( অধুনা মানভূম) জমিদারি গুলিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন ও  অমানবিক শর্ত গুলির বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। মানভূমের প্রায় সকল জমিদার,আদিবাসী কৃষক ও সাধারণ মানুষ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের চড়া রাজস্ব ও সূর্যাস্ত আইন প্রত্যাহারের দাবিতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সূর্যাস্ত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে চড়া রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পাঞ্চেত ও রাইপুর জমিদারি নিলামে ওঠায়। কলকাতার ব্যবসায়ী রামেন্দ্র সুন্দর মিত্র পুত্রের নামে নিলামে ওঠা পাঞ্চেত জমিদারি ক্রয় করেন এবং রাইপুর জমিদারি থেকে জমিদার দুর্জন সিংকে উচ্ছেদ করে কোম্পানি তার অনুগত এক ব্যক্তিকে জমিদারির দায়িত্ব প্রদান করেন। এইরকম পরিস্থিতিতে পাঞ্চেতের জমিদার গড়ুরনারায়ণ তার আদিবাসী ভূমিজ প্রজাদের নিয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নব নিযুক্ত জমিদার যাতে করে জমিদারির দখল নিতে না পারে তার জন্য বিভিন্ন ধরনের হিংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করেন ।[3]ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও তৎকালীন বাংলার মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সম্প্রদায় এই বিদ্রোহকে চুয়াড় বিদ্রোহ নামে অভিহিত করেছেন।কিন্তু তৎকালীন  অধুনা মানভূম তথা বাংলার জাতি কাঠামোর ইতিহাসে চুয়াড় জাতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। চুয়াড় শব্দের অর্থ গালি/গাল। এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় মানভূমের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোকেরা ব্রিটিশদের পাশাপাশি বাঙালী জমিদার, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে ছিল, তা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্রিটিশ অনুগ্রহপুষ্ট বাঙালী জাতি ভালোভাবে নিতে পারেন নি। তাই তারা সভ্য সংস্কৃতির বাইরে থাকা মানভূমের আদিবাসীদের প্রতি যেন একটা বিদ্রুপাত্মক বিশেষণ ব্যবহার করে পরিচয় দিয়েছেন ব্রিটিশ জাতির কাছে।[4]

পাঞ্চেতের মতো রাইপুরের জমিদার দুর্জন সিং, তাঁর আদিবাসী বিদ্রোহীদের (সভ্য সমাজের কাছে যারা চুয়াড়) সংগঠিত করে নব নিযুক্ত জমিদার , তহশিলদার ও নব নিযুক্ত জমিদারের সমর্থক প্রজাদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করেন। তিনি প্রথম দিকে ৪০০ জন এবং পরবর্তীসময়ে ১৫০০ বিদ্রোহী আদিবাসীদের সংগঠিত করে রাইপুর পরগণার ৩০ টি গ্রামে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। [5]এর পাশাপাশি তিনি ও তাঁর আদিবাসী বাহিনী সরকারি কাছারি ও অফিস একের পর এক লুন্ঠন ও ভষ্মীভূত করে। এইভাবে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের পরাক্রমতার জন্য সেখানে নব নিযুক্ত জমিদার প্রবেশ করতে সাহস পায় নি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাঞ্চেত ও রাইপুর থেকে ব্রিটিশ বিরোধিতার আগুন ছড়িয়ে পড়ে বরাভূম, মানভূম, সুপুর, আম্বিকানগর প্রভৃতি জমিদারিতে। বিদ্রোহের আগুন এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, তার আঁচ পড়েছিল কর্ণ গড়ের রাণী শিরোমণির জমিদারি তথা মেদিনীপুর চাকলাতে। ১৭৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দে মানভূমের সকল জমিদার, তাদের আদিবাসী কৃষকদের সরকারকে রাজস্ব প্রদান করতে বন্ধ করেন।[6] মানভূমের জমিদার , কৃষক ও সাধারণ মানুষেরা অধিকাংশই আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল বলেই হয়তো জমিদারদের ডাকে কৃষক ও সাধারণ মানুষ সক্রিয় ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। মানভূমে যেন এক ব্যতিক্রমী চিত্র লক্ষ্য করা যায়, জমিদার ও আদিবাসী কৃষকদের সংঘবদ্ধভাবে ব্রিটিশ বিরোধিতার ক্ষেত্রে। জমিদার ও কৃষক সম্প্রদায় পরস্পর স্বার্থ বিরোধী গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তারা এক সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবে বিদ্রোহের পথে পা বাড়িয়েছিল। এই সময় পর্বে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহের আগুন কতটা ভয়াবহ রূপ লাভ করেছিল, তার সাক্ষ্য পাওয়া যায় তৎকালীন সময়ে পাঞ্চেতে অবস্থানরত কোম্পানির দায়িত্ব প্রাপ্ত সামরিক অফিসার ওয়ালস -এর একটি মন্তব্যে। বিদ্রোহ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যটি হল- “The whole district is on the brink of ruin”.[7]

বিদ্রোহীদের হাতে রাইপুরের নায়েব কিনু বক্সী সহ অনেক তহশিলদার নিহত হন এবং বাহাদুর পুরের অত্যাচারী ইজারাদার কৃষ্ণ ভুঁইয়া নিহত হন। আদিবাসী বিদ্রোহীরা অসংখ্য গ্রাম অফিস, কাছারি বাড়ি লুন্ঠন করে। এমনকি তারা মেদিনীপুর জমিদারিতেও উপদ্রব চালিয়ে এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে দুর্জন সিং এর দুই সেনাপতি লাল সিং ও মোহন সিং এর নেতৃত্বে শত শত বিদ্রোহী মেদিনীপুর চাকলাতে লুটপাট ও গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে, সেখান কার জন জীবনেও বিপর্যয় ডেকে আনে।[8] তৎকালীন মেদিনীপুরের কালেক্টর তাঁর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠিতে বিদ্রোহের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে-“আমি জেলার অবস্থা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাই না। মেদিনীপুর পরগণার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, বিদ্রোহীরা সর্বত্রই অবাধে লুন্ঠন ও জনজীবনে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে, যা এখানে বসে বসে আমার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। সমগ্র মেদিনীপুর পরগণা বাইরের যোগাযোগ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শত শত লোক নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মেদিনীপুর শহরে এসে ভীড় জমাছে  এবং শহরের লোকেরা শহর ছেড়ে পলায়ন করছে। এর কারণ হিসেবে শোনা যাচ্ছে যে বিদ্রোহীরা শিঘ্রই শহর আক্রমণ করে তা ধ্বংস করে ফেলবে।…… আমার অবস্থা এত ই শোচনীয় যে চুয়াড় দের এই অসহনীয় অত্যাচার আমাকে নীরব দর্শকের মতো চুপ করে দেখে যেতে হচ্ছে”।[9] মেদিনীপুর জেলা কালেক্টরের এই চিঠি থেকে স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় মেদিনীপুর পরগণাতেও বিদ্রোহের প্রভাব পড়েছিল লক্ষণীয়। এখানেও ব্রিটিশ প্রশাসন ব্যবস্থাকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল  বিদ্রোহীরা।

মানভূম অঞ্চলে জমিদার ও আদিবাসী বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এই বিষয়ে প্রাইসের একটি মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন-“কেবলমাত্র দু-তিনটি ঘটনা ছাড়া এই বিদ্রোহ দমনে কোন ইংরেজ আধিকারিক চুয়াড় প্রভাবিত অঞ্চলগুলি পরিদর্শনের সাহস দেখাতে পারেননি “। [10]মানভূমের আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কাছে ব্রিটিশ শক্তির দম্ভ ও আস্ফালন যেন ফিকে হয়ে গিয়েছিল। আর এই কারণেই হয়তো ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মানভূমের জমিদারদের সঙ্গে আপোষ করে এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কঠোর সূর্যাস্ত আইন বাতিল করেন। আদিবাসী জমিদারদের প্রায় সমস্ত দাবি মেনে নেন। ১৮০৫খ্রী:  ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বীরভূম, বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত ২৫ টি পরগনা নিয়ে পৃথক জঙ্গলমহল জেলা গঠন করে।[11]

১৮৩২-৩৩খ্রী:মানভূমের জমিদার ও আদিবাসীদের ব্রিটিশ বিরোধিতা :১৮০৫ খ্রীষ্টাব্দে পৃথক জঙ্গলমহল জেলা গঠিত হলে, সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বরাভূম জমিদারদের শক্তি দুর্বল করার জন্য , উত্তরাধিকারী দ্বন্দ্বে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন। এখানকার আদিবাসীদের রীতি অনুসারে জমিদারের প্রথম স্ত্রীর জ্যৈষ্ঠ পুত্র উত্তরাধিকারী মনোনীত হয়। কিন্তু তাদের এই উত্তরাধিকারী নিয়ম অমান্য করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, নিজেদের অনুগত ব্যক্তিকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। তাই দেখা যায় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ মানভূমের জমিদার বিবেক নারায়ণ সিংকে (১৭৭০খ্রী:) গদিচ্যুত করে, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর পুত্র রঘুনাথ নারায়ণকে জমিদারি প্রদান করেন। এক্ষেত্রে বিবেক নারায়ণের প্রথম স্ত্রীর পুত্র লছমন  সিং জমিদারির নাহ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। ১৭৯৮ খ্রী: রঘুনাথ নারায়ণের মৃত্যুর পর আবার উত্তরাধিকারী সংকট সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রেও,কোম্পানি কর্তৃপক্ষ রঘুনাথ সিংহের দ্বিতীয় স্ত্রীর পুত্র গঙ্গা গোবিন্দ সিংকে জমিদার হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রীর পুত্র মাধব সিংকে বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু স্থানীয় জমিদার ও সর্দারগণ রঘুনাথের প্রথম স্ত্রীর জ্যৈষ্ঠ পুত্র মাধব সিংকে বৈধ জমিদার হিসেবে সমর্থন করেন।[12] এরকম পটভূমিতে গঙ্গা গোবিন্দ, মাধব সিং এর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন যে মাধব সিংকে আদিবাসী চুয়াড়রা নেতা হিসেবে মেনে নিয়ে বরাভূম পরগণায় বিভিন্ন গ্রামে লুন্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে। এতে ভয় পেয়ে মাধব সিং গঙ্গা গোবিন্দের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে নেন এবং গঙ্গা গোবিন্দ তাঁকে দেওয়ান নিযুক্ত করেন। দেওয়ান নিযুক্ত হয়েই মাধব সিং বাতিল করেন গঙ্গা নারায়ণের উত্তরাধিকারী হিসেবে পাওয়া ‘পঞ্চ সর্দারী’ এবং প্রজাদের ওপর ‘ঘরতটী’ নামক এক ধরনের গৃহকর  চালু করেন।[13] এই ভাবে মাধব সিং বরাভূম পরগণায় আর্থিক শোষণ শুরু করলে আবার মানভূম অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বরাভূম পরগণার চিরাচরিত উত্তরাধিকারী নির্বাচন প্রথার ওপর কুঠারাঘাত করে ,লছমন সিং ও তার পুত্র গঙ্গা নারায়ণকে বঞ্চিত করেছিল, এতদিনে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের সময় এসে পড়ে। তাই ১৮৩২ খ্রী: বৈশাখ মাসে দেওয়ান মাধব সিং গোলাঘর পরিদর্শনে বেরোলে পঞ্চ সর্দারী ও সতেরখানির দুই সর্দার সহ বিরাট বাহিনী নিয়ে গঙ্গা নারায়ণ তাঁকে আক্রমণ করেন। এরপর তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায় বামনি পাহাড়ে এবং সেখানে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে গঙ্গা নারায়ণের নেতৃত্বে আরো একবার আদিবাসীরা সংঘবদ্ধভাবে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন।[14]

খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গুলিতে। গঙ্গা নারায়ণের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা বরা বাজারের মুনসেফের কাছারি, থানা, রাজবাড়ি, দারোগার কার্যালয় লুন্ঠিত হয়। এক কথায় বলা যায় সমগ্র বরাভূম পরগণায় গঙ্গা নারায়ণের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বরাভূম পরগণার বাইরে আঁকরো,অম্বিকা নগর, রাইপুর, শ্যামপুর, ফুলকুসমা, শিলদা,কুইলাপাল প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। গঙ্গা নারায়ণের দুই সর্দার লাল সিং ও পঞ্চানন সিং এর সংঘবদ্ধ আক্রমণে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী নাজেহাল হয়ে পড়েছিল। গঙ্গা নারায়ণের নেতৃত্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় সমস্ত স্তরের মানুষ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল এবং ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল।[15] এই বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় ইংরেজ কর্মচারী ডেন্ট- এর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখা একটি চিঠি থেকে। তিনি কলকাতার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান যে-“প্রায় প্রতিটি ভূমিজ, ঘাটোয়াল এবং রায়ত নির্বিশেষে গঙ্গা নারায়ণের দলে যোগদান করেছে। গঙ্গা নারায়ণ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি দেশের সমস্ত পুলিশ থানা গুলি সূদুর বেনারস রোড পর্যন্ত ধ্বংস করে ফেলবেন”।[16]

ডেন্ট- এর চিঠি থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে সমাজের সকল স্তরের মানুষ গঙ্গা নারায়ণের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগদান করেছিল। প্রথম দিকে গেরিলা যুদ্ধে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু সফলতা অর্জন করলেও, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক অস্ত্র ও রণকৌশলের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেনি। ব্রিটিশ বাহিনী অতর্কিতে বিদ্রোহীদের প্রধান ও গোপন ঘাঁটি বাঁধডি,বারুডি এবং বাওনি আক্রমণ করলে গঙ্গা নারায়ণ সিংভূমে পালিয়ে যায়। সিংভূমে তিনি  খারসওয়ার ঠাকুরদের বিরুদ্ধে অভিযানে মারা যান। গঙ্গা নারায়ণের মৃত্যুর সংবাদ বিদ্রোহীদের হতাশ ও নিরুৎসাহিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহের অন্যতম নেতা ডোম পাড়ার রঘুনাথ সিং এর আত্মসমর্পণ এবং সর্দার লাল সিং ও তাঁর পুত্র সহ অনেক বিদ্রোহী ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে বন্দী হলে বিদ্রোহীদের মনোবল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায়। ফলে বিদ্রোহের আগুন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে।[17]

উপসংহার:মানভূমের আদিবাসী বিদ্রোহ গুলি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও, তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও ঐক্যবদ্ধতা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে ভীতি সঞ্চার করেছিল। বিদ্রোহীদের বেশিরভাগই ছিল ভূমিজ, কোল, মুন্ডা, কুর্মি, সাঁওতাল, হো প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোক। মানভূমের বিদ্রোহ গুলি জমিদারদের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও,আদিবাসী সমাজের সকল স্তরের মানুষ যোগদান করে গণবিদ্রোহের রূপ দিয়েছিল। তাই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মানভূমের জমিদারদের নেতৃত্বে পরিচালিত বিদ্রোহ গুলিকে চুয়াড় বিদ্রোহ না বলে, “জমিদার ও আদিবাসীদের ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গণসংগ্রাম” বলাটাই হয়তো যুক্তিযুক্ত হবে।

                                                                   তথ্যসূত্র

1.Coupland. H, Bengal District Gazetteer, Manbhum, Vol- xxviii, Calcutta, 1911,Page-55

2. মুখোপাধ্যায়, সুভাষচন্দ্র ও চক্রবর্তী মুখার্জী, সুদীপ্তা, মানভূমে চুয়াড় বিদ্রোহ ও  বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের যুগ, এ. কে. ডিস্ট্রিবিউটর্স, পুরুলিয়া, ২০১০,পৃ-১২৩-১২৪

3. Sen.N.N, West Bengal District Gazetteer, Puruliya, Calcutta, 1985,Page-96-98

4.রায়, সুপ্রকাশ, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, কলকাতা, ২০১২,পৃ-১৩৯-৪০

5.রায়,সুপ্রকাশ,২০১২,প্রগুপ্ত,পৃ-১৪৬-৪৭

6.মুখোপাধ্যায়, সুভাষচন্দ্র ও চক্রবর্তী মুখার্জী, ২০১০,প্রগুক্ত,পৃ-১৪৩

7.রায়, সুপ্রকাশ,২০১২,প্রগুক্ত,পৃ-১২০

8.Price, J,C,The Chuar Rebellion of 1799,Midnapore, Page-235

9. Ibid, Page-267

10.Malley,O,Bengal District Gazetteer,Bankura,Page-38-39

11.Coupland. H, Bengal District Gazetteer, Manbhum, Vol- xxviii, Calcutta, 1911,Page-62-63

12.De, Dipa,The Bhumij in Bengal in the Nineteenth and Twenteenth centuries a socio-cultural transformation, Ph.d theses, University of Burdwan, 2008,Page-45-46

13.ভট্টাচার্য, তরুণ দেব, পুরুলিয়া, ফার্মা. কে. এল.এম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮৬,পৃ-১৫৭

14.ভট্টাচার্য, তরুণ দেব,১৯৮৬, প্রথমগুক্ত, পৃ-১৫৮

15.টুডু, বুদ্ধেশ্বর, খেরওয়াড় ও চুয়াড় বিদ্রোহ, চায়না পাবলিকেশন, কলকাতা, ২০০৬,পৃ-৪০-৪১

16.মুখোপাধ্যায়, সুভাষচন্দ্র ও চক্রবর্তী মুখার্জী, ২০১০,প্রগুক্ত,    পৃ-১৬১

17.মুখোপাধ্যায়, সুভাষচন্দ্র ও চক্রবর্তী মুখার্জী, ২০১০,প্রগুক্ত,পৃ-১৭৪