মানবিক বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সঙ্গীতের গুরুত্ব

ফাতিমা আক্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ  

শিক্ষায় সঙ্গীতের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্মের সময় থেকে একটু একটু করে বেড়ে ওঠার প্রতিটি স্তরে শিশুদের মধ্যে ছন্দ বোধ জেগে উঠে। এই ছন্দকে নিয়েই তার ওঠা, বসা, হেঁটে চলা। ছন্দে মা-বাবা, দাদা, পাপা, ইত্যাদি শব্দগুলো সে শোনে ও বলতে থাকে। হাঁটি হাঁটি পাপা করে একপা দুপা করে যখন একটু একটু করে এগিয়ে যায় তখন তার কাছে এই ছন্দের গুরুত্বটা ধরা পড়ে। আমরা বড়রা এটা বুঝি বলেই নিজেদের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতেই শিশুর সঙ্গে যখন কোন কথা বলি বা তাকে আনন্দ দেবার চেষ্টা করি, তখন ছন্দ এবং সুরই আমাদের কাছে প্রধান মাধ্যম হয়। যখন কোন ভাষা থাকেনা, তখন অর্থহীন কিছু শব্দ বা কিছু অর্থবোধক শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এই শিশুর সামনে। সেও নানারকম শব্দে, ছন্দে, সুরে নিজের কন্ঠস্বরকে আন্দোলিত করতে করতে বড়দের কাছে ছুটে আসে। সে বড় মজার ও আনন্দের ব্যাপার। আমরা যে যেমনই হই না কেন আমাদের কাছে শৈশবের প্রতিটি মুহূর্ত ভালো লাগে। নিজের শৈশবের কথা মনে না থাকলেও যে কোন শিশুর প্রতিটি অভিব্যক্তিকে আমরা অন্তর দিয়ে অনুভব করে থাকি।

পৃথিবীর যে কোন দেশে যেকোনো জায়গায় শিশুদের চলাফেরা তাদের বড় হয়ে ওঠার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এমনকি ছোটদের কে আদর করার ক্ষেত্রে বা তাদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও একই রকম ভাবে হৃদয়ের আবেগ প্রকাশের গুরুত্ব আমরা লক্ষ্য করে থাকি। দেশের বা  বিদেশের অন্য যে কোন ভাষাতেই হোক না কেন, ছোটদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিশেষ করে ভাষা জ্ঞানহীন শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় যে সব শব্দ আমরা ব্যবহার করি, তার মধ্যে একটা চিরন্তন শিশুশুলভ আন্তর্জাতিকতা ধরা পড়ে।

এ তো গেল শিশু বেলার কথা। একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশু যখন আলাদাভাবে মানুষকে চিনতে বুঝতে পারে, যখন সে ভাষার ব্যবহার করতে শেখে, যখন তার ভালোলাগা, তার প্রয়োজন এগুলোকে প্রকাশ করার জন্য কিছু শব্দকে সে বুঝতে বা বলতে পেরেছে সেই সময় থেকেই তারমধ্যে সুর ও ছন্দে র পাশাপাশি কিছু গদ্যের রূপকেও তারা বুঝতে শেখে, আয়ত্ব করতে পারে। সাধারন ভাবেই কথা বলতে পারে। কিন্তু অর্থ যুক্ত বা নিরর্থক যাই হোকনা কেন যখন সে পড়াশোনা  শুরু করে, তখন গদ্যে রচিত সাহিত্য তার কাছে প্রাঞ্জল হয়না। বরঞ্চ সুরে ও ছন্দে রচিত বিভিন্ন ছড়া, কবিতা বা সংখ্যা শিশুদের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আমরা দেখেছি অনেক নিরর্থক ছন্দযুক্ত ছড়াও শিশুরা সহজেই মনে রাখতে পারে। তুলনামূলকভাবে অনেক অর্থবোধক গদ্যে রচিত সাহিত্যওসহজেই ভুলে যায়। অধ্যাপক দেবাশিস মণ্ডল লিখেছেন, ‘শিশু যখন পায়ে পায়ে চলতে শেখে তখনই তার ছন্দবোধের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ে। ছন্দের যে সুখ বড়রাও তা অনুভব করে ছোট্ট শিশুর কাছ থেকে। তার চলা, বলা অনুকরণ করে। লক্ষনীয় ছন্দে, সুরে, ঘুর্ণনে, নাটকীয়তায় শিশুরও দুর্বার আকর্ষণ। অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে নতুনকে চেনা ও জানার আকর্ষণও ক্রমে বাড়তে থাকে। শিক্ষায় এই দুই আকর্ষণকে উজ্জীবিত করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমটি হল সহজাত আবেগ ও অনুভুতিগুলির সুসংহত বিকাশের মধ্যদিয়ে মানবিকতাবোধের বিকাশ ঘটানো ও দ্বিতীয়টি হল জ্ঞান বিজ্ঞানের ও বিভিন্ন সামাজিক বোধের সঙ্গে পরিচিতির মধ্যদিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য জ্ঞানের উন্মেষ ঘটানো। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রথমটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে দ্বিতীয়টির থেকে প্রয়োজন মতো চর্চা ও অনুশীলন করা হচ্ছে। ………… ঘাটতি কোথায় তা চিহ্নিত না করে পছন্দকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ দুর্ভাগ্যের জন্য আমরা কাকে দায়ী করতে পারি? এই শিক্ষা ধারায় জ্ঞানের উন্মেষ হয় ঠিকই তবে তা অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও অসঙ্গতিপূর্ণভাবে। এই শিক্ষার মধ্যেই থাকে অমানবিকতাবোধের যথেষ্ট উপাদান। তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে সমাজের চোখের সামনে। শিক্ষিত মানুষদের নির্মম কৃতকর্ম আমাদের নির্যাতিত করে। আমরা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের কাছে সাহস করে সমাজের, দশ ও দেশের প্রয়োজনের কথাটুকুও বলার সাহস পাইনা। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষার মধ্যেই রয়েছে বিচ্ছিন্নতার বীজ’।[১]

পৃথিবীতে একথা প্রমাণিত সত্য যে ছন্দ মানুষের স্মৃতিশক্তিকে সুস্থ ও সবল রাখতে সাহায্য করে। ছন্দের সাহায্যে স্মৃতিতে কোন বিষয় বা ঘটনাকে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করে রাখা খুব সহজ হয়। আবার প্রয়োজনমতো ছন্দে সুরে চর্চিত সঞ্চিত তথ্য বা জ্ঞানকে খুঁজে বের করে প্রয়োজনমতো তাকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও ছন্দের বা সুরের গুরুত্ব অনেক বেশি বলে প্রমাণিত হয়েছে। দেখা গেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিক্ষার উচ্চ পর্যায়ে গিয়েও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলিকে যখন ছন্দে রচনা করা হয় তখন তা মনে রাখার ক্ষেত্রে, স্মৃতিতে ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনেক সহজ হয়, যেগুলি গদ্যে রচিত তার তুলনায়। Annie Murphy Paul তাঁর একটি নিবন্ধ How Music Can Improve Memory তে এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। তিনি বলেছেন,
‘The best way to remember facts might be to set them to music. Medical students, for example, have long used rhymes and songs to help them master vast quantities of information, and we’ve just gotten fresh evidence of how effective this strategy can be. A young British doctor, Tapas Mukherjee of Glenfield Hospital in Leicester, was distressed by a survey showing that 55 percent of nurses and doctors at Glenfield were not following hospital guidelines on the management of asthma; 38 percent were not even aware that the guidelines existed’.[২]
এসব দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই গ্রহণ করা যেতে পারে যে গান এবং ছড়া কিংবা সুরকে আশ্রয় করে যেকোনো ধরনের রচনা স্মৃতির পক্ষে সহায়ক। Memory and cognition নামের একটি journal এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রাপ্তবয়স্করাও গদ্যে কথা বলার পরিবর্তে সুরে ছন্দে তাদের মনের ভাষা প্রকাশ করতে পারে, যদি এটা ধারাবাহিকভাবে অভ্যাস করা যায়। কারন ওই সমীক্ষায় দেখাগেছে, একটি বয়স্ক মানুষের দল সম্মিলিতভাবে তাদের মধ্যে সুরে ও ছন্দে কথা বলা অভ্যাস করেছে ও সফল হয়েছে। এর ফলে তাদের স্মৃতিশক্তি উন্নতি হয়েছে এবং নানা ধরনের মনের ভার লাঘব করার ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি খুব উপযোগী হয়েছে।


এসব দিক বিবেচনা করে শিক্ষা ও সঙ্গীতকে পাশাপাশি রাখা বাঞ্ছনীয় বলেই মনে করেন মনস্তাত্বিক ও শিক্ষা বিজ্ঞানীরা। অথবা বলা যায় শিক্ষার একটি অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে সঙ্গীত। এই জটিল ক্রমবর্ধমান সমস্যা জর্জরিত ব্যবস্থায় সঙ্গীত চর্চা ও শ্রবনের গুরুত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মানসিক চাপ কমাতে ও সামাজিক নিষ্ঠুরতা, অন্যায়, বীভৎসতা ইত্যাদি যথাযথভাবে নিরসনের জন্য সংঙ্গীতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূরর্ণ। পত্রদূত পত্রিকায় এক নিবন্ধে সানজিদা শাহ্নাজ লিখেছেন, ‘সকল মানুষই সুর ভালোবাসে এবং গান শুনতে পছন্দ করে। কথিত আছে, হযরত দাউদ (আ.) যখন যাবূর কিতাব সুর করে পড়তেন তখন তার সুরের যাদুর স্পর্শে পশুপাখি এমনকি সাগরের মাছে পর্যন্ত তার কাছে ছুটে আসত। সংগীত চর্চার মাধ্যমে মানুষের মন পবিত্র হয়। সংগীত সুধারস আস্বাদনের মাধ্যমে মানুষের মন হয়ে ওঠে সৃজনশীল এবং মনের হীন প্রবৃত্তিগুলো দূর হয়। সে কারণে শিশুদের শিশুকাল থেকেই সংগীত শিক্ষায় অন্তর্ভূক্ত করতে পারলে সংগীত চর্চার মাধ্যমে শিশু সৃজনশীল হয়ে উঠবে এবং মনের হীন প্রবৃত্তিগুলো দূর হওয়ার মাধ্যমে প্রাণশক্তি জাগ্রত হবে’।[৩]

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যেসব স্কুলে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সঙ্গীত রয়েছে সেখানে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে যেখানে সঙ্গীত চর্চা বা শিক্ষার ব্যবস্থা নেই সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি অনেক কম।  পরিসংখ্যানে বলা গয়েছে সঙ্গীত শিক্ষা দেওয়া হয় এমন স্কুলগুলিতে উপস্থিতির হার ৯৪ শতাংশের আশে পাশে থাকে। আর একই সময়ে যেখানে সঙ্গীত শিক্ষার ব্যবস্থা নেই সেখানে গড় উপস্থিতি ৭২-৮৫ শতাংশ। ‘Making the music argument with music education statistics is crucial in music education advocacy. Schools with music programs have an estimated 90.2% graduation rate and 93.9% attendance rate compared to schools without music education, which average 72.9% graduation and 84.9% attendance. Schools that have music programs have an attendance rate of 93.3% compared to 84.9% in schools without music programs.’ [৪]

বিভিন্ন দেশে সংঙ্গীত শিক্ষার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশেও শিশু শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাবিদরা একথা অনেকেই বলে থাকেন যে, মনের মধ্যে যত সুরের আনাগোনা বাড়বে অসুর বৃত্তিগুলো ক্রমে দূরে সরে যাবে।

তথ্যসূত্র
১। http://debasishrbu.blogspot.com/2016/08/blog-post.html
২। https://www.kqed.org/mindshift/31512/how-music-can-improve-memory
৩। https://patradoot.net/2017/07/18/166484.html

৪।https://www.childrensmusicworkshop.com/advocacy/factsandstatistics/