November 1, 2022

একেশ্বরবাদের উপাসনা ও সংগীত

LOKOGANDHAR ISSN : 2582-2705
Indigenous Art & Culture

ড.শ্রাবণী সেন

সহযোগী অধ্যাপিকা, সঙ্গীত বিভাগ,তারকেশ্বর ডিগ্রি কলেজ,তারকেশ্বর,হুগলী

e-mail- srabanisn1@gmail.com  Mobile no- 6290242709

ভারত-ইতিহাসের ধারা পথে বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির নানা ধারা এসে মিলিত হয়েছে। সেই ধারাকে সুপরিচালিত করতে বিধাতা  যুগে যুগে যোগ্য যোগ্য পথপ্রদর্শককে পাঠিয়েছেন, তাঁরাই আমাদের মহাপুরুষ। এরকম একজন  মহাপুরুষ হলেন রাজা রামমোহন রায় – যিনি ভারতবর্ষীয় সনাতন সামন্ততান্ত্রিক দর্শনের যুক্তিসিদ্ধ বিরোধিতা করে ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রবক্তারূপে প্রথম আধুনিক ভারতীয় মানুষ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তাঁর ধর্মসংস্কার, সমাজসংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় মানুষের কল্যান।

রামমোহনের প্রতিষ্ঠা ও প্রসিদ্ধি আমাদের দেশে ধর্মসংস্কার, সমাজহিত ও ব্যক্তিমানুষের উত্তরণ-প্রয়াসের সঙ্গে জড়িত। আমাদের সংস্কারবদ্ধ, অশিক্ষিত অন্ধকার দেশে তিনি নবচেতনার দিশা দেখিয়েছিলেন। তাঁর জ্ঞান-কর্ম-ভক্তিসমন্বয়বাদের আদর্শে বাংলায়  উঠেছিল ব্রাক্ষ্মধর্মান্দোলন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তির নৈতিক উন্নতি এবং সমাজের সামূহিক উন্নতি। ঈশ্বর-উপাসনার এবং ঈশ্বর-ধারণায় ছিল নতুন ভাবনা।  ইসলামি ও খ্রিষ্টীয় আদলে অমূর্ত ব্রহ্মোপাসনার কিছু পদ্ধতি-প্রকরণ, উপাসনাগৃহের প্রতিষ্ঠা এবং নবব্রতী উপাসক সম্প্রদায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন।

রামমোহন রায় যে সময়ে কলকাতয় আসেন তখন বঙ্গভূমি অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল; বঙ্গদেশে শাস্ত্রালোচনা একপ্রকার উঠে গিয়েছিল বললে অত্যুক্তি হয় না, পৌত্তলিকতার বাহ্যাড়ম্বর তার সীমা থেকে সীমান্তর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল। বৈদিকসাহিত্যের আলোচনা লুপ্ত হলেও ধর্মানুষ্ঠানে  ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ শুধুমাত্র ক্রিয়াকণ্ডের  আবশ্যক  শাস্ত্রেরই আলোচনা করতেন। শাস্ত্রের জায়গায় পৌরাণিক ও তান্ত্রিক সাহিত্য এবং কিছু বৈষ্ণব গ্রন্হের আলোচনা স্হান পেয়েছিল। দেশ যখন অজ্ঞানতায় পরিপূর্ণ, রামমোহন রায় তখন শাস্ত্রালোচনা শুরু করেন। অতি তরুণ বয়সেই পৌত্তলিকতার প্রতি তাঁর বিদ্বেষ জন্মায় এবং সেই পৌত্তলিকতার প্রতিবাদ করতে তিনি উদ্যত হন।

যে বেদশাস্ত্রের উপর হিন্দুর নিজের ধর্মের প্রামান্য প্রতিষ্ঠিত, সেই বেদই যে জগতের সনাতন সত্যকে মানবের অনুভব সাপেক্ষ করেছে, তা দেখার জন্য রাজা রামমোহন উপনিষদ্ ও বেদান্ত-সূ্ত্রের প্রচার করেছিলেন।  রাজা ঈশ, কেন, কঠ, মুণ্ডক ও মাণ্ডু্ক্য -এই পাঁচটি উপনিষদের মূল ও বাংলা অনুবাদ করেন। এই কটি উপনিষদই বিশ্বের পরমতত্ত্ব ব্রহ্মবস্তুকে সাধারণ মানবের সাধারণ অনুভবের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। উপনিষদ্ বলেছে সাধকের ইন্দ্রিয়গ্রাম, মন এবং বুদ্ধি হল ব্রহ্ম-সাধনের পথ। বলা যায় বাঙালীর মুক্তি-কামনায় এক অভিনব পথপ্রদর্শক হলেন রামমোহন রায় । আমরা আজ বাংলার হিন্দুসমাজের চিন্তা ও সাধনায় যে নতুন প্রণতা ও সমন্বয়ের চেষ্টা দেখি তার মূল নির্ঝর রাজা রামমোহনের শাস্ত্রপ্রচার।

ধর্মসংক্রান্ত আন্দোলনই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও প্রধান প্রচেষ্টা।  রামমোহন ছিলেন মূলতঃ একেশ্বরবাদী ও পৌত্তলিকতার বিরোধী। হিন্দুধর্মের গোঁড়ামিতে রামমোহন শ্রদ্ধাবান ছিলেন না এবং তার জন্য রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু যে সময়ে বাংলাদেশে বেদ-উপনিষদের চর্চা ছিল না বললেই চলে, সেই সময় রামমোহন নতুন করে বেদান্ত চর্চার সূত্রপাত করে বেদান্তের উপর বাংলা ভাষায় নিজস্ব ভাষ্য রচনা করেন।

একেশ্বরবাদী হলেও রামমোহনের মনোভাব ছিল যুক্তিবাদী দার্শনিকের। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত হিন্দুধর্মের সংস্কার – নতুন কোন ধর্মের প্রচার বা প্রবর্তন নয়।  তিনি হিন্দুর অতি প্রাচীন শাস্ত্রগুলোর আলোচনার দ্বারা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন হিন্দুধর্মে বেদান্তোপনিষৎ -কথিত নিরাকার ব্রহ্মোপাসনাই শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত হয়েছে। যদিও সকল ধর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল। সে যুগে একদিকে ছিল  সাম্প্রদায়িকসংকীর্ণ গোঁড়ামি, অন্যদিকে স্বাধীন চিন্তার নিরঙ্কুশ উচ্ছৃঙ্খলতা – এই হিসেবে রামমোহনের সমন্বয়সন্ধনী উদার মনোভাব ছিল তাঁর যুগের অগ্রগামী। রামমোহন সমকালীন হিন্দুধর্মের  বিকৃত আচার-অনুষ্ঠানকে হিন্দুদের ঐহিক উন্নতির পথে  বাধা মনে করেছেন এবং ধর্মসংস্কারের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি বিধান সম্ভব বলেই যেন ধর্মসংস্কারের কাজে অগ্রসর হয়েছেন -“I agree with you that in point of vices, the Hindus are not worse that the generality of Christians in Europe and America; but I regret to say that the present system of religions adhered to by the Hindus is not well calculated to promote their political interest. The distinction of castes, introducing innumerable divisions and sub-divisions among them has entirely deprived them of patristic feeling, and the multitude of religious rites and ceremonies and the laws of purification have totally disqualified them from undertaking any difficult enterprise.  ….It is , I think necessary that some change should take place in their religions at least for the sake of their political advantage and social comfort.

তিনি একেশ্বরবাদকে  উপনিষদ ও বেদান্তের সাহায্যেই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। যুক্তির দ্বারা সত্যের সন্ধানই ছিল তাঁর সংস্কারের আদর্শ। শুধু যুক্তির দ্বারা নয়, অন্তরঙ্গ সাধনার দ্বারাই সত্যের উপলব্ধি সম্ভব, কিন্তু যে ব্রহ্মের কথা তিনি বলেছেন তা দর্শনশাস্ত্রের ব্রহ্ম নয়, তা ভারতবর্ষের ধর্ম্মগত বিশ্বাসের ব্রহ্ম। ব্রহ্ম-সম্বন্ধীয় আলোচনার জন্য তিনি ১৮১৫ সালে আত্মীয়-সভা ও ১৮১৮ সালে ব্রহ্মসভা  প্রতিষ্ঠিত করেন। জাতি, ধর্ম বা সামজিক পদনির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষই এখানে এক নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করতে পারবে, এই ছিল তাঁর অভিপ্রায়। রামমোহন রায় এই উদার ভাব, এক ব্রহ্মের প্রকাশ্য উপাসনালয় স্হাপন করে ভারতে অক্ষয়কীর্তিস্তম্ভ রেখে গেছেন। আজ সেই ব্রাহ্মসমাজ নানা শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত হয়ে ঈশ্বরের যশোঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রামমোহন রায়ের সুমহৎ জীবনের পরিচয় দিয়েছে। এই ব্রাহ্মসমাজের সাথে রামমোহন রায়ের নাম পৃথিবীতে চিরদিন অবস্হান করবে। রামমোহন বিশ্বাস করতেন “by the temporal calamities we are taught to withdraw the heart from things which we are perishable and to fix it upon those which are eternal.”

মাস্টার ফেয়ারবের্য়ান (Fairbairn) বলেছেন, আর্যজাতির শাস্ত্রমধ্যে  যে একেশ্বরবাদ পাওয়া যায় তার সাথে সোমেটিকজাতীয় ধর্মশাস্ত্রের একেশ্বরবাদের পার্থক্য রয়েছ। আর্যজাতীর ধর্মশাস্ত্রের মূল প্রকৃতিপূজা। আদিতে এই প্রকৃতিপূজাই প্রচলিত ছিল। প্রকৃতিপূজা থেকেই আর্যজাতি একেশ্বরবাদে উথ্থিত হয়। রামমোহন রায় এই বৈদিক ও দার্শনিক ঈশ্বরকে পূজার বিষয় করেছেন। তিনি উপনিষদ ও দর্শনের ঐশ্বরিক তত্ত্বকে শুধু নিরূপণ ও উৎঘোষণ করেন নি, তিনি দর্শনশাস্ত্র থেকে ঈশ্বরকে বিমুক্ত করে দেবালয় ও মন্দিরের বেদীর উপর তাকে স্হাপন করেছেন।

ব্রহ্মসভা থেকে পরবর্তী সময়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে আদি ব্রাহ্মসমাজ গঠিত হয়েছিল। বিলেতে রামমোহনের মৃত্যুর প্রায় ছ’বছর পর দ্বারকানাথ ঠাকুরের পু্ত্র দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ যুবকেরা ১৮৩৯ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ স্হাপন করে, ১৮৪৬ সালে ব্রাক্ষ্মসমাজের তত্ত্বাবধানের ভার গ্রহণ করে। ১৮৪৩ সালে দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ বিশজন যুবক রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ‘ব্রাক্ষ্মধর্মে’ দীক্ষিত হন – সেইদিন থেকে ব্রাহ্মসমাজের ইতিাসের  দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয়। তখন থেকে ব্রাহ্মরা আর আগের মত সর্বধর্মের মানুষদের মিলনের club-এ সমবেত হবার পরিবর্তে একটা ধর্মের cult নিয়ে আবির্ভূত হলেন-তার নাম ‘ব্রাক্ষ্ম ধর্ম‘।

ব্রাহ্মধর্মের মত ব্রহ্মসংগীতধারারও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। ব্রাহ্ম ধর্মোক্ত ব্রাহ্মউপাসনাকে কেন্দ্র করে ব্রহ্মপাসনার অঙ্গ  হিসেবে ব্রহ্মসংগীতের সূচনা ও বিকাশ ঘটেছিল। অমূর্ত ব্রহ্মোপাসনার আরাধনা-সঙ্গীতকে বলা যায় ‘ব্রহ্মসংগীত’। ব্রাহ্ম ধর্মোক্ত ঈশ্বর বা ব্রহ্ম এক, অবিচ্ছেদনীয় ও নিরাকার। ব্রহ্মসংগীত নিরাকার পরমব্রহ্মের উপাসনা সঙ্গীত।  ব্রাহ্মদের উপাসনার মূল বিষয় ছিল উপাস্য ব্রহ্মের প্রতি অটল ভক্তি ও বিশ্বাস এবং সেই ভক্তি – বিশ্বাস ফুটেছে গানে। ব্রহ্মসংগীত সেই দিক থেকে বিচার করলে ব্রহ্মসাধনার নানা স্তর ও অনুভব উপলব্ধির প্রতীক। রামমোহন ও তাঁর অনুবর্তীরা তাঁদের সাধনার অঙ্গ হিসেবে উপাসনা গৃহে ব্রহ্মসংগীত প্রচলন করেন। ব্রহ্মসংগীতের মধ্যে দিয়ে অপৌত্তলিক উপাসনা সঙ্গীতের  প্রতিষ্ঠা ঘটে। 

ব্রহ্মসংগীতের সূচনা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। বিশেষ ধর্মান্দোলনের সূত্রেই এই গানগুলো রচিত হয়েছিল। এতে উপাস্যের রূপের বর্ণনা নেই, তাঁর রূপের মহিমাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাই ব্রহ্মসংগীতকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম-সম্প্রদাদায়ের সাধনসঙ্গীত বলা যায় না। ১৮২৫ সালে তিনি ‘আত্মীয় সভা’ সমাবেশে প্রথম ব্রক্ষ্মসংগীতের সূচনা করেন। সেই সময় থেকেই ব্রক্ষ্মোপাসনায় ব্রক্ষ্মসংগীতকে প্রধান্য দেওয়া হয়। রামমোহন রায়ের রচিত গানের বাণী এবং রাগরূপের সাংগীতিক বিন্যাসে পরিণতবোধ ও সৃষ্টিপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। উনিশ শতকের সূচনাকালে, যে সময় রামমোহন গান রচনা শুরু করেন তখন বাংলাগানের বাণী কবিত্বপূর্ণ ছিল না। অন্যদিকে বাংলার ধর্মসমাজে প্রচলিত ঈশ্বর-ধারনায় সাকারের বদলে নিরাকার-দ্বৈতের বদলে অদ্বৈতের ধারণাযুক্ত গান, যা তত্ত্বগত ও বিষয়গত দিক থেকে বেশ অভিনব ও জটিল ছিল। তবে উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে ব্রহ্মসংগীত – বাংলাগানের ক্ষেত্রে বড় পর্বাম্ভের সূচনা করেছিল। ব্রাহ্মরা একমেবাদ্বিতীয়মের উপাসক হলেও নির্গুণ পরমাত্মা ও সগুণ ঈশ্বরের সমন্বিত উপলব্ধির উপর জোর দিয়ে দিয়েছিলেন। রামমোহন রায় রচিত একটি গান –

ভয় করিলে যাঁরে

                                            না থাকে অন্যের ভয়

যাঁহাতে করি প্রীতি

                                            জগতের প্রিয় হয়।

      জড়মাত্র ছিলে,জ্ঞান যে দিল তোমায়-

                                    সকল ইন্দ্রিয় দিল তোমার সহায়।

  কিন্তু তুমি ভুলো তাঁরে

এতো ভালো নয়।

 গানে বিষয়গত তত্ত্বময়তা ও চিন্তার গভীতা প্রকাশের জন্য রামমোহন বেছে নিয়ছিলেন প্রধানত ভারী চালের ধ্রুপদ। এ-জাতীয় গান পূজাবেদী থেকে বিশ্বাসী ও নিষ্ঠাবান দীক্ষিত গায়কের কণ্ঠে উদ্গীত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল দীক্ষিত বিশ্বাসী হৃদয়ের গভীরে। এ গান অন্যের মনে যেমন বিশ্বাস ও ভক্তি জাগিয়েছিল তেমনি পরবর্তী প্রজণ্মকে উৎসাহ দিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে রামমোহনের একটি গান –

ভাব সেই একে

জলে স্হলে শূণ্যে যে সমানভাবে থাকে।

যে রচিল এ সংসার

আদি অন্ত নাহি যার

সে জানে সকল,কেহ নাহি জানে তাকে।

রামমোহনের এই গানে যতটা তত্ত্ব আছে ততটা কবিত্ব নেই।  কিন্তু গানের মধ্যে ভাবনার প্রাঞ্জল অভিব্যক্তি এবং উপাস্য সম্পর্কে চিন্তার স্পষ্টতা এই গানে অন্য সৌন্দর্য এনেছে। গানগুলো বেশীরভাগ ধ্রুপদাঙ্গ। আড়া, তেওট, যৎ, ত্রিতাল, ঢিমা একতাল, ধামার তালে এবং সিন্ধু,ভৈরবী, বড়োয়া, পিলু প্রভতি রাগে গানগুলো বাঁধা। ‘ব্রক্ষ্মসংগীত’ নামটি রামমোহনেরই দেওয়া। এ জাতীয় গানের রচনা থেকে গাইবার রীতিনীতি সবই রামমোহনের পরিকল্পিত। করেন। ‘ কে ভুলালে হায়  বা পাঠান্তরে  মন  তোরে কে ভুলালো ‘ সিন্ধুভৈরবী, ঠুংরি – রামমোহন রায় রচিত প্রথম ব্রহ্মসংগীত। ১৮১৬ সালে  আত্মীয়সভার কোন একটি অধিবেশনে গানটি প্রথম গাওয়া হয়েছিল।                       ব্রহ্মোপাসনার জন্য পরিকল্পিত  হলেও  তাঁর রচিত গান কোনও বিশেষ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তাঁর গান ছিল তাঁর ধর্মীয় মতবাদের মত উদার ও সার্বজনীন। বিশ্বব্যাপী যে-অখণ্ড বিশালকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, আপন ভক্ত চিত্তে তাকেই তিনি রূপ দিয়েছিলেন গানে। তাঁর রচিত ব্রহ্মসংগীত আধুনিক বাঙালীর বিশেষ ভক্তিচেতনার পথিকৃৎ। তাঁর সমসময়ে ব্রক্ষ্মসংগীত রচনায় তাঁর সহযোগী কৃষ্ণমোহন মজুমদার, নীলমণি ঘোষ, নীলরতন হালদার,গৌরমোহন সরকার, কালীনাথ রায়, নিমাইচরণ মিত্র, ভৈরবচন্দ্র দত্ত প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

রামমোহনের সাংগীতিক প্রিয়তা ঠাকুরবাড়ীর সাংগীতিক পরম্পরার মধ্যে দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিল। ব্রাহ্মসামাজের আধ্যাত্মিক ও সাংগীতিক উভয় ঐতিহ্যই দেবেন্দ্রনাথের চেষ্টায় সংহতি লাভ করে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর রাজা রামমোহন রায়ের প্রভাব ছিল অসামান্য। রামমোহনের ধর্ম বা সমাজসংক্রান্ত ভাবনাই শুধু নয়, তাঁর সংগীত  ভাবনাও  দেবেন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বাধীন আদি ব্রাহ্মসামাজের উপাসনা সঙ্গীত ছিল ধ্রুপদানুসারী।  ব্রহ্মসংগীতে ধ্রপদধারার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন কষ্ণপ্রসাদ চক্রবর্তী ও বিষ্ণু চক্রবর্তী। বিষ্ণু চক্রবর্তী দীর্ঘকাল সে সমাজে অধিষ্ঠিত থেকে উপাসনা সঙ্গীতে সুরযোজনা করে ও গেয়ে ধ্রপদের ঐতিহ্য গ্রথিত করেন। যদিও আদি ব্রাহ্মসামাজের উপাসনাগীতির সাংগীতিক ভিত্তি ছিল ক্ল্যাসিক্যাল, প্রধানত ধ্রুপদ। বলা যায় আদি ব্রাহ্মসামাজের ধারায় ব্রহ্মসংগীতের সর্ব্বোচ্চ রূপটি প্রকাশ লাভ করে।  দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আদি ব্রাহ্মসামাজের ধ্রুপদাঙ্গ ব্রহ্মসংগীতের ধারায় আবির্ভূত হন। যদিও ব্রহ্মসংগীতের সর্ব্বোচ্চ রূপটি রবীন্দ্রনাথের গানেই প্রকাশ লাভ করেছে।  ফলে ব্রহ্মসংগীত বলতে  প্রধানত আদি ব্রাহ্মসামাজের ধারায়  রচিত গানকেই বোঝান হয়।

রাজা রামমোহন রায় ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর  ব্রহ্মসংগীত ধারার সূচনা পর্বের ভিত্তি স্হাপন করেছিলেন। যদিও তাঁদের গান কাব্যগুণে ছিল স্হূল এবং  জীবন ও জগতের পরিণাম সম্পর্কে স্হূল ভীতিপ্রচার ও তার মাধ্যমে ঈশ্বরে শরণাগতি প্রার্থানার আহ্বান জানানো ছিল এই গানের  মূল বিষয়।  আদি  ব্রাহ্মসামাজের  কিছু ব্রহ্মসংগীতের উদাহরণ –

         অনুপম-মহিমপূর্ণ ব্রহ্ম । ভৈরব, ঝাঁপতাল

     বিশ্বভুবন-রঞ্জন। মেঘমল্লার, সুরফাক্তা

  দীন হীন ভকতে। কাফি, সুরফাক্তা

    অখিল ব্রহ্মাণ্ডপতি। বন্দনা, ঝাঁপতাল

                     জাগো সকল অমতের অধিকারী। আশাবরী, চৌতাল

     জয় জয় পরমব্রহ্ম। বিভাস, ঝাঁপতাল

                    আনন্দে আকুল সবে। বসন্ত,  সুরফাক্তা … ইত্যাদি।

রামমোহন রায়ের পর যে অল্প সংগীত প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে ঐৈলোকনাথ সান্যাল, বিজয়কৃষ্ণগোস্বামী, অন্নাপ্রসাদ চট্টোপধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সংগীত ব্রাহ্মসামাজকে সমৃদ্ধ করেছে।

রামমোহন রায় তাঁর রচনার মধ্যে দিয়ে, জীবনের মধ্যে দিয়ে মানবের বিশ্বধর্মবোধ প্রকাশ করেছিলেন।  ভারতের শাশ্বত বাণী হিন্দুর সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্রের মধ্যে উদ্গীত হয়েছে এবং সেই বাণীর সঙ্গে পৃথিবীর অন্যধর্মের বাণীর বিরোধ নেই –  এটিই তাঁর সাধনার মর্মকথা।  ব্রাহ্মধর্মান্দোলন শহরের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সমাজে সীমাবদ্ধ থাকায় ব্রাহ্মসামাজের ব্যাপ্তি ছিল ক্ষুদ্র। কিন্তু ব্রহ্মসঙ্গীতের বিস্তার ছিল অতি বিপুল। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত পৌত্তলিক ভক্তি সঙ্গীতের ঐতিহ্যের পাশাপাশি এই অপৌত্তলিক একেশ্বরবন্দনার গান প্রচলিত হওয়ায় অভিনবত্বের দ্বারা বিপুলসংখ্যক মানুষের  দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। রাজা রামমোহন রায় ভারতবর্ষে আধুনিক জীবন চিন্তার উণ্মেষের ক্ষেত্রে যে মহান অবদান রেখেছিলেন, ভারতপথিক হিসেবে তাঁর যে মূল্যায়ন হয়েছে, বাংলাগানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে তেমন কোন মূল্যায়ন হয় নি। তবে তাঁর ঐতিহাসিক সামাজিক ভূমিকার তুলনায়, সাংগীতিক ভূমিকা ক্ষুদ্র হলেও বাংলাগানের বিকাশে এবং বাঙালীর সংগীত রুচি গঠনে তা খুবই মূল্যবান।

তথ্যসূত্র

১। ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ও বাংলা সাহিত্য।

২। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় – রামমোহন ও ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য।

৩। ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ।

৪। ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত।

৫। অপূর্বকুমার রায় – উনিশ  শতকের বাংলা গদ্যসাহিত্য।

৬। করুণাময় গোস্বামী – বাংলা গানের বিবর্তন।

৭। রাজ্যেশ্বর মিত্র – প্রসঙ্গ : বাংলা গান।

৮। প্রভাতকুমার গোস্বামী – ভারতীয় সঙ্গীতের কথা।